এটা হল সুবীর। এক রবিবার সুবীর বললে, ‘চল, সিন্দুকটা খোলার চেষ্টা করি।’ যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছিল। ঘণ্টাখানেক মরণপণ, তালা খুলল। ভেতরে একটা ভেলভেট মোড়া বেহালার বাক্স। বাক্সটা কিন্তু খালি। বেহালাটা নেই। আছে পাট করা একটা সিল্কের রুমাল। এক কোণে মোনোগ্রাম।
সুবীর বললে, ‘ব্যাপারটা কী হল? বেহালাটা গেল কোথায়? এত যত্ন করে একটা খালি বাক্স! রহস্যজনক। চল তো দেখি।’
বাক্সটা নিয়ে আমরা বারান্দার রোদে এলুম। সুবীর মন নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে কী একটা করল, তলাটা খুলে গেল। একটা গুপ্ত কন্দর। একগাদা সোনার গয়না, জড়োয়ার সেট।
আমাকে হা হা করে হাসতে দেখে, সুবীর বললে, ‘কী হল? ম্যাড হয়ে গেলি?’
‘গয়নাগুলোর কত দাম হবে?’
‘অনেক।’
‘আর আমরা কী অভাবেই না দিন কাটিয়েছি!’
পরের দিন আমরা দুজনে ব্যাঙ্কের লকারে গয়নাগুলো ঢুকিয়ে দিয়ে এলুম। শান্তি।
কিন্তু বেহালাটার কী হল? যে বেহালা রাতে বাজে। সুবীর বললে, ‘ছেড়ে দে। ও নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করিস না, তবে এই বাড়িটা একটা ট্রেজার হাউস। কী আছে তোরা জানিস না। জানার চেষ্টাও করিসনি।’
‘কী করা উচিত?
‘অনুসন্ধান।’
আমার একার দ্বারা সম্ভব নয়।’
‘বাইরের লোক ঢোকালে হবে না। জানাজানি হয়ে যাবে। সে খুব বিপদের। মাসিমা খুব ক্যালাস ছিলেন।’
‘না, মা ভয় পেতেন।’
‘কীসের ভয়?’
‘মা আমাকে প্রায় বলতেন, এই বাড়িটার ওপর আমার কোনও অধিকার নেই। তোর বাবা। বলতেন অনুপার্জিত ধন একটা উৎপাত, একটা অভিশাপ। দান নিয়ে বড়লোক হওয়ার চেয়ে ভিখিরি হওয়া ভালো। মা বলতেন, এর কোনও কিছুই আমার নয়। আছি, এই পর্যন্ত। নীচের তলায় তিনটে ঘরে আমাদের দুজনের সংসার।’
সুবীর কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইল, ‘ঠিক কথাই বলেছিলেন, তবু যখন হাতে এসেছে ফেলে তো আর দেওয়া যায় না। এত বড় একটা বাড়ি। একটু অদলবদল, মেরামত করে আমরা এখানে। একটা হাসপাতাল করব। অনেকের উপকার হবে।’
‘বড় কিছু ভাবতে ভালো লাগে, করাটাই কঠিন।’
‘ইচ্ছের জোর থাকলে সবই করা যায়। ইচ্ছে থাকলেই উপায় বেরোয়। গয়নাগুলো লকারে ফেলে
রেখে বিক্রি করে দিলেই অগাধ টাকা।’
‘কার গয়না কে বিক্রি করে!’
‘কার গয়না মানে?’ তোর মায়ের গয়না।’
‘আইনে আটকাবে না! যদি চোরাই মাল হয়?’
‘তোর দাদু নিশ্চয় চোর ছিলেন না!’
‘আমার দাদু বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। সেকালের ইতিহাসে হয়তো তাঁর নাম আছে।’
‘হয়তো কী? অবশ্যই নাম আছে। অত বড় একজন ভাষাতত্ববিদ! অ্যাকাডেমিক সার্কেলে, বিদগ্ধমহলে তিনি অমর।’
তিনি বেহলা বাজাতেন না।’
‘তোর দিদিমা?’
‘শুনিনি।’
‘এই বাড়ির ইতিহাস এই বাড়িতেই আছে। রবি, সোম, মঙ্গল—এই তিন দিন আমার তেমন কাজ নেই, এই তিন দিন আমরা দুজনে বাড়িটা ওলট-পালট করব।’
.
