বেলা দশটা বেজে গেল, তখনও দীপার বাবা কিন্তু এলেন না। কলকাতার এক হোটেলে বসে আসেন অন্য জগতে। দীপা এখন বোঝে, ফেটাল ওম্যান কাকে বলে। বিষকন্যা, নাগিনী। কলেজে সে লুইসের ‘দি মঙ্ক’ বইটি পড়েছিল। পাঠ্য হিসাবে নয়, পড়তে বাধ্য হয়েছিল তার ইংরেজির অধ্যাপকের অনুরোধে। ছোট্টখাট্টো হাসিখুশি মানুষটি। অনেকটা পাকা নারকোল কুলের মতো দেখতে। চকচকে উজ্জ্বল। একমাথা কালো কোঁকড়া চুল। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন। কোনও কৃত্রিম গাম্ভীর্য ছিল না। দীপার সঙ্গে অদ্ভুত একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। দীপা এখন বোঝে, সেই খোলামেলা, বালকস্বভাবের মানুষটিকে সে ভালোবেসেছিল। সবুজ মাঠের মতো, স্বচ্ছ জলে লুটিয়ে থাকা আকাশের মতো, ঝাঁকড়া একটা মহুয়া গাছের মতো। সেই কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারেনি দীপা। লজ্জা করছিল। একজন অধ্যাপককে কী সেইভাবে ভালোবাসা যায়! সম্পর্ক যে গুরু-শিষ্যের। সেই অধ্যাপক ছিলেন অবিবাহিত। কলেজ স্ট্রিটের এক বনেদি বাড়ির তিনতলায় একা থাকতেন। দীপা প্রায়ই সেখানে যেত। লাশের খাটে গেরুয়া চাদরপাতা বিছানা। লাগোয়া ছাদে ছিল অ্যাসবেস্টারের ছাউনিতে একটা রান্নাঘর ও বাথরুম পাশাপাশি। রান্নাঘরে অন্য কোনও রান্নার ব্যবস্থাই ছিল না। ছোট্ট একটা টেবিলে চায়ের সরঞ্জাম। হিটার, কেটলি, কাপ-ডিশ, ছাঁকনি এইসব। কৌটোয় বিস্কুট, চানাচুরি, নিমকি। অনেকটা সন্ন্যাসীর আস্তানার মতো। ঘরে সবসময় বাতাবিলেবুর গন্ধ। খোলা ছাদে ব্যায়ামের সাজসরঞ্জাম—ডাম্বেল, বারবেল, মুগুর। অনেক সময় রামকৃষ্ণ মিশনের। সন্ন্যাসীরা আসতেন। তখন বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ, গীতার চর্চা হত। স্বামীজি, ঠাকুরের নানা প্রসঙ্গ। দীপা মেঝেতে বিছানো দড়ির কার্পেটে বসে মুগ্ধ হয়ে শুনত। ওইসব আলোচনা তার ভীষণ ভালো লাগত। মনে মনে অন্য জগৎ থেকে ভিন্ন একটা বাতাস ভেসে আসছে। নীচে। কলেজ স্ট্রিটের ডাবপট্টির হইচই। কিছু উপরেই মশগুল আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ। একই বেঁচে থাকার কত প্রবাহ।
বন্ধুর মতো সেই অধ্যাপক রোমান্টিক অ্যাগনি বোঝাতে গিয়ে দীপাকে বইটি দিয়েছিলেন বাড়তি পাঠ্য হিসাবে। এক সাধুর পতনের কাহিনি। জীবকোষ কুরে কুরে খায় কামনার কীট। সুতো যদি কারও লাটাইয়ে থাকে, সে-লাটাই ধরা আছে রিরংসার হাতে। ও তার নড়াচড়া, ওঠাবসা সবই। সেই কামকুঞ্জে। সর্বনাশা আকর্ষণ তার। গভীর রাতে সেই কাহিনি দীপা পড়েছিল বিছানায় আধশোয়া হয়ে। নায়িকার নাম মাটিলভা। নায়কের নাম সন্ন্যাসী অ্যামব্রোসিয়া। ঘটনাস্থল একটি আশ্রম। অ্যামব্রোসিয়ার আশ্রমে মাটিলভা এসেছিল বৈরাগী, সমাজসেবিকা রূপে। ধরা যায়নি। তার আসল রূপ। কত প্রশংসা তার। নিঃস্বার্থ সেবিকাসুন্দরী। দিন যায়, সে তার প্রলোভনের জালে জড়াতে চায় আদর্শবাদী সন্ন্যাসীকে। তুমি ত্যাগী, চরিত্রবান, সংযমী। তোমাকেই আজি জয় করব। মাকড়সার জালে পতঙ্গের মতো। তোমার প্রতিরোধের দুর্গ ভেঙে যাবে। সেদিন ছিল চাঁদের আলোর রাত। আশ্রমের একটি গ্রামীণঘর। কালো পাথরে দুধের মতো লুটিয়ে আছে। চাঁদের আলো। মাটিলভা বলছে, এসো আমার বাহুবন্ধনে। ইন্দ্রিয়ের সেবাই পাশব ধর্ম। নিগ্রহ এক মানসিক ব্যাধি। নদী জানি যাবেই চলে সাগরের পানে। ঝিমঝিম নিশুতি রাত। পুরোনো। ফার্নিচারে ঘুণপোকার শব্দ। দূরপ্রান্তরে শেয়ালের ডাক। গির্জার নিঃসঙ্গ চূড়ায় রাতের আকাশ বাতাসে শীত। পাহাড়ের মাথায় বরফের কিরীট। যুবক সন্ন্যাসীর প্রতিরোধ, তুমি চলে যাও, এ আমার পথ নয়। আমি নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক সন্ন্যাসী।
সুন্দরী নায়িকা বলছে, সন্ন্যাসী। আমার হাতে কী দেখেছ?
