একটা হাত ডাক্তারকে সস্নেহে বিছানায় টেনে নিল—’আর নয়, এইবার ঘুমোও। ভোর হয়ে এল। সারাটা দিন তোমার কোনও বিশ্রাম নেই।’
ডাক্তার স্ত্রীর কোলে ঢুকে যেতে যেতে ভাবছেন, এই কথাটা কে বলছে! একটা শরীর, যে শরীরের বর্ণনা আছে অ্যানাটমির পাতায়! না কখনওই না? এর উৎস অন্য কোথাও। গঙ্গা একটা নদী, হিমালয় থেকে সাগরে দিকে ছুটে চলা জলধারা। আর দেবী! সুরেশ্বরী ভগবতীগঙ্গে, সেই গঙ্গা
তো মানুষের বোধে। দীপার এই মেজোমামা দিন দিন এক অসাধারণ মানুষ হয়ে উঠতে। লাগলেন। কী যেন একটা খুঁজে বেড়াচ্ছেন! অর্থ, সম্মান, ভোগ, প্রতিপত্তি নয়। একটা উত্তর খুঁজছেন। রুগি দেখতে দেখতে ভাবেন, আমার কী করার আছে। যন্ত্র যিনি চালু করেছেন তিনিই বেঁধে দিয়েছেন আয়ু। যেদিন বন্ধ হবে সেদিন বন্ধ হবে। ভিতরে কলকবজা কার নির্দেশে চলছে! তোমরা জানো না, তোমাদের ভিতরে কী আছে! পেট একটা ল্যাবরেটারি, দুটো ফুসফুস তোমার হাপর, হার্ট শক্তিশালী এক পাম্প, কিডনি বিশাল এক ছাঁকনি, আর মস্তিষ্ক তোমার ব্রহ্মাণ্ড, ঘাড়ের পেছনে চেতনার ‘কেবল লাইন’। এসব আমরা ডিসেকট করে জেনেছি; কিন্তু জানতে পারিনি প্রথম শ্বাস তুমি কার ইচ্ছায় নিলে। ডাক্তার রুগি দেখেন, ভিজিট নিতে পারেন না। কার ডাক্তারি কে করে!
ডাক্তারের কেবলই মনে পড়ে জেনেসিসের কাহিনি। হয়তো সেইখানেই আছে তাঁর প্রশ্নের উত্তর।
এই জগকারণের পিছনে আছে এক ইচ্ছাশক্তি। লেট দেয়ার বিলাইট, অ্যান্ড দেয়ার ওয়াজ লাইট, অ্যান্ড ইট ওয়াজ গুড। মহা মহা অন্ধকার শূন্যে কে যেন ফিশফিশ করে বললেন, তমসো মা জ্যোতির্গময়। আলো আমার আলো। আলোয় ভুবন ভরে গেল। শতকোটি সূর্যের দীপ্তি। দিনের সূর্য, রাতের নক্ষত্র। জল, স্থল। সমুদ্র, নদী। প্রাণ, প্রাণী, লতাগুল্ম, স্থলচর, নভোচর। সৃষ্টির ষষ্ঠ দিবসে তৈরি করলেন শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। পৃথিবীর ধুলো থেকে পরম যত্নে। নিজের সামনে তাকে শোয়ালেন। তখনও নিষ্প্রাণ। দেন হি হিমসেলফ ব্রিদভ দিব্রদ অফ লাইফ ইনটু ইট। নাকের ছিদ্রপথ দিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন প্রাণবায়ু। চোখ মেলে তাকাল প্রথম মানব। সেই এক আজ কোটি কোটি অনন্ত যাত্রাপথ।
দীপাকে বললেন, ‘এই নে পড়। জোরে জোরে। আমাকে শোনা।’
রবীন্দ্রনাথ। ‘মহাস্বপ্ন’। দীপা পড়ছে, তিনি শুনছেন চোখ বুজিয়ে।
পূর্ণ করি মহাকাল পূর্ণ করি অনন্ত গগন,
নিদ্ৰাময় মহাদেব দেখিছেন মহান স্বপন।
বিশাল জগৎ এই প্রকাণ্ড স্বপন সেই,
হৃদয়সমুদ্রে তাঁর উঠিতেছে বিশ্বের মতন।
উঠিতেছে চন্দ্রসূর্য, উঠিতেছে আলোক আঁধার,
উঠিতেছে লক্ষ-লক্ষ নক্ষত্রের জ্যোতি-পরিবার।
উঠিতেছে, ছুটিতেছে গ্রহ উপগ্রহ দলে দলে,
উঠিতেছে, ডুবিতেছে, রাত্রিদিন আকাশের তলে।
একা বসি মহাসিন্ধু চিরদিন গাইতেছে গান,
ছুটিয়া সহস্র নদী পদতলে মিলাইছে প্রাণ।
