একটা চাতাল মতো জায়গা পাওয়া গেল। একটু বসে, বাকি চা-টা শেষ করতে হয়। একটু প্রকৃতি দর্শন না করলে পর্বতপ্রেম আসে কী করে! সুধাংশুদা বললেন, ভাই, আমার উপর আর টর্চার। কোরো না, তোমরা আমার ছেলের মতো। আমি এখানে বসি, তোমরা নামার সময় আমাকে নিয়ে যেয়ো। একটা রফা হল। আর একটু উঠলেই রাবণ গুহা। গুহা দর্শন করে আমরা নেমে যাব। আরে মশাই শরীর আগে না মাইথোলজি আগে? রাবণের রেলিক্স না দেখে চলে যাবেন? তুলসীদার অনুপ্রেরণায় হাতের ওপর ভর দিয়ে সুধাংশুদা শরীরটাকে ওঠালেন। গুহা দেখলেই ভয় ভয় করে। গুহার অন্তর্নিহিত সত্য সহজে জানা যায় না। কী যে মালমশলা ঘাপটি মেরে ভেতরে বসে আছে একমাত্র ঋষিরাই বলতে পারেন। মুখটা বিশাল। দুদিকে পাথরের দেয়াল। একটু যেন টেপারি হয়ে গেছে। আমাদের কনভয়ের সেই আগের অর্ডার। প্রথমে তুলসীদা, পাথ ফাইন্ডার, হাতে টর্চ। নেকস্ট সুধাংশুদা, তারপর আমি, তারপর বিদ্যুৎদা। তুলসীদা বললেন, ব্যা যদি থাকে আগে আমাকে খাবে। সুধাংশুদা বললেন, অ্যাম নট শিওর! খাদ্যের ব্যাপারে ওরা ভীষণ সিলেকটিভ, বোনস ওরা চিবোয় ঠিকই তবে ফ্লেশটাই আগে চায়।কথা বলতে। বলতে বেশ কিছুটা ঢুকে গেছি। এইবার সেই জায়গাটা দুই পাথরের দেয়াল চেপে এসেছে। তুলসীদা কাত হয়ে এগিয়ে গেলেন। সুধাংশুদাও তাই করলেন! কেবল একটু মিস ক্যালকুলেশান। এ কী হল! সুধাংশুদার গলা! আর তো যাচ্ছে না, মরেছে! কী যাচ্ছে না? আমরা এপাশের দুজন সমস্যাটা বুঝতেই পারিনি। সুধাংশুদা বললেন, আমি যাচ্ছি না। দাঁড়িয়ে থাকলে যাবেন কী করে? চলার চেষ্টা করুন। সুধাংশুদা বললেন, প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে খুঁড়িটা আটকে গেছে ডাইসের মতো। আমরা চিৎকার করলুম, তুলসীদা। দূর থেকে উত্তর এল। সুধাংশুদার ভুঁড়ি আটকে গেছে!
শেওলা ধরা দেয়াল, ভুড়ি তার গেঞ্জি আর আদ্দির পাঞ্জাবির কভার নিয়ে দুটো পাথরের মাঝখানে জম্পেশ! প্রথমে কিছুক্ষণ কমনসেন্সের খেলা চলল—নিশ্বাস খালি করে পেট কমান। দেখা গেল, এ পেট সে পেট নয়। নিশ্বাসের সঙ্গে বাড়া-কমার কোনও সম্পর্ক নেই। সন্ধের মুখে আবার উদরে বায়ুর সঞ্চার হয়। আপনার নিজের পেট নিজের কন্ট্রোলে নেই? একটু নামাতে পারছেন না? তুলসীদা সুধাংশুদার অক্ষমতায় খুব অসন্তুষ্ট। কী করি বলুন, কমছেনা যে! সুধাংশুদা হেল্পলেস। বিদ্যুৎ, তোমরা ওদিক থেকে টেনে দেখো, আমিও এদিক থেকে ঠেলে দেখি। আউর থোড়া, হেঁইও, বয়লট ফাটে, হেঁইও। এক ইঞ্চিও নড়ানো গেল না। মোক্ষম আটকেছেন মশাই! কী করে আটকালেন একেবারে নিরেট থাম! আপনি কি রাবণের চেয়ে দশাসই। অতবড় একটা রাক্ষস স্যাঁট স্যাঁট করে গলে যেত। আর আপনি সামান্য একজন মানুষ আটকে গেলেন!
