রমলা সেই বিবর্ণ মানুষটিকে বাবা বলে জানলেও, অধ্যাপক জানতেন রমলা তার সন্তান নয়। রমলার পিতা সেই মঞ্চ দাপানো অভিনেতা। যিনি মাইকেল হয়ে মেঘনাধ বধ আওড়ান, চাণক্য হয়ে দর্শকদের অনুভূতিতে রোমাঞ্চ আনেন। যৌবন সমাগমে রমলাও অনুমান করতে পেরেছিল, এমন একটা দীঘল শরীরের নির্মাতা ওই অধ্যাপক হতে পারে না। রাতের পর রাত বালিশে পিঠ দিয়ে বসে বসে হাঁপান। শ্বাসের শব্দ শুনলে অবাক হতে হয়, পৃথিবীতে বাতাসের এত অভাব! মানুষটা গ্যালপিং রেটে বৃদ্ধ হয়ে শুরু করেছিলেন। করুণ চোখে নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকতেন। চওড়া পিঠে চকচকে চামড়া। ফেটে পড়া যৌবন। বহির্মুখী মন। সংসারে অলীক মন বসে না। পুরুষের সঙ্গ পছন্দ করে। যেসব পুরুষ অসুস্থ নয়, যাদের লিভার ভালো, শ্বাসকষ্ট নেই, ন্যায়-অন্যায়ের অলীক বোধে পেন্ডুলামের মতো দোল খায় না, তাদের কাছে পরস্ত্রীর মতো সুস্বাদু স্যালাড আর কী থাকতে পারে। প্রবাদে আছে, আমি মাখব ফলার, তুমি এসে খেয়ে যাবে। নেপোয় মারে দই।
অবশ্য রমলার মা বোকা ছিলেন না। অতিশয় খেলোয়াড় এক মহিলা। প্রতিভা তো ছিলই। নিষ্ঠুরতা স্বার্থপরতায় অদ্বিতীয়। কারুকার্য করা ভোজালির মতো। মণি বসানো সাপের ফণার মতো। বিষাক্ত সুন্দর। পৃথিবীতে অমতের চেয়ে হলাহলের আকর্ষণ বেশি। এক ছোবলে মরব না; কিন্তু তিলতিল করে মৃত্যুর দিকে এগোব। সর্বনাশের আকর্ষণ। চরণামৃত খেলে মোক্ষ লাভ হয়। সেটা কি কেউ জানে না; কিন্তু কোকেন অথবা মরফিন সব গোলাপি;নভোচরের মতো আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছি। পেঁয়াজের খোসার মতো পাতলা শাড়ি পরে চন্দনবর্ণা মহিলা ঘুরে ঘুরে নাচছে। সে সুখ পৃথিবীতে নেই সেই সুখে ভাসছি। নর্দমাকে মনে হচ্ছে যমুনা। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিসটেমে সেতার বাজছে।
রমলার মা সেই দশকের কলকাতার হিরোইন। দুই অর্থে এক। নায়িকা প্লাস ড্রাগস। প্রবীণ মাজা ভাঙা সাহিত্যিকরা তাঁর পা চাটতেন। আর উপন্যাসে বড়ো বড়ো আদর্শের বুলি কপচাতেন। উপনিষদ পাঞ্চ করে মনে করতেন ক্ল্যাসিক লিখে ফেলেছি। সভায় শাল জড়িয়ে বসতেন, সবাই। মনে করত ব্রামার জেরক্স কপি। দাঁতে পায়োরিয়া, মুখে দুর্গন্ধ, ঘামে টকসিন স্মেল, গেলাস তুলতে গেলে হাত কাঁপে, উদরে কোষ্ঠকাঠিন্যের বাতাস। সমালোচকরা চারপাশে নেংটি ইঁদুরের মতো ঘোরে। স্তাবকরা এই ভাজার মতো প্রেক্ষাগৃহে বসে চটরপটর তালি বাজায়। কলের। গোড়ায় লাগাম চড়িয়ে বসে আছেন মঞ্চাভিনেত্রী। যখন পিছন ফিরে হেঁটে যান পুরুষদের গলা শুকিয়ে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে যখন হাত তোলেন, মনে হয় নিয়তি। একজনের কাছেই নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন, তিনি সেই নট, রঘুবীর।
