‘খুব আবছা।’
‘আয়নার সামনে দাঁড়ালে তুই তোর মাকে দেখতে পাবি। অবিকল তোর মতো।’
মেজোমামা একটুক্ষণ থমকে থেকে বললেন, ‘তোর মা তোরই মতো ফিকে হলুদ রং পছন্দ। করত। তোরই মতো ধীর, শান্ত। তোরই মতোনীচু গলায় কথা বলত। লাজুক লাজুক মুখে তাকিয়ে থাকত। কখনও কিছু চাইত না। একেবারে ঠিক আমার মায়ের মতো স্বভাব। বাড়িতে আছে কী নেই বোঝা যায় না।’
চারপাশে গভীর অরণ্য। ঝিল্লির রব। পাতা ঝরে পড়ার খসখস শব্দ। দীপার মেজোমামা টিলার উপর বসে আছেন। পায়ের পাশ দিয়ে লেজ খাড়া করে চলে যাচ্ছে শুকনো গিরগিটি। আশ্চর্য। একটাই, কোথাও কোনও পাখি ডাকছে না। মেজোমামা মুখ তুলে বললেন, ‘দীপা পেছনে থাক। সময়ে পিছিয়ে যা। দশ বছর, বারো বছর, পনেরো বছর। তোর মা বসে আছে এই টিলার উপর। আমি তোর মায়ের পায়ের কাছে। ওইখানটায় বসে আছে দাদা। বাবা আর মা পাশাপাশি। আমার পাশে বউদি। তোর মেজোমাইমা তখনও আসেনি জীবনে। কলেজে পড়ছে। দৃশ্যটা দেখার চেষ্টা কর। এই পাথরে তার স্পর্শ লেগে আছে। সেই সময়ে যে-গাছগুলি ছিল চারা আজ তারা বিশাল সাবালক। একজন ছিল, এখন নেই, কিন্তু তার না থাকাটাকে অনেকে ধরে রেখেছে। সে না থেকেও আছে। বুঝতে পারছিস ব্যাপারটা! নেইটাকেও কাঁধে নিয়ে পৃথিবী এগোচ্ছে।’
দীপা অবাক হয়ে মেজোমামার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এত সব বোঝার বয়স তার হয়নি, তবু মনে হল এইসব কথার মধ্যেই আসল কথা আছে। মেজোমামা তাকে বাইরের ঘর থেকে ভিতরের ঘরে নিয়ে যেতে চাইছে। সেদিন রাতে স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা থেকে মদালসার কাহিনি শোনাচ্ছিলেন। মদালসা রানি হয়েছেন। রাজাকে বলেছেন আমার সংসার। করতে আপত্তি নেই কিন্তু একটি শর্ত যে সন্তান মানুষ করবার ব্যাপারে তুমি কোনও বাধা দিতে পারবে না। রাজা বললেন, বেশ তাই হোক। তোমার শর্ত মেনে নিলুম। জন্মের পর থেকে। মদালসা শিশুকে দোলনায় দোল দেন আর বলেন, ‘ত্বমসি নিরঞ্জন!’ —তুমি শুদ্ধ, নিরঞ্জন আত্মা।
এতে কী লাভ?
মহা লাভ, আবাল্য শিশুর সংস্কার গড়ে উঠল যে সে নিরঞ্জন।
নিরঞ্জন মানে?
কলঙ্কহীন, নির্মল, শিব। সংসার তোমাকে কাবু করতে পারবে না। রোগ, শোক, দুঃখ, জরা বাইরে দিয়ে চলে যাবে, যেন ফেরিঅলা হেঁকে যাচ্ছে। এই গল্পটা তোকে কেন শোনাচ্ছি, যাতে তোর মনেও এইরকমই একটা সংস্কার তৈরি হয়।
আজ এই নির্জন বনে একটা শিলার উপর বসে মেজোমামা এমন কিছু বলছেন যা অনেক দূরের কথা। মানুষের ভিতরটাকে অন্যরকম করে দেয়। ভিতরে একটা চাপা দুঃখ তো আছেই, একটা অভাববোধ। নিজের বাড়ি আর মামার বাড়িতে একটা তফাত তো থাকবেই। যদিও তুলির সঙ্গে তার কোনও পার্থক্যই মামারা রাখেনি, তবু নিজের মন থেকে সে যে পরের বাড়ির মেয়ে, ওই বোধটা একেবারে যায়নি। নিজের বাবার কথা ভেবে কুঁকড়ে যায়। না দেখতে আসুক, না আসুক, এক পক্ষে ভালো, কিন্তু একটু ভেবে দেখলে মনে হয় দীপাকে ফুটপাথে ফেলে দিয়ে তিনি অন্য একটি মেয়ের সঙ্গে মজা করতে চলে গিয়েছেন। এমন বাবার পরিচয় নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে ভালো লাগে?
