‘ভীষণ ভালো লাগছে মেজোমামা। মনে হচ্ছে এইখানেই থাকি আর কোথাও যাব না।’
‘তাহলে একটা গান শোন।’
মেজোমামা গাইতে লাগলেন,
‘আমি কান পেতে রই ও আমার আপন হৃদয় গহন-দ্বারে বারে বারে
কোন গোপনবাসীর কান্নাহাসির গোপন কথা শুনিবারে বারেবারে।।
ভ্রমর সেথা হয় বিবাগী নিভৃত নীল পদ্ম লাগি রে,
কোন রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে বারেবারে।।
দীপা আর থাকতে পারল না। সেও গলা মেলাল। সামনে কলকল ঝরনা। একসময় মনে হল। দীপা প্রকৃতির সঙ্গে এক হয়ে গিয়েছে। আমি আকাশ হয়ে গিয়েছি। নীল নীল বাতাসের অনিবার ছোটাছুটি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত পবিত্রতার তরঙ্গ খেলছে। দেহের সমস্ত দুয়ার খুলে গিয়েছে। পাখি উড়ে যাচ্ছে ডানা মেলে। দীপার চোখে জল এসে গিয়েছে। এত সুখ শেষপর্যন্ত থাকবে তো! তার কানের কাছে সবাই ঘণ্টার মতো বাজিয়ে গিয়েছে ঘোষণা, মেয়েটা অপয়া। দুর্ভাগা। অনেকে শরীরের লক্ষণ মিলিয়ে তার জাত ঠিক করেছে, পদ্মিনী। শঙ্খিনী নয়, হস্তিনী নয়, পদ্মিনী। এ মেয়ের সংসার হবে না। তখন দীপার হয়ে বলার কেউ ছিল না।
অঝোর ঝরনার মতো মেজোমামা অঝোরে গেয়ে চলেছেন। একসময় গান থামিয়ে বললেন, ‘চল, এইবার সাধুর ডেরায় যাই।’
বাঁদিকে একটা ভয়ংকর বিপজ্জনক সঁড়িপথ সোজা উপর দিকে উঠে গিয়েছে। বড় বড় পাথর। কোনওটা আলগা হয়ে ঝুলছে। দু-পাশে ঝোপঝাপ। খুব সাবধানে দুজনে উঠছে। অনেকটা ওঠার পর চাতালের মতো একটা জায়গা। সেখানে পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে একটা কুঠিয়া। খুব নীচু হয়ে ঢুকতে হয় এইরকম একটা দরজা। চারপাশে পাথর ছড়িয়ে একটা বেদি। উশ্রীতে পাথরের অভাব নেই। একেবারে পাশ দিয়ে লাফাতে লাফাতে ফুটতে ফুটতে নীচের দিকে গড়িয়ে নামছে ঝরনার একটি শাখা। বাঁপাশে বিশাল একটা তেঁতুল গাছ। তার তলাতে বেদি।
মেজমামানীচু হয়ে কুঠিয়ায় ঢুকলেন। পিছনে দীপা। ভিতরটা অন্ধকার অন্ধকার। কম্বল বিছানো। তার উপর বসে আছেন শীর্ণকায় এক সাধু। পরিধানে গেরুয়া। সামনে একটা স্লেট পেনসিল। মেজোমামাকে দেখে সাধু স্লেটে লিখলেন, ওয়েলকাম।
মেজোমামা পাথরের উপর বসলেন, পাশেদীপা। মেজোমামা বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ দীপাকে দেখিয়ে বললেন, ‘আমার ভাগনী।’
সাধু হাসলেন। দীপার মনে হল, হাসিটার জাত আলাদা। ছেলেমানুষের অকারণ আনন্দের হাসির মতো। শরীর শীর্ণ হলেও প্রদীপ্ত মুখ, উজ্জ্বল চোখ। তাকিয়ে আছেন অথচ দেখছেন না কিছুই। এইরকম একটা ভাব। সুদূর দৃষ্টি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে অস্বস্তি হয়।
মেজোমামা বললেন, ‘একটা-দুটো কথা জিগ্যেস করতে পারি?
