শান্ত করার আর প্রয়োজন হল না। তিনি এক ধাক্কায় ছিটকে পাশে সরে গেলেন। মেয়র এসেছেন। মেয়র। সারা বাড়িতে একটা ঢেউ খেলে গেল। লম্বা, কৃশ এক ভদ্রলোক, সাদা ট্রাউজার, কোট, পায়ে অক্সফোর্ড শু। চারপাশে চারজন স্তাবক। মশমশ করে ঢুকলেন। একজনের হাতে একটা পদ্মফুলের রিং। দীপার জ্যাঠামশাই আর কাকা কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ধিতিং ধিতিং করে নাচছেন। সাধারণ আত্মীয়স্বজনরা ছিটকে সরে যাচ্ছেন। কাকা ইংরেজিতে বলছেন, ক্লিয়ার আউট, ক্লিয়ার আউট। জ্যাঠামশাই বলছেন, ভিড় হাটাও, ভিড় হাটাও।
মেয়র মৃতদেহ স্পর্শ করবেন না। ইনফেকশনের ভয় আছে। সঙ্গের একজনকে ইশারা করলেন। তিনি ফুলের রিংটা মৃতদেহের বুকের উপর রাখলেন। মেয়র একটা নমস্কার করে বললেন, ‘যথেষ্ট বয়েস হয়েছিল।’
সবাই বললেন, ‘তা ঠিক, তা ঠিক।’
‘এর পর আর বাঁচা উচিত নয়।’
‘অবশ্যই নয়, অবশ্যই নয়।’
‘আই লাইক টু ডাই ইয়াং।’
ভদ্রলোক হয়তো ষাটে পৌঁছেছেন। ভাবছেন ইয়াং। আহারাদি ভালোই হয়। রাতের দিকে দু পাত্তর স্কচ চড়ান। পার্টি পেছনে আছে। এত বড় একটা শহরের মালিক। যুবক তো বটেই। তাঁর এই ডাই ইয়াং শুনে সবাই হায় হায় করে উঠলেন, ‘মরবেন কী স্যার। আপনার মতো মানুষের। অমর হওয়া উচিত। জনগণ আপনাকে চায়।’
মেয়র বললেন, ‘সেটা কোনও কথা নয়। চায় বলেই যে বাঁচতে হবে এমন কোনও কথা নয়। আমার কথা, নড়বড়ে শরীরে বাঁচার কোনও মানে হয় না।’
সবাই বললেন, ‘তা ঠিক, তা ঠিক।’
মেয়র কথা বলতে বলতে মার্বেলপাথর বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। চামড়ার জুতো। স্লিপ না। করে। চারজন বডিগার্ড সতর্ক। এদিকে সার্ভিস দিলে ওদিকে আসবে। মানুষটার কাছ থেকে কত কী বাগিয়ে নেওয়ার আছে। এ তো মানুষ নয়, ভক্তবাঞ্ছা কল্পতরু।
দীপা একপাশেদাঁড়িয়ে সব দেখছে। বড়লোকের কী খাতির। বড় পিসিমা রেগে চলে যাচ্ছেন। হাইপ্রেসার। ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলে কী হত! সেরিব্রাল অ্যাটাক। কে তখন দেখত আমাকে। মেয়র এসেছে তো কী হয়েছে। পিসেমশাই ঠান্ডা করার চেষ্টা করছেন, কাজের বাড়িতে এমন হয়। তোমার এই রাগটা একটু কমাও মান্তু।
এক ঝটকায় স্বামীর হাত সরিয়ে দিয়ে মান্তু বললেন, ওই জন্যই তো এই মড়াদের বাড়িতে আমি আসতে চাই না। নিজের বাপ, তায় আবার মারা গেছে, বলতে নেই তবু বলছি, কতগুলো জানোয়ারের জন্ম দিয়েছিল।
ছোটোর বউ পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে শুনে ফেলল। সাপ যেমন থমকে দাঁড়িয়ে ফণা তোলে। সেইরকম ফোঁস করে উঠল, তার মধ্যে তুমিও পড়ো ঠাকুরঝি। তুমি যে কী সে তোমার স্বামী জানে।
আর তুই কী সে আমরা জানি ঢলানী মাগি। তোর গুণের তো ঘাট নেই। শ্বশুরের কোলে উঠে বসে থাকতিস।
