বাড়ির সামনে ছোটখাটো একটা ভিড়। বিমানের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। যা ভেবেছি ঠিক তাই। বিমানকে ঢুকতে দেখে প্রতিবেশীদের মধ্যে কে যেন ব্যঙ্গের গলায় বললেন,—বাবু এসেছেন! আত্মীয়দের মধ্যে থেকে একজন বললেন,—এত দেরি করলে বিমান! ঘরের বাইরে চিত্রা চোখ মুছতে মুছতে বললে, তোকে কখন ফোন করেছি দাদা আর তুই এখন এলি! শুনলাম তুই তিনটের সময় অফিস থেকে বেরিয়েছিস। বিমান অপরাধীর মতো মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ফল আর সন্দেশের বাক্স। চিত্রা বলছে, তোর কথা বারবার বলছিলেন। শেষ কথাটা। একবার বললি না। চিত্রা হু-হু করে কাঁদছে। বিমানের মনে হচ্ছে তার ঘুমভাঙা চোখের সামনে যেন ভীষণ চড়া পাওয়ারের একটা আলো জ্বলছে, সব যেন ভীষণ ঝলসানো সাদা। কারুর মুখ সে দেখতে পাচ্ছে না। কেবল কিছু শব্দ শুনছে। তাও যেন বহু দূর থেকে।
বয়স্ক কে একজন বলছেন, তুমি তাড়াতাড়ি জামাকাপড় ছেড়ে নাও। কী মুশকিলে যে ফেলেছিলেন। সেই তিনটেয় বেরিয়েছ। ছি-ছি! সে আর এক ভাবনা। এতক্ষণ লাগে আসতে!
নিজের ঘরে এসে জামা খুলতে গিয়ে বিমান আবিষ্কার করল কাঁধের কাছে একটা লম্বা সোনালি চুল আটকে আছে! কী আশ্চর্য মন! হঠাৎ তার মনে হল ইলাকে আরও কাছাকাছি পাবার সবচেয়ে বড় বাধা সরে গেল। কোনও আপত্তি আর কোনওদিক থেকে আসবে না, কেউ। গুরুগম্ভীর গলায় বলবেন না–না ওসব হবে না, বলে দাও ওকে। জাতে মিলছে না। যদি কিছু করতে চাও এ বাড়ির বাইরে। এখানে তার স্থান হবে না।
চিন্তাটা নিমেষে সরে গেল। চড়া আলো স্বাভাবিক হয়ে গেছে বিমানের চোখে, সব কিছু তখন
স্পষ্ট। ফুল, খাট, মৃতদেহ, মানুষ। বিমানের চোখের কোল বেয়ে এইবার জল নামছে। এর জন্যেই যেন সে অপেক্ষা করে ছিল!
একটি দুর্ধর্ষ অভিযান
আমি তখন দেওঘরে এক বিদ্যাপীঠে শিক্ষকতা করি। শীত প্রায় আসব আসব করছে। সকাল সন্ধে হাওয়ায় একটু ঠান্ডার কামড়। শিক্ষক ছাত্র এখানকার নিয়ম অনুসারে সকলেই সকলকে দাদা সম্বোধন করে থাকেন। রবিবার দুপুরে বেশ ভুরিভোজ হয়েছে। এইবার একটু গড়াগড়ি দিতে পারলেই হয়। এমন সময় একটা টাঙা রোদ ঝলমলে মাঠ পেরিয়ে আমাদের শিক্ষকাবাসের সামনে এসে দাঁড়াল। সংগীতশিক্ষক তুলসীদা লম্বা ছিপছিপে গৌরবর্ণ মানুষ, একেবারে ধোপদুরস্ত হয়ে এসে আমাদের ঘাড় ধরেই প্রায় বিছানা থেকে তুলে দিলেন। আজ ত্রিকূট দর্শন করতেই হবে।