চাঁদের আলোয় ঝিলিক মারছে চকচকে ছুরি। তুমি যদি প্রত্যাখ্যান করো, এই ছুরি আমি আমার বুকে বসাব। ফড়ফড় করে সে তার নানের পোশাকের বুকের দিকটা ছিঁড়ে ফেলল। বর্তুলাকার বুকের আধখানা ছিটকে বেরিয়ে এল।
লেখক বর্ণনা দিচ্ছেন। চকচকে ছুরির ফলা বাতাবিলেবুর মতো বাঁ-দিকের বুকে ঠেকানো। উঃ সে কী বুক! এই হল নারীর স্তন। চাঁদের আলো সোজা সেই বুকে এসে পড়েছে। সেই ঝকঝকে সাদা বুকের দিকে তাকিয়ে সন্ন্যাসী স্তম্ভিত। ঈশ্বর কী তার চেয়ে অন্য কোনও সৌন্দর্যের সন্ধান দিতে পারেন। শরীর মুচড়ে দিতে পারে অন্য কোনও এমন বস্তু। চোখ ফেরাতে পারছে না। তৃষ্ণা, আগ্রহ, আবেগ। একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে, ছিঃ ছিঃ, তুমি সন্ন্যাসী। প্রলোভন, দেহবাসনা, পাপ। তাকিও না। কিন্তু আনন্দ। এ কী আনন্দ! সারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আগুন। ধমনীর রক্ত টগবগ করে ফুটছে। চোখে আগুন। বহুতর পাশবিক কামনায় শরীর কাঁপছে। মাত্র আড়াই হাত দূরে। সেই লোভনীয় প্রলোভন চাঁদের আলোয় ধকধক করছে। সন্ন্যাসী হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘দাঁড়াও। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিনা। মোহিনী। তুমি দাঁড়াও, আমার সর্বনাশের জন্য তুমি দাঁড়াও।’
সন্ন্যাসী সেই সুন্দরীর ক্রীতদাসে পরিণত হলেন। আমি বলছি, তুমি করো। পাপ করো, ধ্বংস হয়ে যাও, সংসার, ঈশ্বর, সম্পর্ক সব ধুস। ইন্দ্রিয়ই একমাত্র সত্য। অপরাধেই বাঁচার উত্তেজনা। যে-অভিনেত্রীর ফাঁদে দীপার বাবা ধরা পড়েছিলেন সেই মহিলা ওই ম্যাটিলভার মতোই। রূপালি পর্দায় দীপা তাকে দেখেছিল। ভয়ঙ্কর একটা শরীর, অভিনয় যেমনই হোক। দীপা জানে, সত্য একটাই, দেহ, ইন্দ্রিয়, ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব। ছেলে, মেয়ে, দাদা, বউদি কিছুই কিছু নয়। আমি খাব, আমি পরব, আমি রমণ করব, আমি অসুস্থ হব, আমি মরে যাব। এর বাইরে যা কিছু সব ভণ্ডামি। ওই যে অধ্যাপক, তিনিই বা কেন বইটা পড়তে দিয়েছিলেন দীপাকে। কোনও প্রয়োজন ছিল কী? তিনি পড়েছেন। পড়ার পর সেই চোখে দীপার দিকে তাকাচ্ছেন। সে এক ভয়ংকর অস্বস্তি! অমন করে কী দেখছেন? প্রশ্নটা মুখের উপর করা যায় না। কিন্তু প্রশ্নটা আসে।
