মেজোমামা জিগ্যেস করলেন, ‘আমরা এত ভয় পাই কেন?’।
সাধু লিখলেন, ‘ভয় পেতে শেখানো হয়েছে বলেই ভয় পাই। সমস্ত ভয়ের পিছনেই আছে মৃত্যু চিন্তা। মৃত্যুকে বন্ধু করতে পারলেই ভয়কে জয় করা যায়। মানুষের উপর বিশ্বাস হারানোটাই আতঙ্কের।’
‘আমি কোন পথে চলব?’
‘পথ বলে কিছু নেই। সবটাই প্রান্তর। চলার চেয়ে স্থির থাকার চেষ্টাই ভালো। পাথর যত গড়ায় ততই তার ক্ষয় হয়। শ্যাওলা ধরে না। জ্ঞানের শ্যাওলা ধরাতে হলে স্থির থাকতে হবে। পথ পড়ে থাকে। মানুষই চলে চলে ক্লান্ত হয়। বিচারের পথই শ্রেষ্ঠ পথ। নিজেকে জানাই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান। যে সাধু হবে সে সাধুই হবে। যে ভোগী হবে সে ভোগীই হবে। যে চোর হবে সে চোরই হবে। যার যা পথ সে সেই পথেই যাবে। এ নিয়ে অকারণ ভাবার কোনও প্রয়োজন নেই।’
‘তাহলে মানুষের চেষ্টা বলে কিছুই থাকবে না?’
‘অবশ্যই থাকবে। আমি যা নই সেইটা ভাবার চেষ্টা করাই চেষ্টা। নিজের স্বরূপটাকে ধরার চেষ্টাই চেষ্টা। ধরতে পারলেই শান্তি।’
‘তাহলে মানুষ ভালো হবে কী করে?’
‘যে ভালো হবে সে ভালো হবে, যে খারাপ সে খারাপই হবে। গেরুয়ার তলায় ভোেগী লম্পট থাকতে পারে। স্বভাব পোশাকে নেই মনে আছে। ভদ্রলোকের পোশাকে ইতরও ঘুরতে পারে।’
‘আপনি আমাকে বদলে দিন।’
‘বদলানো যায় না। যে বদলাবার সে নিজেই বদলে যায়। কুঁড়ি নিজে থেকেই ফুল হয়। শুঁয়োপোকা নিজে থেকেই প্রজাপতি হয়। মানুষ যদি রূপান্তর চায় তাকে প্রার্থনা করতে হবে। গুরুর কিছু করার ক্ষমতা নেই। কৃপা ছাড়া কিছু হয় না।’
মেজোমামা সব শেষে বললেন, ‘এই মেয়েটিকে একটু আশীর্বাদ করবেন।’
সাধু ইশারায় দীপাকে কাছে ডাকলেন। দীপা ভয়ে ভয়ে কাছে এগিয়ে গেল। এমন সাধু সে কখনও দেখেনি। কোনও মন রাখা কথা নেই। সব প্রশ্নেরই কাটা কাটা উত্তর। সাধুর শরীর থেকে সুন্দর সাত্বিক একটা সুবাস বেরোচ্ছে। দীপার মাথায় হাত রাখতেই একটা শক্তির তরঙ্গ খেলে। গেল শরীরে। দীপা কেমন যেন হয়ে গেল। মনটা সেই মুহূর্তে হয়ে গেল ভোরের আকাশের মতো। সাদা একটা পাখি চক্কর মারছে ডানা মেলে। কেমন যেন শীত শীত করছে। দুঃখও নয় সুখও নয় ভারমুক্ত একটা অনুভূতি।
সব শেষে সাধু লিখলেন, ‘এই মুহূর্তে তোমার যদি কোনও অনুভূতি হয়ে থাকে আর তা যদি তোমার ভালো লেগে থাকে, সেই অনুভূতিকে তুমি দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা করতে পারো। এর জন্য প্রয়োজন পবিত্র জীবন।’
দীপাকে খুব সহজ উপমায় সাধুবুঝিয়ে দিলেন, দেহের আকাশ হল মন। চিন্তা হল মেঘ।
একেবারে মেঘশূন্য নির্মল মনাকাশ সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। দেখতে হবে মেঘের রং যেন সাদা থাকে। ধারণাই হল সূর্য। সেই ধারণার দীপ্তিতেই মেঘ সাদা হয়, সোনালি হয়। শুভ্র। চিন্তাকে ধারণা করো। ইন্দ্রিয়ের জানালা দিয়ে জগতকে দেখোনা। উপরের জানালা, স্কাইলাইট দিয়ে দেখো। উঁচুতে উঠতে পারলে মানুষ অনেকটা দূর দেখতে পায়। দি সেম আই সে টু মাই ডক্টর।
মেজোমামা কুঠিয়া ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে সাধুর সামনে মাথাটা নীচু করে দিয়ে বললেন, ‘টাচ মি।’
সাধু স্লেটে লিখলেন, ‘আজ উলটোটা হোক। আপনি আমাকে স্পর্শ করুন। দেখি কি ভাইব্রেশন আসে।’