তুলসীদার কৃপায় আজ আমরা ত্রিকূটযাত্রী। সঙ্গে গেম টিচার বিদ্যুৎদা আর ইংরেজি শিক্ষক সুধাংশুদা। তুলসীদা আর সুধাংশুদা সমবয়সি। আমাদের দুজনের চেয়ে বয়সে বড়। তুলসীদার গলায় মাফলার। গাইয়েদের গলার অদৃশ্য শত্রু অনেক। বারোমাসই মাফলার দিয়ে প্যাক করে রাখতে হয়। নাদব্রহ্মে। তিনি নাভির কাছ থেকে বায়ু পিত্ত কফ ভেদ করে উঠে আসেন কণ্ঠে। তুলসীদার ডোল ডায়েটে স্টার্চ কম, প্রোটিন বেশি, এক কেজি বিদ্যাপীঠের বাগানের পেঁপে, দুটো মাঝারি সাইজের পেয়ারা আর সকালে আধহাত নিম দাঁতন কমপালসারি। চেহারাটি। একেবারে কঞ্চিকা মাফিক। বিদ্যুৎদা বারবেল সাধেন, বাইসেপ, ট্রাইসেপ, ডেলটয়েড সবই বেশ খেলে। খেলে না শুধু কোলন। ইসবগুল, দু-কেজি পালঙের সুরুয়া সবই ফেল করেছে। মাংসের জুসটি খান, মাংস ফেলে দিন—এই তাঁর উপদেশ। দুশ্চিন্তা একটাই, চুলে সাদা ছিট। ধরেছে আর উঠে যাচ্ছে। অন্যথায় স্বাস্থ্যবান। সুপুরুষ সুধাংশুদার সমস্যা একটাই। ভুঁড়িটা আর কত বাড়তে পারে তিনি দেখতে চান। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে প্রকৃতই উদার। বিদ্যুৎদার মতে এই উদারতা সব উদরে গিয়ে জমছে। সুধাংশুদার মস্ত বড় গুণ ধীর, স্থির, মেজাজটি অদ্ভুত ঠান্ডা এবং বেশিক্ষণ তিনি জেগে থাকতে পারেন না। এই তো কোলের উপর উঁড়িটি নিয়ে আয়েস করে বসে আছেন। মুদিত নয়ন। নাসিকায় গর্জন। আমাদের রসিকতা তাঁর শরীরের চর্বির স্তর ভেদ করতেই পারে না। তুলসীদা নাকি ৬৫ সালে একটা গন্ডারকে সুড়সুড়ি দিয়েছিলেন, রিপোর্ট, সেটা ৬৭ সালে হেসে উঠেছিল।
তিনটে নাগাদ আমরা ত্রিকূটের পাদদেশে। তুলসীদার ফ্লাস্কে চা। এক চুমুক করে হল। সুধাংশুদা ঘাড় বেঁকিয়ে পাহাড়ের মাথাটা একবার দেখবার চেষ্টা করে বললেন, ইমপসিবল, ওনলি এ গোট ক্যান ক্লাইম্ব দিস হিল। তুলসীদা বললেন, রাখুন মশাই আপনার ইংরেজি। ভাষাটা জানি না বলে যা খুশি তাই গালাগালি দেবেন! বিদ্যুৎদা বললেন, বিদ্যাপীঠের ডাক্তারবাবু কী বলেছেন মনে। নেই? পূর্ণকুম্ভের মতো আপনি এখন পূর্ণগর্ভ। আরোহণ এবং অবরোহণ আপনার একমাত্র ওষুধ। ওসব চালাকি চলবে না। চলুন।
সুধাংশুদার প্রতিবাদ, কাকুতি-মিনতি, কে শুনবে। পর্বতশীর্ষে সুধাংশুদাকে আমরা ভোলানাথের মতো প্রতিষ্ঠিত করবই। প্রতিজ্ঞা ইজ প্রতিজ্ঞা।
ত্রিকূট খুব সহজ পাহাড় নয়। উঠতে গিয়েই মালুম হল। কাঁকরে পা স্লিপ করে। আঁকড়ে ধরার মতো কিছুই নেই, একমাত্র নিজের প্রাণটি ছাড়া। পাশেই খাদ। পড়লে চিরশান্তি! পাহাড়েই প্রেতাত্মা হয়ে আটকে থাকতে হবে। ভ্যানগার্ড তুলসীদা, রিয়ারগার্ড বিদ্যুৎদা। মাঝে আমি আর সুধাংশুদা। সুধাংশুদা বললেন, এই প্রথম বুঝলুম ভুঁড়ির ওজন কত। বেশ ভারী মশাই। আগে। ভাবতুম মাস উইদাউট ওয়েট, এখন দেখছি উইথ ওয়েট।
