দীপার বাবা এলেন সম্পত্তির ভাগ বুঝে নিতে। না, একান্নবর্তী পরিবার আর নয়। যে যার স্বাধীন। এমনকী, ব্যবসাও ভাগ করতে হবে। আমার আমার, তোমার তোমার।
জ্যাঠামশাই বোঝাতে চেয়েছিলেন, তুমি ধ্বংস হবে। তুমিও বাঁচবে না।
নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে কারও মঙ্গল হবে? তুমি বরং তোমার শেয়ারটা আমাকে বিক্রি করে দাও। এই মাল খালাসের ব্যবসা তোমার ধাতে সইবে না।
দীপার বাবা টোপটা গিললেন। মাথায় তখন সিনেমা নাচছে। পরামর্শদাতা অনেক। দীপার বড় মামা এসে বললেন, মনে কর, তোর বাবা-মা দুজনেই মারা গেছে। তুই আমার সঙ্গে চ। দেখি তোকে মানুষ করা যায় কি না। এই তাসের বাড়ি এইবার ভাঙবে।
কলকাতার বন্দরে বড় জাহাজ আর তেমন ভিড়ছে না। আমদানি, রপ্তানি কমছে। ইংরেজ আমলের সেই বিপুল বোলবোলা আর নেই। ফিরবেও না কোনওদিন। দক্ষিণে নতুন নতুন বন্দর তৈরি হয়েছে। বড় জাহাজ সব ওই দিকেই ভিড়বে। এদিকে শুধু ইনকিলাব হবে।
দীপার জ্যাঠামশাই আর কাকা একটু আদিখ্যেতা করলেন লোক দেখানো। আসলে সবাই খুশি। বাপ আর মেয়ে দুজনেই ছাঁটাই। একটা চরিত্রহীন, আর একটা মা-মরা আদুরি। পরের দায়িত্ব কে ঘাড়ে নেবে। কলাগাছের মতো চড় চড় করে বাড়ছে। বখাটেরা তাকাতে শুরু করেছে। মায়ের মতো শরীর পেয়েছে, এখন বাপের মতো স্বভাবটা পেলেই হয়েছে আর কী! কে সামলাবে।
এইসব কথা প্রকাশ্যেই হল। যাও বাছা, বাপের সিনেমায় এইবার বুক খুলে নাচো। নায়িকা হও। বড়মামার হাত ধরে দীপা চলে এল মামার বাড়ি। দুই মামা। দাদু, দিদিমা। মামারা খুব মজার মানুষ। কারবারি, কিন্তু শিক্ষিত। গিরিডি আর কোডার্মায় মাইকার কারবার। পয়সার অভাব নেই। দুই ভাইয়ে খুব মনের মিল। বারগণ্ডায় বিশাল বাড়ি। ছবির মতো বাগান, লন। দীপা যেন। প্রকৃতিতে মুক্তি পেল। মুক্তি পেল সুস্থ জীবনে। বোতল নেই, গেলাস নেই, সিল্কের লুঙ্গি নেই, স্যান্ডো গেঞ্জি নেই। মাংসল দেহ নেই। খিস্তি, খেউড় নেই। সদা হাসিখুশি শান্ত একটা পরিবার। বড়মামার মেয়ে তুলি ছিল দীপারই সমবয়সি। সবসময় হেসেই আছে, ফুলের মতো ফুটেই। আছে, শুকোতে জানে না। শিশিরের মতো দুটো চোখ। বড়মাইমা সবসময় সেজেগুঁজে থাকেন, একেবারে টিপটপ। বাড়িটার কোথাও এতটুকু ময়লা নেই, দুর্গন্ধ নেই। মাছের কাঁটা পিপড়ে। টেনে নিয়ে যাচ্ছে, ইঁদুরে মাংসের হাড় নিয়ে ধস্তাধস্তি করছে, এ দৃশ্য চোখে পড়ছে না। প্রকাশ্য তারে ফাঁদালোশায়া বাতাসে ফুলে ফুলে উঠছে না। যেমন-তেমন ভাবে ব্যবহৃত বাথরুমে। মেয়েদের ভেঁড়া বুকের মতো বক্ষবন্ধনীর ঝুলে থাকা অসভ্যতা নেই। মামার বাড়িতে এসে দীপা ধরতে পারল তার মনের সংস্কারটা কী। সে বৈষ্ণব। শান্ত, দাস্য, সখ্য, মধুর এই চারটি ভাব তার মনে বাসা বেঁধে আছে। সে চায় মধুরকে। রাক্ষস স্বভাবের মানুষকে সে ঘৃণা করে। পৈশাচিক পরিবেশে তার প্রবল ভয়।
