ফাঁকা একটা মাঠ। অমাবস্যার অন্ধকার রাত। মাঝখানে একটা টিবি। অন্ধকারে দেখলে মনে হবে, একটা লোক গুড়ি মেরে বসে আছে। গুঁড়িখানা বন্ধ হয়েছে। মাঝরাতে মাতাল ওই মাঠের পথ ধরে টলতে টলতে ফিরছে। ঢিবিটা দূর থেকে নজরে পড়েছে। নিজের মনেই বলছে, বাঃ, আমার নেশা হওয়ার আগেই, তুমি ভাই লাগিয়ে বসে আছে। তোমার মালের তো বহুত জোর। সে তো আপশোশ করতে করতে চলে গেল। একটু পরেই এলেন এক সাধু। দূর থেকে টিবিটাকে দেখছেন। ভাবছেন, কী ভাগ্যবান, আমি এখনও বসতেই পারলুম না, আর আপনার ধ্যান লেগে গিয়েছে! সব শেষে এক পুলিশ, দেখে ভাবছেন, ব্যাটা চোর, মাল সাফ করে এখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকা হয়েছে! একটা টিবি, তিনজন মানুষের তিন ধরনের দেখা।
মেজোমামা বললেন, ‘দরজাটা খোলা থাক, আলোটাও জ্বলুক। আমাকে দেখতে না পেলে তোর মাইমা অন্যরকম ভাববে।’
দীপাবললে, ‘অন্যরকম মানে কী রকম! আমি তো তোমাকে একেবারে অন্যরকম কথাই বলতে চাইছি।’
দীপা বুঝতে পারছে, মেজোমামা ভীষণ ভয় পেয়েছে। ঠিকমতো বসতে পারছে না। পালাবার জন্যে উশখুশ করছে। ঘন ঘন ঢোঁক গিলছে।
শেষে বললেন, কী এমন কথা! আজ অনেক রাত হয়েছে, কাল সকালেও তো বলা যায়।’
‘এসব কথা রাত ছাড়া বলা যায় না। তুমি অমন ছটফট করলে বলতে পারব না। সময় লাগবে। সারাটা রাতই লেগে যেতে পারে। তুমি অমন ভয় পাচ্ছ কেন? ভূত দেখেছ নাকি!’
‘না, তা নয়, তবে তোকে কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। চুল এলোমেলো, চোখ ছলছল। জ্বরের ঘোরে ভুল বকছিস না তো!’
‘এখনও বকিনি, তবে এইবার যা বলব তাতে তোমার মনে হবে আমি সত্যিই হয়তো ভুল বকছি।’
দীপা মেজোমামার পাশে বসে পড়ল। দু-হাত দিয়ে মেজমামার সহজ সরল মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে বললে, ‘আমার মুখটা ভালো করে দেখে বলো তো, কার মতো, বাবার মতো, না মায়ের মতো?’
কিছুক্ষণ দেখে বললেন, ‘দুজনের কারও মতোই নয়, একেবারে অন্যরকম।’
‘মেয়েদের চরিত্র কার মতো হয়, বাবার মতো, না মায়ের মতো। তুমি আমার বাবাকে চেন, আমি
কী সেইরকম হব।চরিত্রহীন?’
‘এই বয়সে এই প্রশ্ন কেন?’
‘সাধু আমার মনে ভীষণ ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন। যে যা হবার তাই হবে। অন্য কিছু হওয়ার চেষ্টা করলেও হতে পারবে না। আমি কী হব। আমার মায়ের মত, আমার বাবার মতোনা একেবারে অন্যরকম।’
‘তুই একেবারে পাগলের মতো কথা বলছিস। এই বয়সে এইসব কেউ ভাবে না। তোকে আমরা সবচেয়ে ভালো কলেজে লেখাপড়া শেখাব। পারলে বিলেত পাঠাব। গবেষণা করবি, ডিগ্রি নিবি। তারপর নিজের জীবনের ধারা নিজে ঠিক করে নিবি।’
‘সে তো শিক্ষার কথা, চরিত্রের কথাটা বলো।’
‘শিক্ষাই তো চরিত্র। আলাদা করে চরিত্রের কথা ভাবছিস কেন?’
