এমন যদি হত, হঠাৎ কোনও ভাইরাসের আক্রমণে মানুষের বাইরের আবরণটা হয়ে গেল কাচের মতো স্বচ্ছ গ্লাসকেস। ভাইরাসটার নাম যদি হয় ফ্লোরেসেন্ট ভাইরাস। ডাক্তার ধীরে ধীরে কল্পজগতে প্রয়াণ করতেন। দু-হাত দূরে বিছানায় অকাতর ঘুমে তার সুন্দরী, শিক্ষিতা স্ত্রী। ট্রান্সপারেন্ট। ডাক্তার তার অ্যানাটমির জ্ঞান নিয়ে দেখতে পাচ্ছে। কালচে লাল, থলথলে একটা হৃদয় থির থির করছে। একাধিক আবরণে আবৃত। আবরণের পাটে পাটে এক ধরনের তরল পদার্থ। বুকের খাঁচার ভিতর একটু তেরছা করে আটকানো। তলায় পরদা উপরে আবরণ। দিন নেই রাত নেই ধক ধক করে চলেছে। ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা তরল পদার্থ যেন তেলের কাজ করে। পিচ্ছিল, হড়হড়ে করে রেখেছে। ওঠাপড়ার সময় আটকে না যায়। মুষ্টিবদ্ধ হাতের মতো পাঁচ ইঞ্চি লম্বা, সাড়ে তিন ইঞ্চি চওড়া। মেয়েদের হার্টের ওজন আট আউন্স, ছেলেদের দশ আউন্স। চারটে নল আটকানো।
সেই নলের চেহারা মোটেই সুদৃশ্য নয়। কিড়িকিড়ি। রিং রিং। সারা শরীর ভ্রমণ করে রক্ত হার্টে ঢুকছে। স্বচ্ছ মানুষের স্বচ্ছ আবরণের অন্তরালে শরীরের যাবতীয় যন্ত্রপাতি দৃশ্যমান। একটা। ভয়। এসব কী! মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দিবারাত্র কাজ করে চলেছে। হার্টের দু-পাশে ঝিল্লির আচ্ছাদনে দুটো ফুসফুস। বিচিত্ৰদৰ্শন দুটো বেলুনের মতো। গাছের শিকড়ের মতো শিরা উপশিরা জড়িয়ে আছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়মিত ছন্দে ফুলছে আর চুপসে যাচ্ছে। রক্তকণিকায় মিশছে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত লক্ষ লক্ষ শিরা-উপশিরার পথ ধরে শরীরের বিভিন্ন খণ্ডে ছুটে চলেছে। ডাক্তার তাঁর ঘোরলাগা চোখে দেখতে পাচ্ছেন। গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, কাবেরী, নর্মদা, গোদাবরী। কলস্বিনী রক্তনালিকা। মূল স্রোতধারা থেকে বেরিয়ে আসছে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ধারা। বাহিকা। নীল ধমনী। মিনিটে ষাট থেকে আশি, এই হল হৃদয়ের স্পন্দন ছন্দ। সেকেন্ডে একবার অথবা একের একটু বেশি। একবার ধক করা মানেই একশো তিরিশ। কিউবিক সেন্টিমিটার রক্ত হৃদয় থেকে বেরিয়ে গেল। তার মানে মিনিটে পাঁচ লিটার রক্ত পাম্প করছে হার্ট। একজন মানুষ যদি একশো বছর বাঁচে, তা হলে এই বিশ্বস্ত ক্ষুদ্র পাম্পটি ছ-লক্ষ টন রক্ত টানবে আর ছাড়বে। চল্লিশ কোটি হবে স্পন্দন সংখ্যা। ডাক্তার নিজেই ঘাবড়ে গেলেন। বুকের বাঁপাশে বসে আছে এই অবিশ্বাস্য শক্তিশালী যন্ত্রটি। সারাদিন ঘুরছি ফিরছি, অথচ একবারও খেয়াল হচ্ছে না। কে চালায়, আমি চলি বা কেন। হৃদয় কী ভয়ংকর শক্তি তোমার। পঁয়ত্রিশ সের ওজন মাটি থেকে একফুট তুলতে আমার মাংসপেশিকে যে-শক্তি খরচ করতে হয় সেই শক্তি তুমি প্রতি মিনিটে প্রয়োগ করছ। আমার হাত আর পায়ের পেশির শক্তির চেয়ে। তোমার শক্তি দ্বিগুণ বেশি। আমি ক্লান্ত হব কিন্তু তুমি অক্লান্ত কর্মবীর। তোমার শক্তির উৎস আজও খুঁজে পায়নি শরীরতত্ববিদ।
মেজোমামা গভীর রাত পর্যন্ত নিজের ঘরে বসে বসে কী করেন দীপা জানে না। মেজোমাইমাও জানেন না। ঘুমোতে ঘুমোতে মাঝে মাঝে চোখ খুলে বলেন, ‘এ কী এখনও আলো জ্বলছে, তুমি শোওনি। কী করছ কী এখনও?’
