ভিক্টোরিয়ার বাইরে এসে ইলা বললে, চলোনা, আজ প্ল্যানেটোরিয়ামে যাই।
স্পষ্টতই ইলা আজ ছটফট করছে। অন্ধকার তারামণ্ডলে সে নিশ্চয়ই তারা দেখতে চায় না। অন্ধকারে সে বিমানকে কাছে পেতে চায়। কী বলবে বিমান? হ্যাঁ বলবে না না বলবে? শেষে ইলাই আবার বিকল্প প্রস্তাব দিল, তার চেয়ে চলো ট্যাক্সি করে একটু ঘুরে আসি, আজ আমার খরচ। বিমান আর ইলা হাতে হাত রেখে পাশাপাশি হাঁটছে। বিমানের কেবলই বাড়ির কথা মনে। পড়ছে। অদৃশ্য একটা হাত যেন তাকে বাড়ির দিকে টানছে।
এখন ট্যাক্সি পাওয়া দুরূহ হলেও এই অঞ্চলে এক জোড়া তরুণ-তরুণীর জন্যে ট্যাক্সিদের মমতা আছেমিটার ছাড়া রোজগারের লোভে। ড্রাইভার জানে তাকে কিছুক্ষণ দেখেও দেখছি না, শুনেও শুনছি না এই ভাব করে বসে থাকতে হবে। আর তার পিঠের দিকে দুটি প্রাণী কিঞ্চিৎ জড়াজড়ি করবে, হাসবে, খেলবে, মাঝে মাঝে পরিবেশ ভুলে যাবে। তাদের চোখের সামনে চালক ঝাপসা হয়ে যাবে। তার নিজেরও বাড়তি আনন্দ। সময় সময় তার নিজের কানও গরম হয়ে উঠবে।
ইলা আজ খুশিতে চঞ্চল। দু-মাস পরে তার পাশেবিমান। ফর্সা টকটকে চেহারা। উঁচু নাক। টানা টানা চোখে প্রথম উষার নির্মলতা। ঝাঁকড়া চুল হাওয়ায় উড়ছে। ইলার সংযম শাসন মানছে না। ভুলে যেতে চাইছে সে একজন শিক্ষিকা। কবে তুমি ঘরে তুলে নেবে। রজনীগন্ধার মালা ঝোলাবে। তিনটে বছর গেছে, আরও কত বছর যাবে। দাঁতের গর্ত আরও বড় হবে। জীবন যে বড় চঞ্চল বিমান। আর একটু কাছে সরে এসো। সূর্য অনেক আগে অস্ত গেছে। আলোর বিন্দু উলটো দিকে ছুটে চলেছে। ছুটছে মানুষ। কেউ দেখছে না আমাদের। মানুষ আর এসব দেখে না। জীবনের এ একটা অপরিহার্য অবস্থা। প্লিজ আর একটু কাছে এসো। মুহূর্ত বড় তাড়াতাড়ি অতীত হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ বড় দ্রুত হেঁটে আসছে। প্লিজ তোমার হাতটা এইখানে এইভাবে রাখো। অনেকদিনের অব্যবহৃত পালঙ্কের মতো আমার সারা শরীর তোমার ভারে শব্দ করে উঠুক।
বিমান বলছে, আমি যে বিকাশ হতে পারব না ইলা। সে তোমাকে ডায়মন্ডহারবারে নিয়ে গিয়ে চোখে দেখতে চেয়েছিল। আমার এটা যে টেস্ট-কেস নয়। আমি ধরতে জানি, ছাড়তে জানি না। তুমি আর একটু ধৈর্য ধরো। মানুষ কত অসীম ধৈর্য নিয়ে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করে, কত ক্লেশ স্বীকার করে একটা জীবনের জন্ম হয়। তুমি আর একটু ধৈর্য ধরতে পারবে না নতুন জীবনের জন্যে? ধৈর্য একটা অভ্যাস। সে অভ্যাসটা হারিয়ে ফেললে তুমি মাতাল হয়ে যাবে।
বিমান কথা বলছে, অল্প অল্প অংশও নিচ্ছে হয়তো কিন্তু তার মনের বিশাল একটা অংশ অকেজো হয়ে আছে। মনের সামান্য একটা অংশে সে ইলাকে রেখেছে। সারা মনে ছড়িয়ে যেতে দেয়নি। বাইরের ঘরে অতিথির মতো বসিয়ে রেখেছে। পুরো মনটাকে চালু করে দিলে বিমান। আর এক মুহূর্তও ইলাকে সঙ্গ দিতে পারবে না, ছুটবে বাড়ির দিকে। চিত্রা ফোন করেছিল, বাবার খুব বাড়াবাড়ি।