‘আজকের কাগজে একটা খবর পড়েছ, এক শিক্ষিত অধ্যাপক আর একটা মেয়েকে বিয়ে করবে বলে বউকে খুন করেছিল ধরা পড়েছে। যে মেয়েটাকে বিয়ে করবে সে ওই অধ্যাপকের ছাত্রী। লোকটা তো শিক্ষিত, নামকরা অধ্যাপক।’
‘ওরা অপরাধী। তাই খুঁজে খুঁজে ওইসব খবর পড়ে মাথা খারাপ করবি কেন? এমন ঘটনা অনেক ঘটে। মানুষ নিজের দুর্বলতায় হঠাৎ অনেক কাজ করে ফেলে, পরে আপশোশ করে। রাগের মাথায় মারতে গিয়ে মেরে ফেলে জেলে যায়। একে বলে, টেম্পরারি ইনস্যানিটি। সব দেশেই এমন ঘটনা ঘটে। তাতে তোরই বা কী, আমারই বা কী! সাপ গর্তে থাক, বাঘ জঙ্গলে, কুমির। জলে, পাখি গাছে, আমরা আমাদের মতো, ওরা ওদের মতো। কেউ কারও এলাকায় ঢুকবে না। তাহলেই হল।’
‘তুমি কি জানো, আমি একটা খারাপ মেয়ে। আমাকে খারাপ করে দিয়েছে।’
দীপার মেজোমামা একটু থমকে গেলেন। কুমারী মেয়েদের এই একটা বয়স। কৈশোর আর। যৌবনের সন্ধিক্ষণ। যে বাড়িতে মানুষ হচ্ছিল, সেই বাড়ির মানুষগুলোর পয়সা ছিল, আদর্শ ছিল না। সব কটার ঠোঁটের উপর অহঙ্কারের গোঁফ। পুলিশ, সরকারি পদস্থ কর্মচারীদের তোয়াজ করে যতরকম অন্যায় পথ আছে, সেই পথে অর্থ উপার্জন। প্রতিটি মানুষ ইন্দ্রিয়পরায়ণ। মাত্রাতিরিক্তি যৌনতা। দীপাকে কে কীভাবে ব্যবহার করেছে কে জানে! সে সব কথা এই মাঝরাতে শুনে লাভ কী! মানুষ তো প্রতি মুহূর্তে নতুন জীবন শুরু করতে পারে। যদি ইচ্ছে থাকে, যদি মনের জোর থাকে।
মেজোমামা বললেন, ‘দীপা, তুই কী বলতে চাইছিস আমি জানি না, আমি শুনতেও চাই না। আমি যেমন তোর মামা, আবার আমি তোর অন্তরঙ্গ বন্ধু। আমি বিশ্বাস করি, তুই ভীষণ ভালো মেয়ে। তোর পক্ষে খারাপ হওয়া সম্ভব নয়, কারণ, তোর রক্তে আমাদের বংশের রক্ত আছে।’
দীপা একটুক্ষণ ভাবল। তার মনে হল, যে কথাটা সে বলতে চাইছে, সেটা বলা যায় না। যেমন সকলের সামনে উলঙ্গ হওয়া যায় না। দীপা ভয় পেয়েছিল। সেই ভয়টা ক্রমশ কেটে আসছে। একা ঘরে একা-একটা মানুষ, একটা শরীরে একটা মন, ভয় পেতেই পারে। দীপা ভাবলে, আর কিছুদিন দেখাই যাক না। কী হয়! যদি কিছু না-ই হয়, তাহলে যা হবার তাই হবে। অনেকেরই তো অনেক খুঁত থাকে, কারও ছ’টা আঙুল, কারও থ্যাবড়া নাক, গজদন্ত।
দীপা বলল, ‘চলো, আমরা শুয়ে পড়ি। যে কথাটা তোমাকে বলতে চাই, তা বলা যায় না। ওটা আমার ভিতরেই থাক।’
‘দীপা তোর যা বয়েস সেই বয়সে তুই কেমন করে এইসব কথা বলিস! একেবারে পাকা বুড়ির মতো!’
‘মেজোমামা, মেয়েরা তাড়াতাড়ি পেকে যায়।‘
