বিমান সোজা বড়কর্তার ঘরে চলে গেল। চাকরির ভয়টাকে সে হত্যা করতে পেরেছে। এখন সে সবকিছু করতে পারে। বিমানের মনে হল, প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ ভয় থেকে মুক্তি। অফিসের সর্বময় কর্তা বিমানকে কখনও দেখেননি। বিমানও তাঁকে দেখেনি। তিনি থাকেন বিশাল পর্দা ফেলা ঘরে। বসেন ঘূর্ণায়মান চেয়ারে। তাঁর টেবিল অর্ধচন্দ্রাকৃতি। মেঝেতে কার্পেট। সমস্ত। আয়োজনটাই ভয় ধরানোর মতো। তাঁর অঙ্গসজ্জার মধ্যেও একটা ক্ষমতার ভাব। সে ক্ষমতা মঙ্গলের কি অমঙ্গলের বলা শক্ত। যে-কোনও ছবির দিকে তাকালে চোখ যেমন প্রথমেই বিশেষ একটি কেন্দ্রীয় বস্তুতে ধাক্কা খায়, যাকে আর্টের ভাষায় বলে সেন্ট্রাল অবজেক্ট কিংবা আইলাইন, বিমানের চোখও তেমনি প্রথমেই গিয়ে পড়ল পাইপের ওপর। পাইপ থেকে ঠোঁট, ঠোঁট থেকে। গোঁফ, গোঁফ থেকে নাক, নাক থেকে চোখ, অবশেষে পুরো মুখ, গলা, হাফবোস্ট। মুখটা অল্প নীচু করে তিনি কী একটা কাগজ দেখছেন। মাথার পেছন দিকে ধোঁয়ার একটা আবরণ তৈরি হয়েছে। বিমানের মনে হল নীহারিকা থেকে সদ্য একটি তারকার জন্ম হচ্ছে। এত সহজে সে এই ভাবতে পারছে কারণ ভয়ের নার্ভটাকে সে অবশ করে দিতে পেরেছে। কত সহজে সোজা সোজা পা ফেলে সে টেবিলের সামনে দাঁড়াতে পেরেছে। বিমান ভেবেছিল টেবিলের উলটোদিক থেকে। একটা ভয় দেখানো গলায় প্রশ্ন আসবে, হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? তা কিন্তু এল না। মুখটা কাগজের দিকে টেবিল ল্যাম্পের মতো নেমেই রইল। বিশেষ কোনও চিঠি বা রিপোর্ট হতেও পারে আবার না-ও হতে পারে। এটা এক ধরনের চালও হতে পারে। বাড়ির বেড়াল কি কুকুর হঠাৎ ঘরে ঢুকলে যেমন আমরা গ্রাহ্যই করি না কিন্তু একটা বাঘ ঢুকলে লাফিয়ে উঠি, এক্ষেত্রেও তাই। তোমাকে দেখেই বুঝেছি অধস্তন কোনও কর্মচারী। নিশ্চয় কোনও তদবিরে এসেছ, কিছু চাইতে এসেছ। অতএব তোমাকে অত খাতিরের কী প্রয়োজন! তুমি অধমর্ণ।
বিমান কাজের কথাটা পেড়েই ফেলল, স্যার, আপনি কি আমাকে আজ সাতটা অবধি থাকতে বলেছেন বাজেটের জন্য?
বাই নো মিনস। হোয়াই শুড আই আস্ক ইউ টু স্টে? মুখ না তুলেই দাঁতে পাইপ চেপে উত্তর দিলেন। বিমানের হাসি পেল। কেমন একটা উপেক্ষার ভাব। দুজনের শারীরিক ব্যবধান ফুট ছয়েক, স্ট্যাটাসের ব্যবধান যোজনখানেক। এই ভদ্রলোককেই নির্জন রাস্তায় অন্ধকারে চেপে ধরে তলপেটে ভোজালি ধরলে নতজানু হয়ে প্রাণভিক্ষা করবেন। এই লোকেরই হঠাৎ চাকরি চলে গেলে বিমানের কাঁধে হাত রেখে বলবেন—হ্যাললো ফ্রেন্ড! ক্ষমতা এক ধরনের ইনটকসিকেশান।
বিমান বললে, স্যার, আমি আজ তিনটের সময় অফিস লিভ করতে পারি?
আস্ক ইওর বড়বাবু।
তিনি তো আপনার নাম করে সাতটা অবধি থাকার ফতোয়া জারি করেছেন অথচ আমার গার্লফেন্ডকে কথা দিয়ে ফেলেছি।
ইজ ইট? এতক্ষণে চোখ তুলে তাকালেন। ইজ ইট অফিস অর ক্লাব?
