এসব ভাবছি কেন আমি, যখন সে নেই। সারা ঘরে ছড়িয়ে আছে তার উপস্থিতির স্মৃতি। একদিন সকালে এসে বললে,
‘তুমি কিছু পারো না, একেবারে লেদাডুস।’
আমি ছুরি দিয়ে আলুর খোসা ছাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলুম। একটা খাপছাড়া ব্যাপার হচ্ছিল।
‘দেখি, সরো। আলু কাটছ কেন?’
‘মাছের ঝোল হবে।’
‘কে রাঁধবে?’
‘কেন? আমি রাঁধব।’
‘সর্বনাশ! সে ঝোল মুখে দেওয়া যাবে? মাছটা কে কাটবে?’
‘বাজার থেকে কাটিয়ে এনেছি।’
‘কী মশলা দেবে?’
‘ধনে, জিরে, হলুদ, কাঁচালঙ্কা ফেঁড়ে দেব।’
সে নিজেই রান্নায় লেগে গেল, আমি জোগাড়ে। সুন্দর কপালে দু-এক গাছা চুল ঝুলে পড়েছে। গলার চারপাশে বিন্দু বিন্দু ঘাম। একটা সরু সোনার চেন গায়ের রঙের সঙ্গে মিশে গেছে। গোল গোল হাতে একটা করে চুড়ি। সে-হাতের কী কায়দা! কানে ছোট ছোট দুটো ইয়ার রিং। হালকা। হলুদ রঙের শাড়ি সাদা ব্লাউজ। ফরসা ফরসা পা দুটো আমার চারপাশে নেচে বেড়াচ্ছে। আমি মেঝেতে থেবড়ে বসে আছি। চারপাশে ঘটিবাটি, জলের বালতি। মাঝে মাঝে হুকুম হচ্ছে, এটা দাও ওটা দাও।
সেদিন আমরা দালানে একসঙ্গে খেতে বসেছিলুম।
‘কী, কেমন বেঁধেছি?’
‘দুর্দান্ত।’
‘ঝাল লাগছে? আমি একটু ঝাল বেশি খাই।’
‘আমিও। মা বলতেন, ঝাল খেলে বুদ্ধি খোলে।’
সেদিন আমার একটা কথাই মনে হচ্ছিল, চিনু আমার বোন নয় বউ। এত এত মানুষের মধ্যে থেকে হাত ধরাধরি করে দুজনে বেরিয়ে এল। সেই দুজনই তখন জগৎ। তাদের সম্পর্ক, সুখ দুঃখ, বেঁচে থাকা, মরে যাওয়া। চিনু আমার বুকটা খালি করে দিয়ে চলে গেল। আমার আশ্রয় চুরমার। পড়ে আছি ফাঁকা মাঠে। পাশ দিয়ে সবাই সব দিকে চলে যাচ্ছে। কেউ যেন সিগারেট
ধরিয়ে কাঠিটা ফেলে দিয়ে গেছে!
ধ্যাৎ, ধ্যাৎ!
৩.
সুবীর এল। দেরিতে এল। ক্লান্ত দেখাচ্ছে। খুব খাটে। একা অত বড় একটা ব্যবসা চালায়। আমাকে বলেছিল, কি চাকরি করবি, আমার সঙ্গে আয়। আমি বলেছিলুম, না, ভাই আমাদের এই বন্ধুত্ব নষ্ট করতে চাই না।
সুবীর আসার সময় খাবার নিয়ে এসেছে। আমাদের দুজনেরই যা প্রিয়, হিং-এর কচুরি। রাতে আর কিছু খেতে হবে না। এইতেই হয়ে যাবে।
‘হ্যাঁ রে, ওদিকের কোনও খবর আছে?’
‘পোস্টমর্টেম হবে। কাল দুপুরের আগে বেরোবে না।’
‘আমরা কিছু করতে পারি?’
‘কী করবি, ওদের অনেক লোকজন!’
আমরা কথা বলছি, দরজার কাছে কে একজন এসে দাঁড়াল। বাইরের দালানে আলো জ্বলছে। লম্বা একটা ছায়া ঘরে এসে ঢুকেছে। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। বেশ ভয় পেয়ে গেছি।
মেয়েটি সামনে এসে দাঁড়াল। চিনতে পেরেছি। চিন্ময়ীদের বাড়ির সর্বক্ষণের কাজের মেয়েটি।
‘কী রে রুমকি?’