ট্যাক্সি ম্যারিন হাউসকে বাঁয়ে রেখে আলিপুরের দিকে বাঁক নিয়েছে। ইলার নির্দেশে গাড়ি চলেছে। যেমন চলেছে বিমান। আজ সুন্দর সেজেছে। বড় খোঁপা, কাজল টানা চোখ। শরীরের ত্বক তেলতেলে মসৃণ। ওপর বাহুতে হাত রেখেছিল—ধোয়া মার্বেলের মতো শীতল। প্রসাধনের হালকা গন্ধ। এই তো এই মুহূর্তে জীবন কত সুন্দর। এখন তাদের বাঁচবার বয়েস অথচ হরিদাসবাবুর কী নিদারুণ শ্বাসকষ্ট। ইলার ফর্সা চওড়া বুকের ওপর পেন্ডেন্টের একটা লাল। পাথরে আলো পড়ে চকচক করে উঠছে। বিমানের মনে হচ্ছে জেড-এর পানপাত্র থেকে অমনই উজ্জ্বল লাল পানীয় পান করে সে খিলখিল করে হেসে উঠে বলে, আমি বিমান, আমি স্বয়ম্ভু, আমি দাস নই। আমি প্রভু, আমি ঘটনার প্রভু, আমি সময়ের প্রভু, পরিস্থিতি, পরিবেশের প্রভু। সব কিছু আমার হাতের মুঠোয়। আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, তারপর তলিয়ে যায় পাশে বসা নারী শরীরের কোমল জ্বণের ডিম্বাধারের জেলিতে।
বিমান হঠাৎ উপলব্ধি করল, সে মোটেই প্রভু নয়, দাস। মানুষ কখনও প্রকৃত প্রভু হতে পারবে না। পারলে বিমান এই রকম স্থাণুর মতো ইলার পাশে বসে থাকত না। ইলার হাত থেকে নিজের ডান হাতটা মুক্ত করে, এই রোককে বলে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়ে সে বাড়ির দিকে ছুটত। ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা যদি তার থাকত তাহলে ইলা ফোন করবার পরই চিত্রার ফোন। আসত না। এ হরিদাসবাবুর ষড়যন্ত্র নয়, অদৃশ্য কোনও শক্তির খেলা। যুগ যুগ ধরে মানুষ যাকে বলে আসছে নিয়তি। সেই নিয়তি বিমানকে আজকের এই সন্ধ্যাটা পুরোপুরি ভোগ করতে দিলে না। পাথরের মূর্তির মতো বিমানকে বসিয়ে রেখেছে ইলার উষ্ণ সান্নিধ্যে। ইলা আজ মুডে আছে, তা না হলে লক্ষ করত তার একতরফা আদরে বিমানের অংশ কত কম! তবুও সে সুখী। বিমানের বুকের কাছে তার মাথা। গাড়ি ছুটছে হু-হু করে। হাওয়ায় একটা-দুটো আলগা চুল উড়ে বিমানের মুখে চোখে লাগছে। শরীরের ঘ্রাণ।
অবশেষে সময় একটা মাইল পোস্টে এসে বিমানকে মুক্তি দিল। আর পারছিনা বিমান, এইবার যা হয় একটা কিছু করো বলে ইলা বিদায় নিয়েছে। ভরা রাতের আকাশ মাথার ওপর থমকে আছে। বিমান ছুটছে বাড়িমুখো। চিত্রা শক্ত মেয়ে। বিশেষ ভয়ের কিছু না থাকলে সে ফোন করত না। বিমান মুসাম্বি কিনেছে, নরম পাকের সন্দেশ কিনেছে এক বাক্স। অসুস্থ পিতার প্রতি তার কর্তব্য—মুসাম্বি আর সন্দেশের বাক্স! বিচারক বিমানের এজলাসে বিমানের বিচার চলেছে। তিনটের সময় তুমি তো বাড়িমুখো হতে পারতে। তা না করে তুমি কী করে এলে। জানো না তুমি হরিদাসবাবুর অন্নদাস ছিলে বহুদিন। তোমার শরীর কার দান?