দীপা দেখত মেজোমামার চোখ বেয়ে জল নামছে। দেহ স্থির। সবটা শোনার পর চোখ চেয়ে বলতেন, ‘বুঝলি, রবীন্দ্রনাথের সত্যদর্শন হয়েছিল। যত পড়বি, তত আনন্দ পাবি।’
মেজোমামা দীপাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। কোনও সময় কাছছাড়া করতেন না। বলতেন, ‘তোর মধ্যে আমি একটা অন্য জগৎ তৈরি করে দিয়ে যাব। শুয়ে শুয়ে ভাববি, তোর গায়ে সবুজ ঘাস গজিয়েছে, বিশাল এক গাছের শিকড় তোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নদী বয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। তুই হয়ে গেছিস আকাশ। সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র ফুটে আছে সেই আকাশে।’
দীপাকে তিনি ভর্তি করে দিলেন রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষার ক্লাসে। গিরিডিতে তখন বড় বড় মানুষের বাস। রবীন্দ্র বাতাস। ব্রাহ্মসমাজ। ব্রাহ্মমন্দির। উপাসনা। ঈশ্বরকে মানুষ তিনভাবে ধরতে চায় —গুণ সাকার, সগুণ নিরাকার, নিগুণ নিরাকার। ব্রাহ্মবাদে তিনি সগুণ নিরাকার। অখিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা তুমি। মেজোমামা দীপাকে নিয়ে ব্রাহ্মসমাজে যেতেন। তিনকড়ি বসু ছিলেন। আদি বাসিন্দা। তিনিই গড়ে তুলেছিলেন এই বাঙালি উপনিবেশ। কলকাতা থেকে যেসব বিশিষ্ট বাঙালি এখানে এসেছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ব্রাহ্মসমাজভুক্ত। নববিধান আর সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ দুটি ভিন্ন উপাসনা মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মেজোমামা দীপাকে নিয়ে নববিধানে যেতেন। পরিবেশটা দীপাকে খুব মুগ্ধ করেছিল। মহুয়ার বাতাস। শাল, সেগুনের প্রহরা। বোগেনভেলিয়ার বর্ণ বিস্ফোরণ, গোলাপের আভিজাত্য। এর মাঝে সুসংযত, শিক্ষিত নারী-পুরুষের মিলন। সবাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। সারস্বতচর্চাই তাঁদের ধ্যানজ্ঞান। স্বয়ং। রবীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে অবসর কাটাতে চলে আসতেন বারাগাণ্ডায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের সেই বোলবোলা দীপার সময়ে স্তিমিত হয়ে এলেও কিছুটা ছিল। মন্দির জীর্ণ। বাইরের দেয়ালে সময়ের শ্যাওলা। উপাসনা কক্ষে ধুলো আর ঝুল। কাঠে আর পালিশের জেল্লা নেই। তবু মিলন। অতীতকে ধরে রাখার চেষ্টা। এইখানেই মাঘ মাসের সন্ধ্যায় একজনের সুরেলা কণ্ঠে দীপা শুনেছিল ব্রহ্মসংগীত। মোহিত হয়ে গিয়েছিল। মেজোমামা কানে কানে বলেছিলেন, গানটির লেখক বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই সংগীতের পথে দীপা এক অন্যজগতে চলে গিয়েছিল। যে জগৎ ছিল তার মেজোমামার, পরে দীপা ওই গানটি শিখেছিল সুরমাদির কাছ থেকে। ওই গানটিকেই সে করতে চেয়েছিল তার জীবনের টাইটেল মিউজিক।
