দীপার আলাদা ঘর। পেছনের বারান্দায় দাঁড়ালে সীমানার ওপারে খোলা জমি দুহাত তুলে ছুটে চলে গেছে পরেশনাথ পাহাড়ের দিকে। শাল আর মহুয়ার জঙ্গল। লাল কাঁকর। হঠাৎ কোথাও বিশাল একটা পাথর। পাহাড়তল্লাট ছেড়ে সমতলে বেড়াতে এসে আর ফিরে যেতে পারেনি। দূর থেকে কে যেন ডাকে, দীপা।
মুক্তির ডাক।
দাদুর কাছে বসে রাতের বেলা দীপা বাঙালির গল্প শোনে। একশো বছরের পেছনের ইতিহাস। দাদুর ধবধবে সাদা চুলদাড়ি। বড় বড় উজ্জ্বল চোখ। সাদা পাঞ্জাবি। রূপকথার মানুষ যেন। মধুপুর থেকে গিরিডি আসার ব্রাঞ্চ লাইন পাতা হল ১৮৭১ সালে। সেই কাজের ঠিকাদারি পেয়েছিলেন হুগলি জেলার গোষ্ঠ কুণ্ডু। প্রকৃতির প্রেমে পড়লেন কুণ্ডুমশাই। তেমনই জলের গুণ। নির্মল বাতাস। গোষ্ঠবাবু গিরিডিতে জমিদারি কিনে ফেললেন। মধুপুরেও কিনলেন। এই ছোটনাগপুর অঞ্চলটার একটা মায়া আছে। মানুষকে বড় টানে। সন্ন্যাসিনীর মতো সুন্দরী। অবাঙালিরা এই গোষ্ঠবাবুকে বলত, ‘বাবু তো বাবু গোষ্ঠবাবু।’ ১৮৮২ সালে একদল জার্মান। এলেন। তখন তো জানাজানি হয়ে গেছে, গিরিডির মাটির তলায় সম্পদ আছে—তামা মাইকা উঁচু জাতের কয়লা। জার্মান সায়েবরা খোঁজ খোঁজ করে বারগান্ডায় খুঁজে পেলেন তামা। খোলা হল ‘বারগান্ডা কপার করপোরেশন’।
দাদুর কাছে সেকালের গল্প শুনতে শুনতে তার কল্পনা আরও ঘন হত। কল্পনার চোখে তৈরি হত অতীত চিত্র। দীপা সেই বিদেশিদের দেখতে পেত। শুনতে পেত পাথরে গাঁইতির শব্দ। বিদেশি বাংলোর লণ্ঠনের আলো। আদিবাসী রমণী। মহুয়ার গন্ধ। মাতাল ভালুক। আটবছর ধরে লোকসান দিয়ে নব্বই সালে জার্মান সায়েবরা কারবার গুটিয়ে ফেললেন। লোকসানের কারণ, যোগাযোগের তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই। পথঘাটের অভাব। তামা পরিশোধনের জন্যে যে প্ল্যান্ট দরকার তাও বসানো গেল না। এই নব্বই সালেই বাঙালিরা এলেন। কিনে ফেললেন সায়েবদের যত বাংলো। এই বাঙালি সেটলমেন্টের নেতা ছিলেন, গিরিডির আদি বাসিন্দা তিনকড়ি বসু। তাঁরই আকর্ষণে বাঙালিরা ছুটে এলেন। তামার ব্যবসা যিনি কিনলেন তাঁর নাম জে এন দে। জে এন দে-র মেয়ে রেবা একজন নামকরা অভিনেত্রী।
এইসব শুনতে শুনতে দীপার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসত। বাংলোটা তার দাদু কিনেছেন, সেটাও এক জার্মান সাহেবের ছিল। অনেকটাই অদলবদল করা হলেও, আদলটা বিলিতি। বড় বড় ঘর, টানা বারান্দা। ঘোরাফেরা করলেই মনে হয় বেশ উদার। কোনও সঙ্কীর্ণতা নেই।
দাদু খুব মিষ্টি করে বলতেন—দিদিভাই, তোমার খুব ঘুম পেয়েছে, চোখের পাতা ভিজে আসছে।