দীপার মেজোমামা ছিলেন আর এক সুন্দর মানুষ। গিরিডির নামকরা ডাক্তার। সাংঘাতিক প্র্যাকটিস। নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই। তিসরি আর তার আশপাশের কয়লা ও মাইকা। মাইনসের শ্রমিকরা ভিড় করে থাকে। গলায় স্টেথিস্কোপ ঝুলিয়ে ডাক্তার ছুটে বেড়াচ্ছেন। টাকাপয়সা কে কী দিচ্ছে খেয়ালই নেই! মাঝে মাঝে মনের আনন্দে শিস দিতেন। ফাঁকা মাঠ পেলেই এক রাউন্ড ছুটে নিতেন। বলতেন, বাছুরের আনন্দ, ছাগল ছানার নাচ, বাচ্চা কুকুরের দুষ্টুমি—এই তিনটেকে এক করে নিজের ভিতরে ঠিক ঠিক আনাটাই হল সাধনা। পয়সায় কী হয়। গুচ্ছের খাওয়া হয়। তারপর বাথরুমে নামিয়ে দিয়ে আসা হয়। আনন্দই হল জীবের শ্রেষ্ঠ খাদ্য। থেকে থেকে চিৎকার করে গেয়ে উঠতেন,
আকাশভরা সূর্য-তারা বিশ্বভরা প্রাণ
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বড়োমাইমা আর মেজোমাইমাকে মনে হত দুই বোন। ‘দিদি, দিদি’ বলে সর্বক্ষণ পেছন পেছন ঘুরত মেজো। বড়র অনুমতি ছাড়া কিছু করত না। দুজনের মিল দেখে দীপা ভীষণ আনন্দ পেত। পৃথিবীর ভালো দিকটা দেখতে কী ভালো লাগে।
একটা আস্তাবল ছিল বিরাট। তিনটে তাগড়া ঘোড়া। চেস্টনাট ব্রাউন কালার। বড়মামা সেই ঘোড়ায় চড়ে দূর পাহাড়ের খনি অঞ্চলে চলে যেতেন রোজ সকালে। দুটো গাড়িও ছিল—একটা জিপ, একটা মোটর। দীপা নরক থেকে স্বর্গে এল। তার দাদামশাই কেন ওই বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন? পয়সা দেখে, পয়সা ছাড়া ওদের আর কী আছে! যে বাড়িতে একটাও বই নেই সে বাড়ি কেমন বাড়ি। মা তার মরে বেঁচেছে।
বড়মামা মেজোমামাকে বললেন, দীপাকে কীভাবে মানুষ করা যায়। ওর তো মনে ভীষণ দুঃখ।
কীসের দুঃখ?
মা নেই, বাবা থেকেও নেই। এটা একটা কম কথা!
আমরা সবাই কী করতে আছি। ওকে আমরা ডাক্তার করব।
ওর মতো কোমল, ভাবুক মেয়ে ডাক্তার হতে পারবে না, ওকে আমরা অধ্যাপিকা করব।
আমার লাইনটা তাহলে লোপাট হয়ে যাবে।
তোর ছেলে হলে, ছেলেকে ডাক্তার করবি।
কবে হবে তার ঠিক নেই।
দীপার মনে আছে, টুকটুকে ফরসা মেজোমামা কাঁচা শাকসবজি, খোসাসুদ্ধ ফলপাকড় কশমশ করে চিবিয়ে খেতে খুব ভালোবাসতেন। তিনি কশমশ করে শশা খেতে খেতে আস্তাবলের দিকে চলে গেলেন। দুঃখ-দুঃখ মুখ। পাঁচ বছর বিয়ে হয়েছে কোনও ছেলেপুলে হয়নি। সেই কারণেই দীপাকে আঁকড়ে ধরতে চান। মাইকা মাইনে তখনও অনেক সায়েসুবো। ব্যবসা সূত্রে এই পরিবারের সঙ্গে তাদের খাতিরও যথেষ্ট। দীপাকে বিলেত পাঠিয়ে স্পেশ্যালিস্ট ডাক্তার করিয়ে আনতে পারলে আর কোনও ভাবনা থাকবে না। এখনও সময় আছে যা করার করে নাও। অ্যায়সা দিন নেহি রয়েগা। হঠাৎ মনে হল, কোন ভবিষ্যতের কথা ভাবছি। দীপা বড় হবে, তবে তো। ততদিনে বাঙালি শেষ হয়ে যাবে। সময় খুব নিষ্ঠুর।