—তুমি ঘুমোও, আমাকে বুঝতে দাও, হোয়াই আই ব্রিদ। কে আমাকে প্রথম প্রভাতে বলেছিল, বাছা শ্বাস নাও। এই আমি চালিয়ে দিয়ে গেলাম। ইচ্ছে থাক আর না থাক, এ চলবে। শ্বাসই জীবন। আমিই আবার একদিন বন্ধ করে দিয়ে যাব। তখন তোমার ধমনীতে আর এক ফোঁটাও রক্ত থাকবে না। তাজ্জব কী বাত! কোথায় গেল সব রক্ত।
—তুমি বসে বসে ওই সব ছাইপাঁশভাবো, আমি ঘুমোই।
—সেই ভালো। জানলেই তুমি পাগল হয়ে যাবে।
প্রাচীনকালের শরীরতত্ববিদদের কথা মনে পড়ে গেল ডাক্তারের। কবর থেকে মৃতদেহ তুলে এনে ফালাফালা করে দেখছেন কোথায় কী আছে। সাধারণ মানুষের চোখে তাঁরা পিশাচ। মৃতদেহ কেটে তাঁরা শরীরের ছবি তৈরি করছেন, অ্যানাটমি। হাড়ের খাঁচার রহস্য সন্ধান করছে। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো স্কেচবুকে নকশা আঁকছেন। অধ্যাপকের গোপন ঘরে কঙ্কাল ঝুলছে। কতিপয় ছাত্র। তারা কঙ্কালতত্ব বোঝার চেষ্টা করছে। মৃত মানুষের ধমনিতে রক্ত নেই দেখে তাঁরা সিদ্ধান্ত করলেন, জীবন্ত মানুষের এই নালিকায় বাতাস থাকে। এর নাম রাখো আর্টারি। পরে যখন জ্ঞান আরও হল, জানা গেল, না, ধমনি হল এক একটি রক্ত নদী, তখন কিন্তু নামটা আর বদলানো হল না। এয়ার ট্র্যাক্ট, আর্টারিই রয়ে গেল। ডাক্তার আর ভাবতে চাইলেন না। শুয়েই পড়ি বলে স্ত্রীর পাশে এসে শুয়ে পড়লেন। পাশ ফিরে শুয়ে আছে রমণীয় একটি নারী দেহ। গৌরবর্ণ তৃক। তার তলায় একপুরু মেদ, মাংসপেশি। শিরা, ধমনী, কঙ্কাল। এর কোথায় আছে প্রেম, প্রীতি, সৌন্দর্যবোধ। এ তো একটা যন্ত্র। তবু কেন তোমাকে এত ভালোবাসি। মানুষ কি তা হলে মানুষের ভিতরে নেই। মানুষের অনুভূতি কি বাইরে আছে!
নিশীথ রাতের আকাশে। নদীর বুকের উপর দিয়ে বহে যাওয়া বাতাসে। স্ত্রীর চওড়া পিঠে হাত রেখে ডাক্তার শুয়েছিলেন। আবার উঠে বসলেন ধড়মড় করে। তাকিয়ে আছেন দেয়াল ঘড়িটার দিকে। ঘড়িতে কি সমস্যার সমাধান আছে। প্রশ্ন আছে। মহা প্রশ্ন। সময় কোথায় আছে। ঘড়ির ভিতরে, না বাইরে? ঘড়ির কাঁটাদুটো আর ডায়ালের অক্ষরগুলো খুলে নিলে কী হয়। নির্বোধ টিক টিক। স্প্রিং, পিনিয়ন, হুইল, ব্যালেন্স। একটা যন্ত্রমাত্র। সময় তো আছে মহাকালের স্রোতে। সময় আছে মানুষের বেঁচে থাকার বোধে। যন্ত্র, কাঁটা, অক্ষর তিনের মিলনে সময়। ভাষাতে কি মনের ভাব প্রকাশ পাবে যদি না বোধ দিয়ে সাজানো যায়। যদি বলি, গেলাস, পাথর কাঠ। পাথরের গেলাসে মেঘের জল, তা হলে কত কী প্রকাশিত হল একই সঙ্গে। শব্দের পিছনে কণ্ঠযন্ত্র যন্ত্রমাত্র, বোধটাই সব। এই বোধ তো যন্ত্রে নেই। দেহযন্ত্রে জীবন আছে, অ্যাকশন, মোশন আছে। চেতনা কোথায় আছে, বোধ আর বোধি কোথায় আছে। জন্ম আর মৃত্যু তো মানবসভ্যতা নয়, যুদ্ধ বিগ্রহ, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, সাহিত্য-সংস্কৃতি, নৃত্য-গীত সবই তো বোধের প্রকাশ। তা যদি না হত, তা হলে কীটেরও তো সভ্যতা তৈরি হত। নর্তকীর নৃত্য তার শরীরে আছে, না। সবোধে মুদ্রায়। তাই যদি না হবে, তা হলে পিস্টনের ওঠাপড়াকেও তো নাচ বলতে হয়।