রমলা সবই পেয়েছিল, মায়ের প্রতিভাটা পায়নি। মণিহীন ফণী। সুধন্য সেই চন্দ্রমুখীর নেশায় চুর হয়ে গেলেন। একটা বাড়ি ভাড়া করে সেই প্রতিষ্ঠা করলেন। স্থির করলেন বিগবাজেটের একটা ফিলম করবেন। রমলাকে করে তুলবেন বাংলা চলচ্চিত্রের গ্রেটা গার্বো। ভাগাড়ে যখন নতুন। মৃতদেহ পড়ে তখন শকুনরা সব খ্যাখ্যা করে ছুটে আসে। বাঘ যখন শিকার মারে ফেউরা সব দুরে বসে কেয়াবাত কেয়াবাত করে। সেইকালের এক মরফিনসেবী পরিচালক গন্ধে গন্ধে ছুটে এলেন। তিনি আবার কলকাতার এক মিশনারি কলেজে ইংরেজি অধ্যাপক ছিলেন। পাকতেড়ে চেহারার কোকেনসেবী এক লেখক তাঁর কোটর থেকে বেরিয়ে এলেন। এক ম্যাটিনি আইডল। নায়ক রমলার বিপরীতে অভিনয় করতে নিমরাজি হলেন।
মদের ফোয়ারা ছুটল। মুরগি উড়ে গেল প্লেট প্লেট। রাতের পর রাত আলোচনা। কাউচে এলিয়ে আছেন রমলা। দু আঙুলের ফাঁকে লম্বা পাইপে লাগানো সিগারেট। এনামেল করা ঠোঁটে মাঝে। মাঝে টানছেন। ছাই ঝাড়ার দরকার হলে মিউজিক ডিরেক্টর অ্যাশট্রে এগিয়ে দিয়ে ধন্য হচ্ছেন। ফরাসি পারফুম জড়িয়ে আছে শরীরে। দিনে একরকম সুগন্ধ, রাতে আর একরকম। গবেষণার বিষয় গল্পটা কী হবে। প্রমথেশ বড়ুয়া, দেবকী বোস, জ্যোতির্ময় রায় পাঞ্চ। জবরদস্ত একটা ককটেল। ছবির সব ফ্রেমেই রমলা থাকবে।
সুধন্য মুখার্জি ব্যাঙ্ক যাচ্ছেন, বান্ডিল বান্ডিল টাকা তুলছেন, এম্পায়ার স্টোর্স বিলিতি সাপ্লাই করছে, বাথগেট থেকে আসছে পেটি পেটি সোডা ওয়াটার। দীপার জ্যাঠামশাই একদিন সুধন্যকে বললেন, ‘চৌবাচ্চায় ফুটোটা তা হলে তুমিই করলে।’ প্রথমে মৃদু গলায় হচ্ছিল। দাদা তার ভাইকে সতর্ক করছেন। কর্তা এখনও জীবিত, তাঁর জীবৎকালেই লালবাতি জ্বেলে দেবে। জলের মতো টাকা উড়ছে। রমলার রসের ভিয়েন হচ্ছে। একটাই মেয়ে বড় হচ্ছে। বাপ যদি চরিত্রহীন হন মেয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে।
আমি সিনেমা করব। প্রডিউসার। টাকাটা আমার চাই।
সিনেমা!
জ্যাঠামশাই আঁতকে উঠলেন। দীপা আড়াল থেকে দেখছে। বাবাকে চিরকালই তার মনে হত অচেনা একটা মানুষ। দুমদাম কথা বলে। যে-কোনও কথা যে-কোনও লোককে অক্লেশে বলতে পারে। বয়সের মর্যাদা দিতে জানে না। মানুষকে অপমান করে আনন্দ পায়।
জ্যাঠামশাই একটু সামলে বলেছিলেন, মাথাটা তাহলে সত্যিই খারাপ হল। সিনেমার তুমি কী বোঝো? কত টাকার ব্যাপার!
দশলাখ নিয়ে নামব। এতকাল জাহাজের পেটে জীবনটাকে নষ্ট করেছি।
জ্যাঠামশাই বললেন, এইবার মেয়েছেলের তলপেটে জীবনটাকে শেষ করবে।