মেজোমামা স্পর্শ করলেন। হাত রাখলেন সাধুর ব্রহ্মতালুতে। হাত যেন ম্যাগনেট আটকে রইল বহুক্ষণ। সাধু বসে আছেন চোখ মুদে, স্থির। বেশ কিছুক্ষণ থাকার পর মেজোমামার হাত খুলে গেল। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সাধু হাসলেন। মেজোমামা হাসলেন।
সূর্য অস্ত নেমেছে। অক্লান্ত, অফুরন্ত উশ্রী লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। ডুরে শাড়ি পরা চপলা বালিকার মতো। আকাশের রঙে দিবাবসানের রহস্য জমছে। দূরের গাছ শাখা-প্রশাখার খুঁটিনাটি হারিয়ে শুধুমাত্র একটি আকারে পরিণত হচ্ছে। বিশাল বিশাল শিলাখণ্ড যেন আরও ভারী হয়ে উঠছে। নিস্তব্ধতা ভেঙে ফেলার ভয়ে পাখিরা আর শব্দ করছেনা। ইঞ্জিন বন্ধ গাড়ি নিঃশব্দে। গড়িয়ে চলেছে ঢালুপথ বেয়ে। মেজোমামা স্টিয়ারিং-এ স্থির। পাশে বসে আছে দীপা।
গাড়ি খাড়াইতে উঠবে। ইঞ্জিনে ইগনিসনের শব্দ। যন্ত্রের শক্তি গর্জন করে উঠল।
দীপা বলল, ‘মেজোমামা, এসো না, আজ রাতটা আমরা এইখানেই থেকে যাই।’
‘আমারও তো ওইরকম ইচ্ছে করে, ওই তেঁতুলতলায় সাধুর কুঠিয়ার কাছে সারারাত বসে থাকব ধুনি জ্বালিয়ে। মাথার উপর পিচ কালো আকাশ। তারায় ভরা। অন্ধকারে ঝরনার কলকল শব্দ। কোনও বন্যপ্রাণী এসে জল খাচ্ছে। চকচক আওয়াজ। বনের ভিতর আগুনের গোলার মতো দুটো চোখ। অন্ধকারের পাঁচিল ঘেরা নিভৃত একখণ্ড বন। কত কী হয়তো দেখা যায় ওই সময়টায়। কত অলৌকিক কাণ্ডকারখানা। ভাবি, কিন্তু সাহসে কুলোয় না। চড়া আলো, পাকা বাড়ি আর সংসারের আদরে থাকতে থাকতে ভীতু হয়ে গেছি রে দীপা। থাকতে বাধ্য না হলে থাকতে পারব না।’
‘সাধু কী করে আছেন। আমরা তো চলে এলুম উনি তো একা।’
‘সেই কারণেই উনি সাধু।’
গাড়ি ছুটছে শহরে দিকে জোর গতিতে। গাছগুলো সব ঘুরতে ঘুরতে ছিটকে পিছনে চলে যাচ্ছে। গভীর রাতে দীপা একা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল সাধু এ কী বললেন। যে যা হবে সে তা হয়েই এসেছি। লেখাপড়া শিখে সবাই পণ্ডিত হতে পারে, কিন্তু সে চোর হবে না সাধু হবে, দয়ালু। হবে না নিষ্ঠুর হবে, সেটা ঠিক হয়ে আছে। সে কী হবে, কেমন হবে সেটা তার কপালে আগেই। কেউ লিখে দিয়েছে। চেষ্টা করলে পণ্ডিত হওয়া যায় সাধু হওয়া যায় না। সেটা অন্য ব্যাপার। দীপার কেমন যেন ভয় করতে লাগল। নিজের বাড়ির কথা মনে পড়ে গেল। সবার আগে মনে পড়ে গেল বাবাকে। একদিন টেলিফোনে কথা বলছেন সেই মহিলার সঙ্গে। খেয়াল নেই যে ঘরের আর এক ধারে দীপা টেবিলে বসে লেখাপড়া করছে। সে কী নরম নরম, মিষ্টি মিষ্টি কথা। মানুষটার মুখের চেহারা অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। চোখ দুটো আধবোজা। ঢোলা হাতা পাঞ্জাবি, ফাঁদালো পাজামা পরনে। কবজিতে সোনার ব্যান্ড লাগানো নীল ডায়ালের দামি ঘড়ি। আঙুলে হীরের আংটি ঝিলিক মারছে। এমন এমন সব কথা বলছেন যা কোনও মেয়ের শোনা উচিত নয়। নরম কোলে শুয়ে বেড়াল যেমন ঘড়ঘড় করে গলাটা অনেকটা সেইরকম। টেলিফোনেই আদর করছেন। দুপুরেই একবার দেখা করার অনুমতি চাইছেন। পায়ে ধরছেন। বলছেন, তোমার লাথির দাম লাখ টাকা। বলছেন, তোমার গাড়ি বুক করে দেওয়া হয়েছে। কালই হয়তো ডেলিভারি দেবে। তা হলে আজকের দিনটা তুমি আমার সঙ্গেই থাকবে। তুমি আর আমি।