‘নাঃ, তোর মনটা খারাপ করে দিলাম, নে চ, আরও কিছু দূর যেতে হবে।’
মেজোমামা উঠে পড়ে হাঁটতে লাগলেন। এবার ধরেছেন অন্য গান। সেই অপূর্ব সুরেলা গলা। গাছের পাতায় উতলা বাতাসের মাখামাখি। মেজোমামা গাইছেন :
আর কত দূরে আছে সে আনন্দধাম।
আমি শ্রান্ত, আমি অন্ধ, আমি পথ নাহি জানি।।
রবি যায় অস্তাচলে আঁধারে ঢাকে ধরণী
করো কৃপা অনাথে হে বিশ্বজনজননী।।
এই গান দীপাব্রাহ্মসমাজে শুনেছে। মেজোমামা তার চেয়ে ভালো গাইছেন। কানে আর একটা নতুন শব্দ আসছে, জল পড়ার শব্দ। অজস্রধারায় কোথাও জল পড়ে চলেছে। ঢালু পথ বেয়ে তারা নামছে। বনের মধ্যেই বড় টেবিলের মতো খোলা একটা জায়গা। অল্প অল্প ঘাস, বড় ছোট পাথর, রোদ, আর সামনেই ত্রিধারায় নামছে জলপ্রপাত। বড় বড় পাথরের উপর দিয়ে। নেমে নেচে আসছে জলধারা। হেসে কলকল, গেয়ে খলখল, তালেতালে দিয়ে তালি। বাঁ দিক। থেকে পাথরের আড়ালে আড়ালে দামাল এক বালিকার মতো ছুটে আসছে একটি ধারা। প্রখর তেজ। জল ছিটকে ছিটকে উঠছে। মূল ধারাটি নামছে সামনে। উপরের একটা চাতাল ধরে। হরিনাম সঙ্কীর্তনের দলের মতো খোল-করতাল বাজিয়ে ছুটে সে কিনারা বেয়ে ঝরে পড়ছে। অবিরল ধারায়। আর একটি ধারা নামছে একেবারে অন্যপথে। অনেকটা নীচে তৈরি হয়েছে। গভীর একটি হ্রদ। সেই হ্রদ উপচে ডান দিকের শিলাপথ ধরে বয়ে গিয়েছে নদী, তার নাম উশ্রী। এই উশ্রীকে নিয়েই কবি সুনির্মল বসু লিখেছেন,
মনে পড়ে অতীতের স্মৃতি অনাবিল
উশ্রী নদীর জল করে ঝিলমিল
আমলকী বনে বনে ছায়া কাঁপে ক্ষণেক্ষণে
শিরশির করে উঠে ‘শিরশিয়া ঝিল’!
কবি সুনির্মলের বাড়ি দীপা দেখেছে। সামনে মনোরঞ্জন গুহঠাকুরতার বাড়ি। লম্বা লম্বা সিঁড়ি। পিছনেই পশুপতি বসুর ছোট্ট একতলা। বড় বড় কাঁঠাল গাছের ছায়ায় আশ্রমের শান্তি। কবির বাস এইখানেই।
মেজোমামা একটা চ্যাটালো পাথরে ধ্যানাসনে বসে দীপাকে ডেকে বললেন, ‘বোস এখানে, প্রকৃতি দেখ। প্রকৃতির সর্বত্র পরমেশ্বরের আনন্দের প্রকাশ। ঝরনার মতো উপছে পড়েছে। জায়গাটা তোর ভালো লাগছে না?