আর তুই কী করতিস! ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতিস।
বুড়ো কত্তা ওদিকে খাটে কাঠ হচ্ছে, এদিকে দুই বাঘিনীর খামচাখামচি। মেয়েরা ঝগড়ার। সূত্রপাতেই তুই আর মাগিতে যাবেই যাবে। আর সব অপরাধের সেরা হল যৌন অপরাধ। আর। যত লুকিয়ে চুরিয়েই করো প্রকাশিত হবেই। অনেকটা চিকেন পক্সের মতো। ব্যাপারটার মধ্যে অন্য কিছু থাকলেও সেটাকে টেনে ওই একই লাইনে আনা হবে। আর দুজনের এই কাদা। ছোড়াছুড়ি দীপা শুনছিল। ভয় পাচ্ছিল। পৃথিবীটা বিশেষ সুবিধের জায়গা নয়। প্রশ্ন আসছিল মনে, এই কারণেই কী ঠাকুরদা কাকাকে একটু বেশি ভালোবাসতেন। জ্যাঠামশাই কী সেই কারণেই কাকিমার সঙ্গে কথা বলেন না। জ্যাঠাইমা কী সেই কারণেই কাকিমাকে সহ্য করতে পারেন না। দীপার মনে পড়ল, সে যখন আরও ছোটো ছিল, দেখত পিসিমার সঙ্গে একটা ছেলে আসত। ভালো চেহারা, কোঁকড়া চুল। পিসিমা কথায় কথায় তাকে আদরের চড় মেরে বলত, তুই থাম, আর জ্বালাসনি আমাকে। মেয়েমহলে গবেষণা হত পিসিমার কেন ছেলেপুলে হয় না। একটা কথা প্রায়ই শুনত, ঠাকুরজামাই ঢোঁড়া সাপ। ছোবল আছে বিষ নেই। দীপার মনে আছে পিসিমা খুব সাজতেন। গোড়ালিতে ঝামা ঘষতেন। দুধের সরের সঙ্গে কমলালেবুর খোলা বেটে সারা শরীরে লাগাতেন প্রায় বিবস্ত্র হয়ে। রেশমের তৈরি বক্ষবন্ধনী পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতেন। সামনে খোলা জানালা। বাগানের কোণে সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে মালির ছেলের গোঁফ গজিয়েছে। সে হাঁ করে দেখছে।
সব কথা, উড়ো কথা, হেঁদো কথা। কোথাও না কোথাও একটু সত্য থাকেই। দীপা দেখেছে কাকিমাকে পাশবালিশ করে ঠাকুরদা শুয়ে আছে। খাটের পাশের টেবিলে খল, নুড়ি। চেটে চেটে মকরধ্বজ খেয়েছেন। ডিশে পড়ে আছে একটা খাস্তা কচুরি। বৃদ্ধ আলুর দম দিয়ে খাস্তা কচুরি। খেতে ভালোবাসতেন। কোনও কোনও মানুষ বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহে ফুলতে থাকেন। মনের দিক থেকে হয়ে ওঠেন পৈশাচিক। পয়সাঅলা লোকদের মধ্যে এটা খুব হয়। কারণ তাঁরা অধার্মিক। দেব-দেবীর পূজাঅর্চনার ঘটা করেন ঠিকই, সে সবই বিত্তবাসনায়। আকাঙ্ক্ষা একটাই —ধনদৌলত। নিজের অন্তরে স্নিগ্ধ, পবিত্র দেবভাব জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে নয়। দীপার ঠাকুরদা ষাটের পর এইরকমই হয়ে গিয়েছিলেন। সিল্কের লুঙ্গি, কাঁধকাটা গেঞ্জি পরে বেতের একটা চেয়ারে বসে থাকতেন। বসে বসে কেবল ভোগের কথা বলতেন। মেয়েদের শরীর নিয়ে কথা বলতেন। বহুকাল আগে এ-পাড়ার কোথাও একঘর বেশ্যা ছিল, তাদের কথা বলতেন। আর মাঝে মাঝে দীপাকে আদর করার চেষ্টা করতেন। দীপা তখন পালাবার পথ পেত না। মেয়েরা শৈশব থেকেই বুঝতে শেখে কোন আদরটা কেমন।
