বিকাশ কিছু মন্তব্য করবেনই, কী আবার ফোন? সব প্ল্যানমাফিক চলছে, কী বলো?
মানে?
মানে বেশ সাজিয়েছ হে। প্রথমে কী আসবে? পরে কী আসবে? অতঃপর তুমি কাটবে। অতঃপর আমরা সবাই বাসর জাগিয়ে রাখব।
বিমান বললে, বিকাশ, এর জবাব আমি আজ দোবোনা, এখানেও দেব না, দেব অফিসের বাইরে, মুখ নয়, হাতে।
বিকাশ বললে, তাহলে তো একটা ইঁদুরের গর্ত খুঁজতে হচ্ছে হে! বড় ভয় পেয়ে গেলুম যে।
এখনও ভয় পাওনি তবে বিটিং স্কোয়াডের হাতে পড়লে ভয় অবশ্যই পাবে এবং আমাদের। মেথডটা ভেরি স্নিক অ্যান্ড ফানি। তুমি কিছু বোঝবার আগেই তোমার উইন্ড পাইপটা ওপেন করে দেওয়া হবে। ভেতরের দূষিত হওয়ার সঙ্গে প্রাণপাখিটা ফুড়ুক করে উড়ে যাবে। কেউ। জানবে না, উড়বে সাধের ময়না।
বিকাশ হাতটা দুবার মুঠো করল। শরীরটা কাঁপছে। বেশ বুঝল, নেশা-ভাঙ করে শরীরের ওপর অসাধারণ অত্যাচার করে স্নায়বিক দুর্বলতায় ভুগছে। হাত-পা কেমন হলুদ হলুদ। চোখ ঘোলাটে। অথচ বিমান! সবুজ গাছের মতো। মাথা তুলে দাঁড়ালে শালের খুঁটি। শহরে হঠাৎ মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। সমাজ আর আগের মতো নেই। বাঙালির ছেলের স্বাদ পেয়ে গেছে। বিকাশ যেন একটু স্তম্ভিত হয়ে গেল।
তিনটে বাজতে দশ মিনিটে বেয়ারা এসে খবর দিলে, সাহেব সেলাম দিয়েছেন। বড়বাবু একবার চোখ বড় বড় করে দেখলেন। ভাবলেন, এইবার মরেছে ছোকরা। চাকরি থাকে কি যায়। বিকাশের বিমর্ষ মুখেও প্রত্যাশার ঝিলিক, শালা একটু আগে তুমি বিটিং স্কোয়াড দেখাচ্ছিলে, তাই না! এদের কাছে বড়সাহেবের তলব যেন মৃত্যুর পরোয়ানা। সবকটাই তো গিল্টি কনসেন্স বয়ে বেড়াচ্ছে। সব সময়েই তাই দেখছে খাঁড়া বুঝি নেমে এল।
বিমান একটু পরেই ফিরে এসে যেই বললে, সাহেবের সঙ্গে বেরোচ্ছি, আজ আর ফিরব না, সরখেল আর বিকাশের চোখ কপালে উঠল। বিস্ময়ে হতবাক। কী ব্যাপার। সাহেবের আপনার লোক নাকি। কী ভুল করেছি এতদিন। একে তো তাহলে সমীহ করা উচিত ছিল। সরখেলের গলার সুরই পালটে গেছে, এ আর বলার কী আছে? সাহেব যখন বলছেন।
আপনি বাজেট দেখাচ্ছিলেন তো, সেই কথাই বললুম। বিকাশের কথাও বললুম। দুজনের মুখই চুপসে গেছে।
কী বললেন? কেন বলতে গেলেন?
একটা কথাই বললেন, আই উইল সি। বিমান ভয়ের একটা আবরণ তৈরি করে দিয়ে চলে গেল।
তিনটে পনেরো। ইলা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কচি কলাপাতা রঙের শাড়িতে পশ্চিমের রোদ।
ইলা যেন রাস্তা আলো করে দাঁড়িয়ে আছে। থিয়েটার রোড পেরিয়ে গাড়ি বাঁ-দিকে দাঁড়াল।
এসেছেন? যাকে চাইছেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ, ওই তো দাঁড়িয়ে।
ভেরি গুড। কোয়াইট চার্মিং অ্যান্ড ইন্টারেস্টিং, পরে একদিন আলাপ করব। উইশ ইউ লাক।
বিমানকে রেখে গাড়ি ডানদিকে সরে গিয়ে সোজা বেরিয়ে গেল।
ইলা অবাক। কী ব্যাপার, ময়ূরপঙ্খী থেকে নামলে! বিমান বললে, একদিন তো তোমার বাড়ির সামনে নামতে হবে। আজ তোমার সামনে নেমে মহড়া দিলুম। ইলা বেশ খুশি হল। বিমান। বললে, বড়কর্তার গাড়ি। তোমার সঙ্গে এনগেজমেন্ট শুনে লিফট দিয়ে গেলেন। তোমাকে পাকা দেখাও হল। পছন্দ। বললেন, চার্মিং অ্যান্ড ইন্টারেস্টিং।
ইলা বলল, উনি পাকা দেখার কে? বরপক্ষ নাকি?
