এইসব দেখে দীপার ভয় হত, তার ভবিষ্যৎটা কী হবে! ওই জ্যাঠাইমা, কাকিমার মতো মহিলা। কোনও একটা লোকের বউ। ব্যবসাদার, দালাল অথবা ফোড়ে। অনেক টাকা তার। গদগদ চেহারা। ধামার মতো উঁড়ি। গলগল করে ঘামে। মাংস খেয়ে দেশলাই কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচায়। ফুক ফুক করে ঘরের দেয়ালে কুঁচি ফেলে। বগলের চুলে ঘামে জড়িয়ে থাকা পাউডার। রাতের বেলা বিছানায় জড়িয়ে ধরে। লোমঅলা বুকে মুখ চেপে ধরে। এখানে-ওখানে খামচায়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেহভোগ করে। অবাঞ্ছিত সন্তানের মা হতে হয়। দীপা স্বপ্নে দেখত, হাজার হাজার হাত অক্টোপাসের মতো এগিয়ে আসছে। বিশাল, বিকট একটা মুখ, কমলাভোগের মতো দুটো চোখ, শিমপ্যাঞ্জির মতো মোটা দুটো ঠোঁট, নর্দমার মতো নিঃশ্বাস। ছ্যাঁত করে ঘুম ভেঙে যেত। রাতের কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হত আত্মহত্যা করি। বাগানের ঝাঁকড়া গাছে কালপ্যাঁচা ডাকছে। উত্তরের পাঁচিলে হুলো বেড়ালের জৈব চিৎকার।
দীপা ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে আসত। অসুস্থ ঠাকুরদার ঘরে আলো জ্বলছে কম পাওয়ারের। নার্স দিদি ইউরিন্যাল দিচ্ছে। ছ’ফুট লম্বা একটা মানুষের খাঁচা বিছানায় পড়ে আছে। কোনও আব্রু নেই। লজ্জা নেই। ঠাকুরদার যৌবনের ছবিতে কী অহংকার, কী দাপট! ইউরোপিয়ান। পোশাক। নিষ্ঠুর দুটো চোখ, বাজপাখির মতো। শিকারের শখ ছিল। রাইফেল ছিল। বহুবার। বিলেত গিয়েছিলেন। তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জন্মদাতা। সেই মানুষটার কী অবস্থা! ছেলেরা ফিরেও তাকায় না, বউরা মাঝেমধ্যে আসে। সমস্ত দায়িত্ব ওই নার্সের।
দীপা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে যায় ঘরে। বয়সের তুলনায় তার চিন্তাটা ছিল অনেক পাকা। শরীরে সব লক্ষণই সুস্পষ্ট। রাতে কোনও কোনও দিন নার্সদিদি তার পাশে এসে শুত। আদর। করে জড়িয়ে ধরত। তখন দীপার মনে হত শরীরের কোনও একটা স্তরে কিছু একটা ঘটছে, যার অনুভূতিটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। এই অনুভূতির মধ্যেই আছে নেশা, আছে শৃঙ্খল। একসময় দীপা নিজেকে সমর্পণ করে দিত তার হাতে। তখন অতটা বুঝত না, ব্যাপারটা কী হচ্ছে। এখন বোঝে। বুঝে আরও ভয় পেয়ে যায়। মানুষের স্বভাবে কী আছে কেউ বলতে পারে না। একটা। গুহা আছে ভিতরে। বসে আছে প্রবণতা। আকর্ষণ এত প্রবল, অপেক্ষা করার উপায় নেই। দীপা উন্মুখ হয়ে থাকত। কখন সে আসবে। তার একটা পাপবোধ। একটা অসুস্থতা। না জানার ভান; কিন্তু ভীষণ উপভোগ্য। যে রাতে ঠাকুরদা একটুও ঘুমোতেন না, সারাক্ষণ নার্সদিদিকে ওইখানেই ব্যস্ত থাকতে হত, দীপা রেগে যেত। অসুস্থ মানুষের কষ্টটা তার কাছে কিছুই নয়। নিজের সুখটাই বড়। এইটাই পৃথিবীর চরম সত্য। আমি আমি, তুমি তুমি। বাকিটা অভিনয়। লোকলজ্জা। বুদ্ধিমান মানুষ সেই কারণেই কিছু অনুশাসন তৈরি করে রেখেছে। কিছু কর্তব্য। ভাব, ভাবনাহীন কিছু করণীয় কাজ।
