দীপা আড়ষ্ট হয়ে বসেছিল টেবিলে। নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছিল। এইসব ভয়ংকর কথা তার শোনা উচিত হয়নি। একটা মানুষ যে কিনা তার বাবা, একটা বাজারি মহিলার শরীরের জন্যে পাগল হয়ে গিয়েছে। দশ হাত দূরে মেয়ে বসে আছে, কোনও দৃকপাত নেই। দুপুরে দেখা হলে কী কী করবে তার খোলাখুলি বর্ণনা। সেই সব শুনে দীপার শরীর হিম হয়ে গিয়েছিল। একটা। মেয়েকে একজন পুরুষ এইভাবে ব্যবহার করবে। সে সহ্য করবে। তার বদলে সে একটা গাড়ি পাবে, হিরে পাবে, অনেক টাকা পাবে।
দীপা চিত হয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। খাটটা এত বড় যে তিনজন পাশাপাশি শুলেও আরও একজনের জায়গা থাকবে। একেবারে একা সে। ঘরের তিন পাশের জানালা খোলা। তিন দিকেই গাছপালা। মহুয়া, দেবদারু, আমলকী, কাঞ্চন। পাতায় পাতায় বাতাসের কানাকানি। নিশ্চিদ্র। অন্ধকার। দীপা নিজের শরীরে হাত রাখল। এই শরীর! বুক, পেট, বাহুঁ, কণ্ঠদেশ, ঠোঁট। এই শরীর পুরুষরা ছিঁড়ে খেতে চাইবে। বন্ধুত্ব করবে। বলবে প্রেম। চিঠি লিখবে। বেড়াতে নিয়ে। যাবে, রেস্তোরাঁয় খাওয়াবে, উপহার দেবে। লক্ষ্য কিন্তু একটাই। বর্বরতা। হাত দিয়ে নিজের শরীরের বিভিন্ন স্থান স্পর্শ করতে করতে দীপার মনে হল কোথাও একটা ভালো লাগার ব্যাপার আছে। একটা অনুভূতি সারা শরীরে চারিয়ে যাচ্ছে। একটা কাঁপুনি আসছে। একটু কিছু জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। ভীষণ একটা আবেগ, দুঃখ, নিঃসঙ্গতা, যন্ত্রণা, আনন্দ। দীপা বিছানায় উঠে বসল। একটু আগে শীত শীত করছিল, এখন গরম। আবার মনে পড়ল। সাধুর কথা। মানুষ যা হতে এসেছে, তাই হবে; যেমন সাপ সাপ হবে, বাঘ বাঘ। তা হলে! তাই কি বারে বারে সেই নার্সকে মনে পড়ে। মনে হয় সে কাছে থাকলে খুব ভালো হত। সে ছিল নেশার মতো। দীপার ভিতরটা হু হু করে উঠল। শরীর আগুনের মতো গরম। মনে হচ্ছে, সব পোশাক খুলে ফেলে। আবার সেই কাঁপুনি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত। দাঁতে দাঁতে শব্দ হচ্ছে। অসহায়ের মতো বাইরে তাকাল। মেজোমামার জানালা দিয়ে আলোর একটা আভা বাইরের বাগানে গাছের পাতায় মিহি সিল্কের মতো জড়িয়ে আছে। জেগে আছে এখনও।
দীপা খাট থেকে নামল। অন্ধকারেই আন্দাজ করে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। ছিটকিনি খুলে। বাইরে এল। বিশাল লবি। অন্ধকারে সোফা-টোফা জমাট বেঁধে আছে। ঘড়ির টিকটিক। মার্বেল পাথরের ভেনাস। সাইড টেবল, কর্নার টেবল, সেন্টার টেবল। জায়গাটা হা হা করছে। অশরীরী কেউ ছিল যেন! এখনও হয়তো আছে। দীপাকে লক্ষ করছে।
দীপার সঙ্কোচ হচ্ছিল, তবু সে মেজোমামার দরজায় টোকা মারল। মেজোমামা কে, বলে দরজা খুলে দীপাকে দেখে অবাক হলেন, ‘কী রে! তুই! ঘুমোসনি এখনও! ভয় পেয়েছিস?’
দীপা ফিশফিশ করে বলল, ‘একবার আসবে আমার ঘরে?’
‘কী হয়েছে বল তো, সাপখোপ কিছু বেরিয়েছে?’