অফকোর্স। আমার চাকরিদাতা। বেকার থেকে সাকার করেছেন। ইচ্ছে করলে আমাকে কত কী করে দিতে পারেন। হি ইজ মাই ব্রেড অ্যান্ড বাটার ডিয়ার।
বুঝেছি। চলো এখন কোথাও বসা যাক।
কোথায় যাবে বলো?
মাঠে-ময়দানে যেখানে খুশি। তোমার সঙ্গে জাহান্নামেও যেতে পারি।
ইলা আজ যত্ন করে সেজেছে। সন্ধে আর রাত্রির কিছু অংশ সে বিমানের সঙ্গে কাটাবার জন্যে তৈরি হয়ে এসেছে। বিমানের মন বাড়ির দিকে পড়ে আছে। চিত্রা ফোন করেছিল বাবা অসুস্থ। অসুস্থ অনেকদিনই, আজ একটু বেড়েছে। এদিকে খোলা ময়দান, ভিক্টোরিয়া, ইলা আর যৌবন। আকর্ষণ এদিকেও কিছু কম নয়। একদিকে, কর্তব্য, রক্তের টান। আর একদিকে হৃদয়ের টান, আবেগের টান, আগুনের টান। দুটো আকর্ষণের টানে বিমান যেন উদাস। মনে হচ্ছে সমস্ত ঘটনা ঘটে চলেছে তার মনের বাইরে। বিমান যেন সুদূরে বসে লক্ষ করছে বিমানের চালচলন। বিমান দু-খণ্ড হয়ে গেছে।
ভিক্টোরিয়ার রেস্তোরাঁয় দুজনে দু-কাপ কফি খেয়ে নিল। কফি খেতে খেতে বিমানের মনে হল একবার বলে, ইলা আজ এই পর্যন্ত থাক। মনটা পড়ে আছে বাড়ির দিকে। মন ছাড়া দেহ নিয়ে পুতুলের মতো তোমার সঙ্গে ঘুরে মুহূর্তগুলো কেন অপচয় করি। বিমান কিছু বলার আগেই ইলা বললে, আমি যেদিনই আসি তুমি কেমন গম্ভীর আর উদাসীন হয়ে যাও। আমাকে ভালো না লাগলে স্পষ্ট করে বলে দিলেই পারো।
বিমান প্রাণ খুলে হাসার চেষ্টা করল, জানো, সাইলেন্স ইজ সামটাইম গোল্ডেন। অনুভূতির একটা জায়গায় ভাষা আর পোঁছোতে পারে না। আমরা এখন সেই জায়গায় আছি। ভাষাহীন নীরবতায় দুটো প্রাণের যোগাযোগ।
ইলা বোঝে। তার মন বোঝে কিন্তু দেহ যে বোঝে না। সে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে চায়। উত্তাপে সে মোমের মতো, আইসক্রিমের মতো গলে যেতে চায়, জ্বলে যেতে চায় শুকনো পাতার মতো। বিমানকে সে দিতে চায়। সে শিকার হতে চায়। এমন কোনও নিভৃত জায়গা তারা আবিষ্কার করতে পারেনি যেখানে দেহের পাওনা বুঝে নেওয়া যায়। বিমান এসব ব্যাপারে বড় পিউরিটান। ছিচকে চুরি তার পোয় না। পার্কে, ট্যাক্সিতে, পরদাঢাকা রিকশায়, রেস্তোরাঁর কেবিনে পাশাপাশি ঘেষাঘেষি বসে জানুতে নিতম্বে কিংবা অন্য কোথাও তার আবেগকে খেলো করতে চায় না। তার অপেক্ষা আছে, বাঁধন আছে, তার একটা স্বতন্ত্র আভিজাত্য আছে। ইলারও আছে। তবে ইলা একটু বেশি সাহসী। মাঝে মাঝে বিদ্রোহী।