ওই বাড়িতে আরও কিছুকাল থাকলে দীপার কী হত এখন আর বলা যায় না। ঘটনাই ভাগ্য। দীপার বাবা ওই সময় এক চিত্রাভিনেত্রীর খপ্পরে পড়লেন। মহিলা তিন-চারটে বাংলা ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। প্রথমটা হিট করেছিল। মহিলার দেহ ছিল। কোনও এক পার্টিতে দীপার বাবার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল সেই মহিলার। দীপার মায়ের মৃত্যুর পর দীপার বাবা একটা অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন। সকালে উঠে টুথব্রাশ হারিয়ে গেলে যে অসুবিধে হয় অনেকটা সেইরকম। সুধন্যবাবু আর একটা অ্যাঙ্গুলার টুথব্রাশ পেয়ে গেলেন, তবে দামটা একটু বেশি। ছাপ মারা নায়িকা। শহরের দেয়ালে যার ছবি সাঁটা থাকে।
দু-ধরনের পুরুষ আছে—এক হিসেবি লম্পট, আর এক বেহিসেবি লম্পট। সব পুরুষই লম্পট যেমন সব কিশোরীই লেসবিয়ান। উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই, আধুনিক মনস্তাত্বিকদের এইটাই বক্তব্য। মানুষের কাণ্ডকারখানা দেখে তাঁরা অন্য কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না বলে। মানবজাতির কাছে ক্ষমা চাইছেন। সুধন্য মুখার্জি ছাগলের মাংস ভয়ংকর ভালোবাসতেন, সেই কারণে বুদ্ধিটাও হয়ে গিয়েছিল ছাগলের মতো। মানুষ তো এমনিই নাচের পুতুল, অদৃশ্য দড়ির টানে সারাজীবন হাত-পা ছোঁড়ে, এর সঙ্গে যোগ হল এক খেলোয়াড় মহিলা। ডবল ডিমের। ওমলেটের মতো ডবল নিয়তি। বোকা-লম্পটদের মেয়েরা সহজেই চিনতে পারে। এই একটু গায়ে গা লাগিয়ে বসা, চোখের ভঙ্গি করা, শরীরের ঝলক দেখানো, মাঝেমধ্যে হাসতে হাসতে গায়ে ঢলে পড়া—এইজাতীয় কিছু প্রাচীন টোটকাই যথেষ্ট। লোকটা একেবারে পোষা কুকুর। পটাপট ল্যাজ নাড়বে। সুধন্যর ব্রেনের একটা অংশ অকেজো হয়ে গেল। অদ্ভুত একটা ইউফোবিয়া তৈরি হল। পৃথিবীটা হল নারীদেহ। মানুষ তার শৈশবটা কোনওরকমে পেরোতে পারলেই হয়ে গেল। তারপর স্রেফ নারী সম্ভোগ। প্রেম কাকে বলে, কবিতায় আছে, না সাহিত্যে আছে, ফুলে আছে না ফলে আছে ইত্যাদি গবেষণার প্রয়োজন নেই। লেগে থাকো, জড়িয়ে থাকো, নিমজ্জিত হয়ে যাও। অজগরের মতো গিলে ফেলুক তোমাকে। পৃথিবীকে ঘোরাচ্ছে কোনও শক্তি, কামিনী আর কাঞ্চন। সেই অভিনেত্রীর নাম ছিল রমলা। তাঁর জীবনকাহিনি একটু ঘোলাটে মতো ছিল। মা ছিলেন থিয়েটারের অভিনেত্রী। খুব দাপট ছিল। ইংরেজিটা ভালো জানতেন। সেকালের এক বিখ্যাত নটের বিপরীতে অভিনয় করতেন কলকাতার এক নামকরা মঞ্চে। শেক্সপিয়ারের নাটকেও তিনি অভিনয় করতেন। রমলার পিতা কে ছিলেন? রমলার মায়ের স্বামী ছিলেন কলকাতার নামজাদা এক কলেজের অধ্যাপক। অ্যানিমিক চেহারা। অ্যাকাডেমিক টাইপ। উত্তর কলকাতার এক এঁদো গলিতে সাবেক কালের এক স্যাঁতস্যাঁতে বাড়িতে সেই অধ্যাপক থাকতেন। বিষণ্ণ পরিবেশে। একনাগাড়ে তিন-চার মাস সেই বাড়িতে থাকলে আত্মহত্যার ইচ্ছে হওয়া স্বাভাবিক। অধ্যাপকের মাথায় পরিমিত টাক, চোখে পুরু চশমা। অ্যামিবায়োসিসের রুগি। সপ্তাহের তিনটে দিন মাথাধরায় কাবু। মাইগ্রেন। অধ্যাপক হিসেবে যথেষ্ট সুনাম ছিল। মানুষও ভালো। কেবল একটা জিনিসেরই অভাব ছিল, সেটা হল। জীবনীশক্তি। প্যাঁ করে সানাই বাজল। মালা গেল এগলা থেকে ওগলায়। কিছু লোক রাত বারোটা পর্যন্ত মহা হল্লা করে পোলাও, মালাইকারির ভুষ্টিনাশ করে গেল। রজনীগন্ধা দোলানো ভেলভেটের চাদর-মোড়া বিছানায় এক যুবতীর পাশে তুমি শুলে। সেইটাই সব নয়, আসল খেল তারপরে। তাকত। কবিতাই শোনাও আর নীল আকাশে চাঁদ দেখাও; কিছুই কিছু নয়। তোমাকে হতে হবে একটা স্যাভেজ, ব্রুট। পশু না হলে তুমি নাম কা ওয়াস্তে স্বামী। তোমার স্ট্যাটাস হল সিঁদুরের একটি রেখা।