২.
সন্ধেবেলা খবর এল চিন্ময়ী মারা গেছে। সুবীরকে ফোন করলুম। সুবীরের মোবাইলে।
‘চিন্ময়ী চলে গেল! তুই কোথায়?’
‘স্টক এক্সচেঞ্জে। একঘণ্টার মধ্যে আসছি। পোস্টমর্টেম থেকে ছাড়বে কখন? কারা গেছে?’
‘ওদের বাড়ি থেকে কেউ এসে আমাকে কিছু বলেনি।’
‘তবে? কী করবি?’
‘কিচ্ছু করব না। তোর কাজ মিটে গেলে চলে আয়!’
একেবারে একা বসে আছি আমাদের বাড়িতে। দাদুর আমলের বৈঠকখানা ঘরে। একদিকের দেয়ালে অয়েলে আঁকা একটা পোট্রেট ঝুলছে, স্যার উইলিয়াম জোনস। ভারতে এসে ভারতচর্চার পথ খুলে দিলেন। স্থাপন করলেন এশিয়াটিক সোসাইটি। ভারততত্ববিদ। অসাধারণ পণ্ডিত। সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি। দাদু তাঁর ছবি আঁকিয়েছিলেন। শিল্পীর অস্পষ্ট স্বাক্ষর, ‘পিয়ারী’। মনে হয় কোনও সায়েব। দাদুর সঙ্গে বড় মানুষের আলাপ ছিল।
যে-ঘরে বসে আছি, সেখান থেকে বড় রাস্তা বেশ কিছুটা দূরে। রাত নেমেছে শহরে। দূরের বড় রাস্তায় যান চলাচল বেড়েছে। এই সময় যা হয়। চিনুর কথা খুব মনে পড়ছে। এই বাড়ির এই ঘরে সে কতবার এসেছে। কত আনন্দ করেছে। মা চলে যাওয়ার পর, সাবধান করেছিলুম, ‘আমি একা থাকি, তুমি একা আর এসো না, পাঁচজনে পাঁচ কথা বলতে পারে।’
‘বলে বলবে, আমি গ্রাহ্য করি না।’
‘আমি যদি কিছু করে ফেলি!’
‘আমিও তো কিছু করে ফেলতে পারি!’
দুজনে হা হা করে খানিক হাসলুম। ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেল। আমাদের আলাপের জায়গাটা আমাদের কলেজ। আমি বেরোবার মুখে, চিন্ময়ী তখন ওপর দিকে উঠছে।
আলাপের উপলক্ষ্যটা খুব মজার। হেদোর পাশ দিয়ে চিনু ট্রামরাস্তার দিকে এগোচ্ছে। আমি পেছনে। হঠাৎ গোটাচারেক কুকুর ঝটাপটি করতে করতে ঘাড়ে পড়ে আর কি! চিনু দু-হাতে আমাকে জাপটে ধরেছে। আমার বুকের সঙ্গে তার বুক লেগে আছে। ধুকপুক করছে। দুজনের কপাল ঠেকাঠেকি। রাস্তার বাঁ-ধারে প্রাচীনকালের বিখ্যাত, ঐতিহাসিক চায়ের দোকান। কড়া টোস্ট আর ডবল হাফ চায়ের জন্য সুখ্যাত। দোকানের রসিক মালিক আমাদের অবস্থা দেখে বললেন, ‘হয়ে গেল।’
কুকুরগুলো মারামারি করতে করতে পেছন দিকে চলে গেল।
চিনু বললে, ‘কী হল?’
‘যা হবার তাই হল, এখন এখান থেকে আগে সরে পড়ি চল।’
আমরা বিডন স্ট্রিট ধরে সোজা হাঁটছি। তখনও জানি না, কে কোন দিকে যাব। কলেজে মেয়েদের দঙ্গলে হয়তো দেখেছি, মনে রাখিনি। প্রয়োজন হয়নি। ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর ভালোবেসে ফেলেছি। পাগল হয়ে গেছি বললে ভুল হবে না। সামান্য ব্যাপার—একটি মেয়ে। দেহে দেহে ঠোকাঠুকি নয়, মনে মনে ছুঁয়ে যাওয়া। চোখে চোখে লেগে যাওয়া।
