অসীম রহস্য মাঝে কে তুমি মহিমাময়!
জগৎ শিশুর মতো চরণে ঘুমায়ে রয়।
এই গানের আসরে সময় পেলেই বড়মামাও এসে যোগ দিতেন। সেজন্যই হয়তো চলে এসেছেন তাঁর অভ্রের কারখানা থেকে। সেখানে একটা বিশাল পালভারাইজার আছে। একপাশে একা দাঁড়িয়ে আছে খাণ্ডোলি পাহাড়। একটু দূরেই একটা লেক। নীলজলে ভাসছে আকাশের ছবি। সেখানে সারাদিন যন্ত্রে চূর্ণ-বিচূর্ণ হচ্ছে অভ্রের পাত। কারখানার বাতাসে ভাসছে অভ্রের রেণু। বড়মামার চুলে, জামা চিকচিক করছে অভ্রের কুচি, যেন জড়োয়ার মানুষ। বড় বড় চুল। বড় বড় টানা টানা চোখ। জীবনের নেশাদুটো—অভ্র আর সাহিত্য। ইংরেজিটা ভীষণ ভালো জানেন। প্রবন্ধ লেখেন, রম্যরচনা লেখেন। গান ভালোবাসেন, ভালোবাসেন কবিতা।
বড়মামা এলেই আসর যেন আরও জমে উঠত। গানের সঙ্গে গলা মেলাবার চেষ্টা করতেন। গানের এক-একটা লাইন শুনে, ‘আহা আহা’ করে উঠতেন। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলতেন, ‘কী রিয়েলাইজেশান দেখেছিস! বসে আছি পৃথিবীতে, তুলে নিয়ে যাচ্ছেন মহাবিশ্বে। রবীন্দ্রনাথ ইজ রবীন্দ্রনাথ।’ মাথা হেঁটে করে বসে থাকতেন। ভাবের ঘোরে দুলতেন। সারা শরীরে লেগে থাকা অভ্রের রেণু চিকচিক করত। মনে হত জীবন্ত দেবতা, এইমাত্র ভক্তির অঞ্জলি নিয়ে এসে। বসেছেন। দুই মামা পাশাপাশি বসে আছেন। এ ওর গায়ে হেলান দিয়ে। এদিকে একের পর এক গান চলেছে। দীপার মাঝে মাঝে মনে হত পৃথিবীটা কি সত্যিই এত সুন্দর! এত মিল, এত ভালোবাসা! দুই মাইমার একসঙ্গে ওঠা-বসা। ঋষির মতো দাদু। ছবির মতো সাজানো বাড়ি! সব কিছু ঝকঝক করছে, যেন এই মাত্র কেনা হল। নিখুঁত বাগান। লন। রোদ ছাতা। তার বাড়িতে সব কিছু আছে, বেশি বেশি আছে, যত্ন নেই। কাজের লোকগুলি শয়তান। একটা এলোমেলো, বীভৎস, দুর্গন্ধী সংসার। লেখাপড়ার বালাই নেই। গান-বাজনার ধার ধারে না কেউ। টাকা, খাওয়া, ঘুম আর ঝগড়া। দীপা একদিন দাদুকে জিগ্যেস করেছিল, অমন একটি বাড়িতে মায়ের বিয়ে দিয়েছিলেন কেন? দাদু স্বীকার করেছিলেন, ‘জীবনের হিসাব ওই একটা ব্যাপারেই ভুল হয়ে গিয়েছিল। পয়সাটাই দেখেছিলুম, কালচারটা দেখিনি।’
মেজোমামা একদিন দীপাকে বললেন, ‘চল দীপা আজ তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব। সেজেগুঁজে রেডি হয়ে নে। আমি গাড়িটা বের করে আনি।’
প্রথম শীতের মিষ্টি দুপুর। দীপা এসেছিল ছন্নছাড়া চেহারা নিয়ে। সেই চেহারায় লালিত্য এসেছে। চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়েছে। সে এখন হাসতে পারে, অভিমান করতে পারে। তার চারপাশে এখন ভালোবাসার অনেক লোক। মুখভার করে থাকলে তুলি এসে কাতুকুতু দেয়। মাইমারা ছুটে এসে জানতে চায় শরীর খারাপ কি না। দিদা এসে চুলের পরিচয্যা করেন। দাদু বলেন মজার মজার কথা। দীপা তার জীবনের মূল্য ফিরে পেয়েছে। দীপা দীঘল হয়েছে।