সাধু ঘাড় দুলিয়ে বোঝাতে চাইলেন, ‘পারো’। মেজোমামা প্রশ্ন করছেন মুখে সাধু উত্তর দিচ্ছেন স্লেটে লিখে ইংরেজিতে। দীপা পাশে বসে শুনছে আর দেখছে।
মেজোমামা প্রথমে জানতে চাইলেন, ‘মানুষ কী চায়?’
উত্তর এল, ‘মানুষ প্রথমে চায় বাঁচতে। তারপর সে ভালো যা কিছু পায়, অর্থাৎ সে নিজে যা কিছু তার পক্ষে ভালো মনে করে, সেইটাই আরও বেশি করে চাইতে শেখে। যেমন টাকা পেলে আরও আরও টাকা পেতে চায়। বিষয়-সম্পত্তি পেলে আরও পেতে চায়। যশ-খ্যাতি পেলে আরও পেতে চায়। আগে সে পায়, তারপর সেই পাওয়ার ফল দেখে সে চাইতে শেখে। সবার আগে সে চায় বাঁচতে। আগে জীবন দিয়ে সে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট খোলে। সেইটাই তার মিনিমাম ব্যালেন্স। সেইটাকে বজায় রেখে তারপর যত কিছু সঞ্চয়ের ভাবনা।’
‘মানুষ দুঃখও কি চায়?’
‘ওটা চাইতে হয় না, আপনিই আসে। টাকার কি একটা পিঠ? দুটো পিঠ নিয়েই টাকা। টাকা চাইলে এপিঠ-ওপিঠ দুপিঠই তোমার কাছে আসবে। সুখের উলটো পিঠেই আছে দুঃখ। এটাকে চাইলেই ওটা এসে যাবে। যেমন ফুল চাইলে ফুলের গন্ধ আসবে। ভ্রমর চাইলে তার গুঞ্জন। আসবে। শিশু চাইলে তার ক্রন্দন আসবে। পাখি চাইলে গান আসবে। সাপ চাইলে তার ছোবল আসবে। টাকার সঙ্গে ট্যাক্স আসবে। ছাতার সঙ্গে ছায়া আসবে। রোদের সঙ্গে গরম আসবে। বন্ধুর সঙ্গে শত্রু আসবে। বরফের সঙ্গে শীতলতা আসবে। বাতাসের সঙ্গে ধুলো আসবে। আগুনের সঙ্গে দাহিকা শক্তি। জলের সঙ্গে আর্দ্রতা। কৃষ্ণের সঙ্গে রাধা। পুরুষের সঙ্গে প্রকৃতি। যুগলে আছেন। দুঃখ, যন্ত্রণা মানুষ চায় না। কিন্তু সহ্য করতে শেখে। এই সহ্যের শক্তিটা মানুষের মধ্যেই আছে। ভোগে মানুষ খরচ করে, সহ্যে মানুষ অর্জন করে। দুটো দরজা। ভোগের দরজা। দিয়ে শক্তি বেরিয়ে যায় আর সহ্যের দরজা দিয়ে শক্তি ঢোকে।’
‘আমার কাছে এটা খুব পরিষ্কার হল, এখন আমাকে বলুন, এরই মাঝে পরমানন্দে কীভাবে বাঁচা যায়?’
‘গ্রহণ করতে শিখুন। দুঃখ এবং সুখ, শান্তি এবং অশান্তি, অসুখ এবং আরোগ্য দুটোকেই। সমানভাবে নিতে শিখুন। জয় এবং পরাজয় দুটোতেই অবিচলিত থাকুন। জীবন যখন যা কুড়িয়ে পাচ্ছে তখন সেইটাকেই পরম প্রাপ্তি বলে মেনে নিতে শিখুন। তাহলেই আনন্দ। গেল গেল, হল না, হল না, ওর হল আমার হল না এই ভাবটাই নিরানন্দের কারণ। বৃষ্টিতে ভিজতে হবে, রোদে পুড়তে হবে, শীতে কুঁকড়ে থাকতে হবে—এইটাই সত্য। এইটা দর্শন করার নামই সত্য দর্শন। এইটাকে অতিক্রম করার সাধনাই হল যোগ। আর এই যোগ অভ্যাস করাই হল সাধনা। কোনও কিছু আশা না করাটাই হল শ্রেষ্ঠ করা। যা পাওয়া যায় সেইটা পাওয়াই হল শ্রেষ্ঠ পাওয়া।’
