দীপার বাবা সপাটে দাদাকে একটা চড় হাঁকালেন। নেশাটা চড়ছিল। বড় ভাই হকচকিয়ে। গেলেন। সেই রাতটা ভোলার নয়। দীপা ছুটে এসে জ্যাঠামশাইকে জড়িয়ে ধরেছিল। জ্যাঠাইমা দৌড়ে এসে বলেছিলেন, দাদাকে মারলে! দীপার বাবা যে চেয়ারটায় বসেছিল, সেই চেয়ারটা। উলটে ফেলে দিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। এই চলে যাওয়াটা দীপার মনে একটা স্থায়ী ছাপ। রেখে গেছে। কেউ বাধা দিতে এগিয়ে আসেনি। দীপার মা বেঁচে থাকলে নিশ্চয় স্বামীর হাত। ধরতেন। একটা নিঃসঙ্গ মানুষ চলে গেল। সারা বাড়ি থমথমে। দীপার সঙ্গে কেউ কথা বলছে না, যেন চড়টা সেই মেরেছে। বেশ বুঝতে পেরেছিল সবাই তাকে ঘৃণা করছে। দীপা বুঝে গিয়েছিল। সংসারে সে একা। সেই রাতের আর একটা ঘটনা, রাত দুটোর সময় ঠাকুরদা মারা গেলেন। সন্ধে থেকেই ছটফট করছিলেন, কাকে যেন খুঁজছিলেন। কারও হাত ধরার চেষ্টা। একটা অজানা পথে একেবারে একা যাওয়া। নাস্তিক ভোগী মানুষরা মৃত্যুর সময় খুব ভয় পান। এপার থেকে ওপারে যাওয়ার সময় সঙ্গে কিছু নিয়ে যাওয়া যায় না। কেউ সঙ্গে যেতেই পারে না। তা ছাড়া। একটা কষ্টও আছে, তখন আর শ্বাস নেওয়া যায় না। ভিতরের বন্দি বাতাস বেরিয়ে আসতে চায়। মৃত্যুর এক ভয়ংকর যন্ত্রণা।
যখন মারা গেলেন, তখন যে যার ঘরে খিল এঁটে শুয়ে আছে। এতদিন যা শুনতে হয়নি, সেই চোখা কথা দীপাকে শুনতে হয়েছে। সব কথার সারাংশ হল, এই বাপের মেয়ে আর কত ভালো হবে। দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা। জ্যাঠাইমা মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, কাকিমা ফড়ফড়িয়ে চলে গেলেন। ভাবটা এই, নান অফ মাই বিজনেস। বড়র সঙ্গে হয়েছে বড়র বউ বুঝবে। বড় হয়ে বড়র সম্মান যদি আদায় করে নিতে না পারে, সে তোমার দোষ! বসে বসে মদ খাওয়ার সময় মনে থাকে না? ঠাকুরদার মৃত্যুর সময় আপনজনদের মধ্যে দীপাবলীই পাশে ছিল। মানুষ। কীভাবে দুঃসহ যন্ত্রণায় মারা যায় একবারে মাথার কাছে দাঁড়িয়ে দেখা হয়ে গেল। প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়ার পর নার্স দিদিমণি পাশের টুলে যেমনভাবে বসে পড়লেন, যেন চা খেয়ে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। কিছুই না পেয়ালা খালি হয়ে গেল। এইটা হয়তো তার অভিজ্ঞতায় একশো একতম মৃত্যু। দীপার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘আমার ছুটি হয়ে গেল। যাও ওনাদের ডাকো।’
ওদের সঙ্গে কথা বলতে দীপার একেবারেই ভালো লাগছিল না। বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাকা, কাকিমা, জ্যাঠামশাই, জ্যাঠাইমা বলে ডাকতে তার ঘেন্না করছিল। কিছুক্ষণ বসে থেকে নার্স ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, ‘নাঃ ডেডবডিতে ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে। যাই বাবুদের টেনে তুলি।’
