টাঙ্গা যখন বিদ্যাপীঠে প্রবেশ করল, রাত হয়ে গেছে। নামার আগে পুনর্জীবনপ্রাপ্ত সুধাংশুদার একটিই খালি কাতর মিনতি—ভাই, দয়া করে ছাত্রদের বোলো না। বৃদ্ধ বয়সে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে হবে। তবু এমন ঘটনা চেষ্টা করলেও চেপে রাখা যায় না। রাষ্ট্র হয়ে পড়বেই।
একটি মেয়ের আত্মকাহিনি
চাঁদের আলোয় তেপান্তরের মতো একটা মাঠ। মাঠের মাঝখানে তেলমাখা একটা তাগড়া ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে। চেস্টনাট ব্রাউন তার রং। চামরের মতো লেজ দোলাচ্ছে। ওই ঘোড়াটাকে ধরতে হবে। পিচ্ছিল পিঠে চেপে বসতে হবে। ঘোড়াটা দিগবিদিগ জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটবে। চেষ্টা করবে ফেলে দিতে। তোমার কসরতটা হবে, চেপে থাকা। পড়ে গেলে তুমি তোমার সার্কিটের বাইরে চলে গেলে। পৃথিবীটা এখন রেসের মাঠ। সকলেই জকি।
দীপার বাবা পয়সাঅলা লোক। জাহাজের মাল খালাসের কারবার, স্টিভেডার। বেহালার দিকে বৃহৎ বাগানবাড়ি। তিনপুরুষের ব্যবসা। বেশ থকথকে পয়সায় ডুবে আছেন। পয়সাও এক। ধরনের পাঁক। একমাত্র মেয়ে দীপাকে রেখে মা মারা গেছেন। দীপা বড় হয়েছে একটা ভয়ের পরিবেশে। তার বাবা, কাকা, জ্যাঠামশাই সব দৈত্যের মতো দেখতে। কংস, দুর্যোধন, দুঃশাসন। দীপার সেইরকমই মনে হত। হাঁউ হাঁউ করে কথা। গগন ফাটানো হাসি। গপ গপ করে খাওয়া। এক-একজন এক এক কেজি মাংস খেয়ে ফেলতেন। দাঁতে হাড় ভাঙতেন মটমট করে। মজ্জাটা চুষে নিতেন স্যুৎ স্যুৎ শব্দে। মনে হত, তিনটে রাক্ষস পাশাপাশি খেতে বসেছে। চিৎকার করে বলতেন, ভাত দিয়ে যাও। লে আও ঝোল। থলথলে হুঁড়ি। বাড়িতে সকলেই চেক চেক লুঙ্গি পরতেন। কাঁধ কাটা গেঞ্জি। মোটা মোটা হাতে বড় বড় লোম। ঢেলা ঢেলা চোখ। চোখের কোলে পাউচ। রাতের দিকে সব মদ্যপান করতেন। নেশা হলে দীপার কাকাবাবু। নিজেকে খুব অপরাধী ভাবতেন। যে সামনে আসত তাকেই বলতেন, পা থেকে জুতো খুলে। আমাকে প্যাঁদাও। আমি কী করেছি জানিস! প্রশ্নটা করার পরেই একটা অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স হত। সবাই যখন ভাবছে, না জানি কত কী পাপের ফিরিস্তি বেরিয়ে আসবে, কাকা কান্না জড়ানো গলায়। বলে উঠতেন, আমি কি করিনি। কারুর জন্যে কিস্যু করিনি। করবও না কোনওদিন। প্যাঁদাও, শালাকে উত্তম-মধ্যম প্যাঁদাও, জুতিয়ে খাল খিঁচে নাও।
ঠিক সেই মুহূর্তে জ্যাঠামশাই নেশার ঘোরে বলতেন, ইশ, নাদুটা সব সিক্রেট আউট করে দিলে। মুকুজ্যে পরিবারের মানসম্মান আর কিছুই রইল না। আমার ঘোড়াটা নিয়ে আয়। বিশ্বাসঘাতকটার বুকে বুলেট চালাই। মীরজাফর, মীরজাফর।
দীপার বাবা নেশার ঘোরে হয়ে যেতেন চিফ জাস্টিস, ক্যালকাটা হাইকোর্ট। তিনি খুব গম্ভীর গলায় বার বার বলতেন, সাইলেন্স, সাইলেন্স। দিস ইজ কনটেম্পট অফ দি কোর্ট। টার্ন দেম আউট, টার্ন দেম আউট। নাদু উইল বি হ্যাঙ্গড টিল ডেথ।
দীপার ঠাকুরদা বেঁচে ছিলেন। যথেষ্ট বয়েস। প্রায় অথর্ব। একটা ঘরে শুয়ে শুয়েই দিন কাটাতেন। সেবার জন্যে একজন নার্স ছিলেন। বেশ স্বাস্থ্যবতী। মুখটা ছিল মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের। মহিলা দীপাকেও খুব ভালোবাসতেন। ঠাকুরদা মাতালদের এই হট্টগোলের সময় কেবলই বলতেন, সন্ধের আর কত দেরি?