রাবণের ফিজিওলজি নিয়ে কিছুক্ষণ গবেষণা হল। সুধাংশুবাবু বললেন, তার মশাই নানারকম মায়া জানা ছিল। এইখানটায় এলে হয়তো মাছি হয়ে যেত। বিদ্যুৎদা বললেন, ধুর মশাই! তবু। নিজের দোষ স্বীকার করবেন না! ব্যায়াম, ব্যায়াম। রাবণ মুগুর ভাঁজতেন। পাঁচ হাজার ডন, দশ হাজার বৈঠক ডেলি। আর রাক্ষস হলেও রাক্ষুসে খাওয়া ছিল না আপনার মতো। কোনও ছবিতে রাবণের হুঁড়ি দেখেছেন? অন্য সময় হলে তর্কাতর্কি হত। বিপন্ন সুধাংশুদা রাবণের ওপর লেটেস্ট রিসার্চ অম্লানবদনে মেনে নিলেন।
আচ্ছা এখন তাহলে কাতুকুতু দিয়ে দেখা যাক। নিন হাত তুলুন। প্রথমে বিদ্যুৎদা! কোথায় কী? খ্যাত খ্যাত করে হেসে উঠলে উঁড়িটা হয়তো ধড়ফড় করে উঠত, সেই সময় মোক্ষম ঠ্যালা। আমি বললুম, দাঁড়ান, ওভাবে ডিরেক্ট কাতুকুতুতে হবে না। টেকনিক আছে। দেখি হাতের। তালুটা। এই নিন, ভাত দি, ডাল দি, তরকারি দি, মাছ দি, নিন মুঠো করুন, মুঠো খুলুন, যাঃ কে খেয়ে গেল অ্যাাঁ, ধর মিনিকে, কাতুকুতু। কোথায় হাসি? না মশাই হবে না। আপনি এখানেই থাকুন ফসিল হয়ে। অপঘাতে মৃত্যু লেখা আছে কে খণ্ডাবে! তুলসীদা বললেন, আহা! আমি কী শুনব সতী সাধ্বী স্ত্রী, যে সহমরণে যাবে? এই মালকে ক্লিয়ার না করলে, এ দিকে তো ট্রাফিক জ্যাম হয়ে গেছে। আপনি হামাগুড়ি দিয়ে চলে আসুন। কাপড়ে শ্যাওলা লেগে যাবে যে! বিদ্যুৎদা বললেন, জীবন আগে না কাপড় আগে? তুলসীদা অবশেষে হামাগুড়ি দিয়ে চলে এলেন আমাদের দিকে।
বসার চেষ্টা করে দেখুন তো। সুধাংশুদাকে যা বলা হচ্ছে, প্রাণের দায়ে তাই তিনি বাধ্য ছেলের মতো করছেন। বসার চেষ্টা করলেন, হল না! আমরা বললুম, একটু জল ত্যাগ করুন তো, যদি পেটটা কমে। না, মরে গেলেও তিনি এই কাজটি করতে রাজি হলেন না। এদিকে সন্ধে হয়ে আসছে। তুলসীদা বললেন, টাঙ্গাওলা চলে গেলে ফেরার দফারফা। টর্চ জ্বেলে তুলসীদা একবার ভুড়িটার ইনসপেকশান করে বললেন, বিদ্যুৎ এদিকে এসো। ছুরি আছে? আমার পকেটে ছুরি ছিল। ছুরি কী হবে তুলসীদা? সুধাংশুদা একটু সিঁটিয়ে গেলেন। কাজ হয়েছে। তুলসীদা ফ্লাস্ক-এর ওপর থেকে খানিকটা চা ঢাললেন জয় বাবা বন্দি বিশালা। একটু লুব্রিকেট করে দিলুম। এবার মারো টান। আমরা চারজনেই জড়াজড়ি করে পড়লুম। সুধাংশুদার ভূঁড়ির ওপরে নুনছাল একটু উঠে গেছে। পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে। ভুঁড়িটা সম্পর্ণ অনাবৃত। চা আর শ্যাওলার পেস্ট মাখানো। বৃদ্ধ বয়সে গায়ে হলুদ।