ঘরে কম পাওয়ারের নীল একটা আলো জ্বলছিল। ঠাকুরদা চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন অনন্ত নিদ্রায়। সাদা চুল, সাদা দাড়ি। ঘরের বাতাসে তখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে তাঁর শেষ নিঃশ্বাস। নীল সমুদ্রে মৃত্যু নীল অনন্তে লীন এক মানুষ। দীপার সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, এমন একজন মানুষের ছেলেরা এমন কেন হল! ঠাকুরদা তো ধার্মিক ছিলেন। ভাগবত পাঠ করতেন, গীতা পাঠ করতেন, মালা জপতেন, সন্ন্যাসী সঙ্গ করতেন, দানধ্যান ছিল। দীপা ঠাকুরদার হাতটা ধরতে চেয়েছিল, ভয়ে। পারেনি। মৃত্যুকে ভয় করে। এমনি দেখা যায় না। কিন্তু মৃতদেহে তার অবস্থান। ভেতরে তুমি। কে? নিথর, নিষ্পন্দ, দেহ খাঁচায় আমি মৃত্যু। আমি জীবনের সঙ্গেই থাকি। সময় হলেই জীবনকে ঠেলে বের করে দিয়ে দেহের দখলদারি নিই। নীল, হিমশীতল মৃত্যু আমি। আমাকে স্পর্শ কোরো না। জীবনের মতো আমিও এক মহাসত্য।
ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠল। ভোগের বিছানা ছেড়ে সব নেমে এলেন। মেয়েদের পোশাকে তখনও ঘুম কুঁচকে আছে। সহবাসের সুখ। এ কী মহাবিদ্যু! মাঝরাতে কেউ মারা যায়! সেটা কী উচিত কাজ? টেলিফোনের ডায়াল ঘুরতে লাগল কড়কড় শব্দে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তের। আত্মীয়স্বজনদের ঘুম নষ্ট হল। বড়কর্তা পরলোক গেছেন। দুটো বেজে দশ মিনিটে ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়েছে। তোমরা সব এসো।
নাকের গর্তে তুলো গোঁজা হল। নাকের কাজ শেষ। চোখের পাতায় বসানো হল চন্দন-তুলসী। একখণ্ড গীতা রাখা হল বুকে। রথে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রীকৃষ্ণ। তিনি বলে গেছেন, মানুষ জন্মায় না, মানুষ মরেও না। অবিনাশী আত্মা। সবই অঙ্গুষ্ঠ পরিমাপের এক জ্যোতির্লিঙ্গের খেলা। তাকে না যায় ছেদা করা, না যায় তাকে কচুকাটা করা, না যায় তাকে আগুনে পোড়ানো। অজেয় অমর, শাশ্বত। নিত্য-শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত। চড়চড়ে রোদ উঠল, তবু চড়া পাওয়ারের আলোগুলো নেভানোর। কথা সবাই ভুলে গেল। দীপার মনে আছে, সে ঘুরে ঘুরে আলো নেভাচ্ছে, আর আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবরা সব হাসছে সেজেগুঁজে, মালা, ফুলের রিং, বোকে নিয়ে। একেবারে উৎসবের মেজাজ। গাড়ির পর গাড়ি। দরজা বন্ধের ঢিসটাস শব্দ। কেউ কেউ ঢোকার আগে রুমাল ঘষে চোখ লাল করে নিচ্ছেন। মেয়েদের মধ্য কেউকেউ ফোঁস ফোঁস শব্দ করছেন। চোখে একটু জলও হয়তো আসছে। এরই মাঝে দীপার বড় পিসি এলেন। তিনি একটু আন্তরিকভাবেই কাঁদছিলেন। হাপরের মতোই শব্দ হচ্ছিল। বাবা বলছিলেন বারে বারে। শোনাচ্ছিল, ফাবা, ফাবা। বয়স্কা মহিলা। নানাবিধ ব্যাধিতে শরীর বিপর্যস্ত। তাঁকে ধরেছিলেন তাঁর স্বামী। রিটায়ার্ড ফরেস্ট অফিসার। মুখে অজস্র পাহাড়ি ভাঁজ। পাকানো গোঁফ। পেটানো চেহারা। বাঘ আর বউ দুটোকেই সমান ভালোবাসেন। গঙ্গার জল আর বোতলের জল দুটোরই সমান সেবা করেন। তিনি বউকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন এই বলে, মান্তু অনেকদিন বেঁচেছেন, ফুল টার্ম ফুল টার্ম, আবার কী, আবার কী, রাইপ ওল্ড এজ। কেঁদে আর শরীর খারাপ কোরো না, তোমার আবার মাইগ্রেন আছে। এখুনি বমি শুরু হবে।