দীপা তার দক্ষিণের কোণের ঘরে এসে শুয়ে পড়ত। পরিষ্কার বিছানা, ধবধবে মশারি। দক্ষিণের জানালা দুটো ভোলা। শুয়ে শুয়ে ভাবত, দাদুর মতো সুন্দর মানুষ যেন হয় না। চোখের পাতা ঘুমে ভিজে এসেছে। সে কেমন? ঘুম কি কোনও তরল পদার্থ! এই দাদুর কাছ থেকেই দীপা পেয়েছিল কবির মন, ভাষা, উপমা। নারকোল গাছের ঝিরিঝিরি পাতার মতো চোখের পাতা। নারকোল গাছের পাতায় যখন চাঁদের আলো পড়ে জ্যোৎস্নার রাতে। তখন মনে হয় যেন ভিজে গেছে। চাঁদের আলো যেন তরল দুধ।
জানালার দিকে পাশ ফিরে আকাশ। আকাশের গায়ে আঁকা মহুয়ার টোপা টোপা পাতা। ফুলের গন্ধ নাকে নিতে নিতে, অদ্ভুত অদ্ভুত সব কল্পনায় ভাসতে ভাসতে দীপা চলে যেত ঘুমের দেশে। ঘুমের কোনও দেশ আছে? অবশ্যই আছে। মানচিত্রে মিলবে না। কিন্তু জল আছে, হল আছে, আছে কানন-পাহাড়। বিছানায় শুয়ে ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে দীপার মনে হত, এই সময় কোনও নরম শরীর যদি তাকে জড়িয়ে ধরত। নরম শরীরের উষ্ণতা। পিঠের কাছে নরম একজোড়া বুকের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠাপাড়া। নরম একটা জানুর তার কোমরের কাছে চেপে বসা। তার বুকের কাছে লেগে থাকা নরম একটা হাত। মুক্তো যেমন ঝিনুকের শ্লেষ্মর আবরণে মাখামাখি। হয়ে থাকে, রাতের নির্জন অন্ধকারের কোলে সেইভাবে থাকা ঘাড়ের কাছে খোপার নীচে ঠেকে থাকা একটা নাকের নরম নিঃশ্বাস। এই নেশাটা ধরিয়ে দিয়ে গেছে সেই মহিলা, যে তার ঠাকুরদার সেবা করত কলকাতার বাড়িতে। সাদা ব্লাউজ, সাদা শাড়ি। শরীরে ওষুধের গন্ধ। ঘামের গন্ধ, চুলের গন্ধ। কী একটা মশলা চিবোতো। মুখে সেই মশলার গন্ধ। পুরু দুটো ঠোঁট। জোড়া ভুরু। অন্ধকার কালো চোখ। সেই দেহের আলিঙ্গন, উত্তাপে দীপার শরীর ঘেমে উঠত। সে পাশ ফেরার সময় দীপাকে জড়িয়ে ধরেই পাশ ফিরত। দীপা তার শরীরে উপর দিয়েই। এপাশ থেকে ওপাশ চলে যেত। সে তার পিচ্ছিল ত্বকে হাত বোলাতে বোলাতে বলত, তোর স্কিন সিল্কের মতো। তোকে ছেড়ে আমি থাকব কেমন করে। এই কথা বলে সে পাগলের মতো আদর করত। তখন তাকে মনে হত নারী-পুরুষ। বিছানার চাদর কুঁচকে যেত। বালিশ ছিটকে চলে যেত খাটের বাইরে। সেই আদরের হাতে দেহ-সমর্পণ করতে দীপার খুব ভালো লাগত। মনে হত। সবটাই অন্যরকম। স্বাভাবিক নয়। একটু ভয়ের; কিন্তু খুব মজার, ভীষণ আরামের।
এই একলা ঘরে, সাদা বিছানায় শুয়ে দীপার সেই অভাববোধটা ফিরে আসত। একটা আকাঙ্ক্ষা। এপাশ-ওপাশ করতে করতে একসময় ঘুম। পাশের ঘরেই মেজোমামা। আলো জ্বলছে। কিছুটা ছিটকে গিয়ে লেগেছে গাছের পাতায়। অনেক রাত পর্যন্ত মেজোমামা লেখাপড়া করতেন। দেশ বিদেশের ডাক্তারি ম্যাগাজিন বই। এই অঞ্চলের মানুষের সাধারণ চিকিৎসায় এতটা জ্ঞানের প্রয়োজন হয়তো ছিল না। কিন্তু জ্ঞানের স্পৃহা ছিল অসীম। মানুষের শরীরই তো জটিল এক দর্শন। অদ্ভুত সব ভাবনা আসত। অনেক সময় উদ্ভট।