আজ্ঞে অফিস। তবে আমরা সবাই মানুষ তো! সামটাইমস এমন কিছু জেনুইন প্রবলেম আসে যখন আপনার কর্মচারীরা অফিসের নিয়মে না চলে জগতের নিয়মে চলতে চায়। বড়বাবু, ম্যানেজিং ডিরেক্টার প্রভৃতিকে মানুষ বলে ভাবতে চায়। বোথ অফ আস ইন এ জেনুইন প্রবলেম। সেই সমস্যাগুলোর জন্য আমি অনুমতি চাইতে এসেছি।
বড়কর্তা ঠোঁট থেকে পাইপ খুলে নিয়ে বিমানের দিকে বিস্ময় মাখানো মুখে চেয়ে রইলেন। মুখের শক্ত রেখাগুলো যেন নরম হয়ে আসছে। কর্মজীবনে কর্মচারীদের মুখ থেকে স্পষ্ট সত্য কথা বোধহয় কমই শুনেছেন। কী সংসার, কী অফিসসর্বত্রই ছলচাতুরী। ঠোঁটের কোণে একটু হাসিও দেখা গেল। তিনি বললেন, সরখেল, আই মিন ইওর বড়বাবু আপনাকে খুব লাইক করছেন বলে মনে হচ্ছে না। হি কুড হ্যাভ ইজিলি গিভ ইউ পারমিশান টু লিভ।
তার কারণ আছে স্যার, আমাদের জেনারেশনকে আগের জেনারেশনের ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। প্রবাবলি আমরা স্পষ্ট কথা বলি, প্রতিবাদ করি বলে।
দ্যাটস রাইট, দ্যাট মে বি দি রিজন। হাওয়েভার আপনি কি ওই মেয়েটিকে বিয়ে করবেন? উইল ইউ ম্যারি হার?
সেইরকমই ইচ্ছে আছে।
কী করছেন তিনি? আই মিন হোয়াট শি ইজ!
টিচার।
ভেরি গুড। কোথায় আপনাদের মিটিং প্লেস, আই মিন প্লেস অফ অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
প্ল্যানেটোরিয়াম স্যার।
ঠিক আছে, আমি ওই দিকেই যাব, গিভ ইউ এ লিফট। বড়কর্তার পাইপ ফিরে গেল ঠোঁটে। মুখ নেমে গেল কাগজে। বিমান বললে, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।
বিমান চেয়ারে এসে বসল। হায় সরখেল! তুমি জানতেও পারলে নাকী ঘটে গেল। রেসের বই কোলে ফেলে বিকাশ আর সরখেল দুজনেই তন্ময়। কাল শনিবার। ব্যাগপাইপ দৌড়োচ্ছে মাঠে। পৃথিবীতে এখন আর অন্য কিছু নেই। অশ্বময় পৃথিবী। ওদিকে টাইপিস্ট সুখময় মাধবীর টেবিলের সামনে ঝুঁকে পড়ে হেসে হেসে খোশগল্পে মশগুল। মাধবীর লো কাট হাতকাটা ব্লাউজ, শরীরের ভাঁজে ভাঁজে মধ্যবয়সের মেদ। নাভির তলায় শাড়ি। বিমান মনে মনে প্রশ্ন করল, ইজ ইট এ ক্লাব? বড়কর্তার মতো গলা করে উত্তর দিল, নো স্যার অবসলিউটলি এ ব্রথেল।
বিমানের আবার একটা ফোন এল। এবার ধরেছে মাধবী। আপনার ফোন। মাধবীর চোখ চিকচিক করে উঠল, একটি মেয়ে। মেয়ে মানেই মজার জিনিস, লোফালুফি খেলার বল। বিমান উঠে গিয়ে ফোন ধরল। প্রভাত সরখেল সিট ছেড়ে কোনও ধান্দায় গেলেন। ইলার ফোন নাকি! বিমান খুব ধীর গলায় বললে, হ্যালো। বিমানের ছোট বোন চিত্রার গলা ভেসে এল, দাদা! হ্যাঁ দাদা, কী ব্যাপার রে? তুই আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি আসবি। বাবার শরীরটা ভালো নেই। তুই যাওয়ার পর থেকেই স্প্যাজমটা বেড়েছে রে। ঠিক আছে শোন; আমি যতটা সম্ভব। তাড়াতাড়ি যাবার চেষ্টা করব, তুই ততক্ষণে ডাক্তার সেনকে একবার কল দিয়ে দেখিয়ে নে। বুঝলি। ক্লিক করে লাইন কেটে গেল। অপারেটারদের কারসাজি। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা। মানেই ফস্টিনস্টি। সুতরাং লাইন অফ করে দাও।