রাত আটটা সাড়ে আটটার পর দীপা ভয়ে কুঁকড়ে যেত। চেনা মানুষগুলো সব অচেনা হয়ে যেত। রান্নাঘরে দুজন রাঁধুনি ভালোমন্দ রাঁধছে। রান্নার গন্ধে বাড়ি ভাসছে। কাজের লোকেরা ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘুরছে। নানারকম ভাজাভুজি নিয়ে মদের আসরের দিকে ছুটছে। সেখানে দু-চারজন। বাইরের লোকও থাকত। বাবুদের পেয়ারের বন্ধু, মোসায়েবের দল। পরের পয়সায় মদ খাওয়ার জন্য আসত। তাদের মধ্যে একজন নেশার ঘোরে মেয়েদের মতো ঘুরে ঘুরে নাচত। আর। একজন গম্ভীর গলায় বলত সাধু, সাধু।
বউরা সব ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত। এদের পয়সা ছিল। জাহাজের বিদেশি মাল বাড়ি বোঝাই। মানুষকে এরা মানুষ বলেই মনে করত না। দম্ভ ফেটে পড়ত। অভাবী লোকের সঙ্গে। চাকরবাকরের মতো ব্যবহার করত। কথায় কথায় বলত জুতিয়ে লাশ করে দোবো। তিন। ভাইয়ের তিনটে মোটর। বাইরে বেরোবার সাজগোজের কী ঘটা। লোকগুলোকে তখন ভীষণ বোকা বোকা দেখাত। দীপা ছিল নীরব দর্শক। মায়ের কথা তার মনেই পড়ে না। জ্ঞান হওয়ার আগেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। দীপার মায়ের জন্যে দীপার বাবার কোনও আক্ষেপ ছিল বলে। মনেই হয় না। ভদ্রলোক একমাত্র নিজেকেই ভালোবাসতেন। দীপার জ্যাঠামশাই ওরই মধ্যে কিছুটা সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন। দীপার জ্যাঠাইমা ছিলেন বোকাসোকা। তিনিই দীপাকে মানুষ করেছিলেন। মুকুজ্যে পরিবারের বউরা সব অলস ছিলেন। অতিরিক্ত আলস্য ও প্রচুর প্রোটিনজাত খাদ্যে তাঁরা মেদভারে বিপর্যস্ত ছিলেন। পুরুষরা সেইটাই পছন্দ করতেন। এও এক ধরনের বিকৃত রুচি। দীপা বড়ো হয়ে বুঝেছিল, এটাও এক ধরনের ভালগার টেস্ট। বউগুলোকে করে ফেলেছিল জ্যান্ত পাশবালিশ। দীপার মনে হয়েছিল মেয়েরা বন্দি হতে পছন্দ করে। দাসত্বের প্রতি তাদের ভয়ংকর আসক্তি। খাঁচা থাকবে। পুরুষের ভোগের সামগ্রী হবে। এই ভাবটা তাদের সংস্কারে চলে গেছে। মেয়েরা নিজেরাই মনে করে, তারা দেহ ছাড়া কিছুই নয়, ভিতরে একটা মন নড়াচড়া করে ঠিকই, কিন্তু সেই মনটা বিকলাঙ্গ। অন্ধকারে একটা পাখি। ভিতরটা খুব নোংরা। যা-তা বই পড়ে। অশ্লীল আলোচনা করে। কাজের মেয়েদের সঙ্গে পরের বাড়ির আলোচনা করে। যখনই সুযোগ পায় আজেবাজে সিনেমা দেখতে ছোটে। আর কুৎসিত সাজগোজ করে স্বামীদের সঙ্গে বিয়েবাড়িতে হল্লা করতে ছোটে। সঙ্কীর্ণ মনের মানুষ সব। নিজেদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া করে। তখন মুখের আর কোনও আগল থাকে না। বস্তির ভাষা ব্যবহার করে। স্বামীকে বলে ভাতার। বউগুলো সব মাগি। তখন মুখ-চোখের চেহারা পালটে যায়। আঁচল খসে পড়ে। বিশাল বুক থলথল করে নাচতে থাকে। বৃহৎ নিতম্ব দুলতে থাকে। খোঁপা আলগা হয়ে যায়। গা থেকে একটা পাশবিক গন্ধ বেরোতে থাকে। সমস্ত হিংস্র পশুর সমাহার। মাসের মধ্যে তিন-চার বার দীপা এই দৃশ্য দেখায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কাকার উপর রাগ করে একদিন তার কাকিমা তিন বছরের মেয়ের গলা টিপে ধরেছিল। সেই মুহূর্তে তার। কাকিমাকে মনে হয়েছিল মানুষ নয়, পিশাচিনী। ঘটনাটা ঘটেছিল দুপুরে। সেই রাতেই দেখা গেল কাকিমা সেজেগুঁজে, দশ ভরি গয়না চাপিয়ে কাকার সঙ্গে গাড়ি চেপে পার্টিতে যাচ্ছে!