‘ওসব কিছু নয়, তুমি এসো।’
দীপার পিছনে মেজোমামা। দীপা আলো জ্বেলে দরজা ভেজিয়ে দিল। মেজোমামার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘দ্যাখো তো গাটা জ্বর এসেছে কি না।’
মেজোমামা কপালে হাত রাখলেন। গলার কাছে রাখলেন। নাড়ি টিপলেন, ‘মনে হচ্ছে জ্বর এসেছে। দাঁড়া থার্মোমিটার আনি। তোর মেজোমাইমাকে একবার ডাকি।’
‘না, থার্মোমিটার, মেজমাইমা, কোনও কিছুর দরকার নেই।’ ‘তা হলে একটা ওষুধ দিচ্ছি, খা।’
‘সে পরে হবে। তুমি আমার বন্ধুর মতো, তোমাকে আমি একটা কথা বলতে চাই। তুমি আগে বসো।’
মেজোমামা মশারি সরিয়ে খাটের ধারে বসলেন। দীপাও বসল। মেজোমামা ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলেন,
‘কী হয়েছে বল তো?’
‘আমার ভয় করছে।’
‘তুই আমাদের বিছানায় শুবি চল। তিনজন খুব আরামে শোয়া যাবে।’
‘সে ভয় নয়, অন্য ভয়।’দীপা ইতস্তত করছে বলতে বলতে তাকে হবেই। একজন কারোকে বলা দরকার। মেজোমামাই তার একমাত্র বন্ধু যাকে সব কথা বলা যায়। সাধুর কথায় দীপা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছে। রাত যখন গভীর হয়, দরজা বন্ধ করে সে যখন বিছানায় মশারির তলায়, তখন সে কেন সকালের দীপা থাকে না। বয়সটা অনেক বেড়ে যায়। শরীরে টান ধরে। বুক, পেট, পিঠ সব ভারী হতে থাকে। কণ্ঠস্বর কেমন পালটে যায়। চরিত্রটা বদলে যেতে চায়। সে কি তার বাবার মতো, ঠাকুরদার মতো হয়ে যাবে। জ্যাঠামশাই, কাকা আর কাকিমাদের মতো!
মেজোমামা বললেন, ‘বল, কী বলবি বল! শীতের রাত হি হি করছে?’
‘তোমাকে এমন একটা কথা বলব, যা একমাত্র তোমাকেই আমি বলতে পারি। তুমি আমার বন্ধু। সেইকথা তুমি আর কারোকে বলবে না।’
মেজোমামা ভয় পেলেন, ‘কেউ কিছু বলেছে তোকে। হতচ্ছেদ্দা করেছে। অভিমান হয়েছে?
‘না, সে সব কিছু নয়। এমন কথা যা বলা যায় না, তবু বলছি। তুমি আমাকে ভালো করে দাও।’
‘সামান্য একটু জ্বর হয়েছে ঠান্ডা লেগে, তার জন্য এতটা উতলা হচ্ছিস কেন?’
‘তুমি তোমার ঘরের আলো নিবিয়ে, দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে এসো। মেজোমাইমা ঘুমোচ্ছে তো?’
‘হ্যাঁ, তোর মামি ঘুমকাতুরে। শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।’
‘তা হলে যাও, যা বলছি তাই করে এসো।’
মেজোমামার হঠাৎ একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি এল মনে। কত রকমের চোখ আছে পৃথিবীতে। মাঝে মাঝে ভাবতে ইচ্ছে করে। ঈশ্বরের চোখ, নিজের চোখ, সমাজের চোখ। নিজের চোখে। আমি নিষ্পাপ। সমাজের চোখে আমি যে-কোনও মুহূর্তে পাপী হয়ে যেতে পারি। কেউ কখনও এইভাবে অমন করেছিল অতএব তুমিও তাই করবে। সেইটাই আমাদের সিদ্ধান্ত। তুমি নিজেকে সাধু বললে কী হবে! পাপেরও একটা শাস্ত্র আছে। যেমন ঘণ্টা বাজলেই মনে করতে হবে পুজো হচ্ছে, সেইরকম সম্পর্ক যাই হোক, বয়সের ব্যবধান যতই থাক, একটা ঘরে অনেক রাতে একজন পুরুষ ও রমণী, হোক না কিশোরী, পাপ শাস্ত্র বলবে, ভয়ংকর একটা কিছু ন্যাক্কারজনক। ঘটনা ঘটছে। নিজের মন দিয়ে মানুষ বাইরের পৃথিবীটাকে দেখে। সাধুর লেখা সেই গল্প মনে পড়ে গেল—