রুমকি খুব নীচু গলায় প্রায় ফিশফিশ করে বললে, ‘ভেতরের ঘরে চলো, অনেক কথা আছে।’
রুমকিকে নিয়ে শোবার ঘরে গেলুম। সে চেয়ারে বসল। আমি আর সুবীর খাটে। রুমকি খুব স্মার্ট। চেয়ারটা সরিয়ে আনল খাটের কাছে।
‘দিদিকে ওরা খুন করেছে।’
‘সে কী? কে খুন করেছে?
‘ওর মা আর ওর কাকা!’
‘সে আবার কী?’
‘ওই কাকা খুব বাজে লোক। চিনুদির মায়ের সঙ্গে একটা ব্যাপার আছে। এই নিয়ে দিদির সঙ্গে খুব অশান্তি হত। সম্পত্তি দিদির নামে। চিনুদির বাবার সঙ্গে চিনুদির মায়ের সম্পর্ক খুব খারাপ ছিল। মা আর মেয়েতে যখন ঝগড়া হত তখন সব শুনেছি। অনেক বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি ব্যাপার আমি
আড়াল থেকে দেখেছি।’
‘সে হোক, মেরে ফেলেছে বলছ কেন?’
‘এইটুকরো কাগজটা আমি পেয়েছি, পড়ে দেখ।’
কাগজটায় একটা লাইন, ‘অঙ্ক মেলাতে পারলেই পথ পরিষ্কার।’
‘এটা কার হাতের লেখা?’
‘কাকাবাবুর।’
‘এর মানে কী?
‘পথ পরিষ্কার মানে কী! একদিন রাত্তিরে, এই সাত-আট দিন আগে দিদি মাকে বলেছিল, তোমরা এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও।’
‘চিনু মারা যাওয়ার পর বাড়ি, সম্পত্তি কে পাবে?’
‘কাকাবাবু।’
‘মা পাবে না কেন?’
‘মায়ের অধিকার নেই। পৈতৃক সম্পত্তি সেই তরফেই ফিরে যাবে।’
‘কে বললে?’
‘প্রশান্তদা, হাইকোর্টের। আমি সকালেই জিগ্যেস করে জেনে এসেছি।’
সুবীর বললে, ‘এ তো অসাধারণ মেয়ে, এর ব্যারিস্টার হওয়া উচিত।’
রুমকি হাসল। কপালে টোকা মেরে বললে, ‘মানুষের এই জায়গাটাই সব। যা লেখা আছে তাই হবে।’
‘তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে?’
‘অঙ্ক। ব্যাপারটা অঙ্ক। দুই আর দুয়ে চার। মন দিয়ে শোনো অঙ্কটা কী! তোমার আর দিদির সম্পর্কটা বিয়ের দিকে যাচ্ছিল। বিয়ে তোমাদের হতই। অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা দুটোই
তুমি পেতে। তাহলে রাজকন্যাকে সরাতেই হবে। এইবার শোনো, দিদির বাবা বেঁচে থাকতেই ঠাকুরপো আর বউদির লটঘট চলছিল। শোনো, খুন একটা নয়, খুন দুটো। দিদির বাবাকেও খুব কায়দা করে সরানো হয়েছিল।’
‘কী রকম?’
‘আজ থেকে সাত বছর আগে লরি দিয়ে চাপা দেওয়া হয়েছিল।’
‘কাকাবাবু লরি কোথা থেকে পেল?’
‘সেই সময় ট্রান্সপোর্ট বিজনেস ছিল। দিদির বাবা ডানকুনির কোল কমপ্লেক্সে ছিলেন। সন্ধের সময় মোটর সাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন। লরিটা মেরে দিয়ে চলে গেল। একটা জায়গায় অঙ্কটা গোলমাল হয়ে গেল, ওরা জানত না তিন মাস আগেই বাবা উইল করে মেয়েকে সব সম্পত্তি দিয়ে গেছেন। সলিসিটারের ঘরে সেই উইল জমা ছিল। কেস কেঁচে গেল। এইবার কী হল, বউদিকে ভোগ করা হয়ে গেছে। বউদিকে বাঁচতে হবে মেয়ের দয়ায়, অতএব বউদিকে আর দরকার নেই। তখন বউদির সঙ্গে প্ল্যান হল, সম্পত্তিটা যদি পাইয়ে দিতে পার তাহলে তুমি হবে আমার পাটরানি।’