গাড়ি এসে গেল। দীপা সামনের আসনে মেজোমামার পাশে গিয়ে বসল। প্রশ্ন করল, কোথায় যাবে। রাস্তার দুপাশে বড় বড় নামকরা মানুষদের বাড়ি। হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের ‘কমল-আবাস’। উলটোদিকে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের ‘মহুয়া’, সেকালের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সুরেশচন্দ্র। সরকারের ‘উপলপথ’। ডাক্তার নীলরতন সরকারের ‘মাঝলা কুঠি’। যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘গোল কুঠি’। এই ‘গোল কুঠি’-র কাছে এলেই দীপার মনটা কেমন হয়ে যায়। সেই বিখ্যাত লেখক হারাধনের দশটি ছেলে। কোন ছেলেবেলায় দীপা পড়েছিল। গাড়ি জনপদ পেরিয়ে ফাঁকা মাঠে এসে পড়ল। বড়মামা বেশ বলেন, মাঠ যেন দু-হাত তুলে ছুটতে ছুটতে আকাশের কোলে গিয়ে পাথর হয়ে গিয়েছে। সত্যিই তাই, বহুদূরে কোথাও টিলা দেখলে মনে হয়, একটা শিশু আকাশের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।
জঙ্গল শুরু হল। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। দুপুরবেলাতেও ঝিঝির ডাক। দুটো কান ঝমঝম করছে। শাল, সেগুন, মহুয়া, বট, অশ্বখ। ফাঁকে ফাঁকে রোদ নেমেছে। গাড়ি কখনও উপরে উঠছে কখনও নামছে নীচে। ঢালুতে নামার সময় মেজোমামা স্টার্ট বন্ধ করে দিচ্ছেন। বৃষ্টির জলে রাস্তার দু পাশে ক্ষয়ে ক্ষয়ে গিয়েছে। নালা তৈরি হয়েছে। একটু অসাবধান হলেই গাড়ি পাশ ফিরে শুয়ে পড়বে।
মেজোমামা জিগ্যেস করছেন, ‘কি রে দীপা, তোর ভয় করছে?
‘একটুও না। ভীষণ ভালো লাগছে।’
‘দেখছিস তো, ভয়ের মধ্যেও একটা ভালো লাগা থাকে। যেমন ধর কালো। কালোর মধ্যে কিন্তু সব রং আছে।’
রাস্তা শেষ। মেজোমামা গাড়ি রাখলেন। সামনে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সঁড়িপথ চলে গিয়েছে। বেশ ঠান্ডা। শীতের কনকনে বাতাস। শুরু হল পায়ে হাঁটা। দুপাশে বড় বড় পাথর। পথও পাথরে। উঁচু-নীচু। জায়গায় জায়গায় মারাত্মক রকমের ঢালু। একটু অসাবধান হলেই গড়িয়ে পড়ে যেতে হবে। এত গাছ! দীপার চোখ যেন ঘোর লেগে যাচ্ছে। পৃথিবী কী ভয়ংকর রকমের উর্বর। জমির এত প্রাণ। মেজোমামা হঠাৎ গান ধরলেন,
প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে
মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ।
তব ভুবনে তব ভবনে
মোরে আরো আরো আরো দাও স্থান।
দীপা অবাক হয়ে গেল, মেজোমামার এত সুন্দর গলা! ‘তুমি গান গাও না কেন?’
‘গান!’ মেজোমামা একটা বড় পাথরের ওপর বসে পড়লেন, ‘গান!’ দু-চোখে জল টলটল।
‘তুমি কাঁদছ কেন?’
‘তোর মা এই গানটাই এখানে গেয়েছিল এইরকম এক শীতের বেলায়। তার মাকে ওরা মেরে ফেলল। তোর মায়ের গান শুনলে তুই পাগল হয়ে যেতিস। মাকে মনে পড়ে?
