বিমানের চিঠি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চা অনেক আগেই শেষ। ইলার টেলিফোন পেয়ে সে যেন এই প্রথম ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবতে শুরু করেছে। ভবিষ্যৎটাকে কেন সে কিছুতেই বর্তমানের মতো একটা সুনিশ্চিত চেহারা দিতে পারছে না। তার বাবা কিন্তু পেরেছিলেন। হরিদাসবাবুর। ভবিষ্যৎ তাঁর কল্পনার মতোই হয়েছে। তিনি তাঁর বর্তমানটাকে অভিজ্ঞ মাঝির মতোই ঝড়ঝাপটা ঠেলে ভবিষ্যতের কূলে গিয়ে ঠেকাতে পেরেছেন। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। যা হোক একটা চাকরি অবশেষে সম্ভব হয়েছে। বড় কিছু। অ্যামবিশান তাঁর ছিল না। থাকলেও বড় চুল ছোট করার মতো হেঁটে নিয়েছিলেন। এখন তিনি বিদায়ি। যাওয়ার দিন গুনছেন। সকলকেই যেতে হবে। তবে যাওয়ার জন্যে এমন তৈরি হয়ে। বেঁধেবঁধে বসে থাকা কটা মানুষের হয়? প্রায়ই দেখা যায় হঠাৎ উপড়ে গেল। যাঃ শালা, কেটে গেছি গোছের ব্যাপার। ইলার কথা বিমান বাড়িতে বলেনি! বলার সাহস নেই বলেই বলেনি। মোটামুটি তার জন্যে একটি মেয়ে ঠিক করাই আছে। সেই ঠিককে বেঠিক করতে হবে। শক্ত কাজ। চাকরির দোহাই দিয়ে এতদিন ইলাকে আটকে রাখা গিয়েছিল। এখন তো সে অজুহাত খাটবে না। এইবার কী চাল চালবে বিমানচন্দ্র? ডায়েরি বন্ধ করতে করতে বিমান নিজেকেই। নিজে প্রশ্ন করল। জীবন নিয়ে তো খেলা চলে না। এ পাখি খাঁচার পাখি। দাঁড়ে দাঁড়ে বসে মাপা ছোলা আর জল। শিস দিতে পারো ভালো। না পারো কর্কশ গলার ডাক শুনিয়ে যাও গৃহস্থকে। মুক্ত হওয়ার জন্যে তো তোমার জন্ম নয়। বন্দি হওয়ার জন্যেই জন্মেছ। আঠাকাঠি দিয়ে হরিদাসবাবু তোমাকে ডাল থেকে পেড়ে এনেছেন। কর্তব্যের সোনার খাঁচায় পুরেছেন। সংসারের শিকল পরিয়ে দিয়েছেন। অনন্ত আকাশ তোমার নয়। খাঁচার আকাশে একটু একটু উড়তে পারো। ডানা ঝাপটাতে পারো। শিকলের মানে তোমার স্বাধীনতার পরিধি। বিমান, এ যে বড় শক্ত ঠাঁই। ইলাকে তুমি এখন কী করে ঠেকাবে? কী করে মৃত্যুপথযাত্রী পিতাকে জানাবে। আপনার নির্বাচিত পাত্রী নয়, আমার পছন্দকে আমি ঘরে নিয়ে আসতে চাই বাবা।
বিমানের মনে হল, এই মুহূর্তে সে বিকাশের জীবনদর্শন ধার করবে কি না? আরে ম্যান, প্রেম করলেই বিয়ে করতে হবে নাকি? ফুল তুমি শুকবে তারপর ফেলে দেবে। জলের মাছকে খেলিয়ে জলেই আবার ছেড়ে দেবে। উসমে কেয়া হ্যায় গুরু। তুমিও অ্যাডাল্ট, সেও অ্যাডাল্ট। এ কি মুচলেকা লিখে দিয়ে প্রেম? এ তো সেই চিরাচরিত স্টোরি-বয় মিটস গার্ল। কত আসবে কত যাবে! বি এ ডগ। সিজনে সিজনে একটা করে বিচ ধরবে অ্যান্ড ডোন্ট ফরগেট দিস ইজ দি এজ অফ পিলস এন্ড কন্ট্রাসেপটিভস। কথাটা ভেবেই বিমানের গা-টা কেমন করে উঠল। কিছুতেই সে হিউম্যান ডগ হতে পারবে না। বিকাশ হতে পারবে না। এমনকী প্রভাত সরখেলও নয়, মাধবীর গেরুয়া পাঞ্জাবি পরা খেকুরে স্বামী তো নয়ই। এই রোজগারে সংসার চলবে না, তখন কাঁঠাল ভেঙে চালাতে হবে। একটা বিকাশ জোটাতে হবে। সামনে একটা মাধবীকে বসাতে। হবে। শনিবার শনিবার ব্যাগপাইপে ভাগ্য লাগাতে হবে। তারপর চাঁট খেয়ে বাঙলা মেরে মাধবীর গোদা পায়ে মাথা খুঁড়ে বলতে হবে—দোষ কারও নয় গো মা আমি স্বখাত সলিলে।
এই যে বিমান, সরু মেয়েলি গলার বড়বাবু প্রভাত সরখেল বিমানকে ডাকলেন। বিমান তার। সমস্ত চিন্তা ধামাচাপা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কী নির্দেশ কে জানে! কার বাড়া ভাতে ছাই দিতে হবে দেখা যাক। হয়তো নিজেরই! সরখেলের খুঁটি সোজা রাস্তায় চলে না। মাধবীর দেওয়া জর্দাপানে। সরখেলের পাতলা ঠোঁটদুটো কালচে লাল। দেখলেই গা ঘিনঘিন করে। মনে হয় যেন রক্ত পান করেছিলেন, শুকিয়ে আছে। চেহারাই যেন চরিত্রহীনের। বড়বাবু তীক্ষ্ণ সরু গলা একটু খাদে নামিয়ে বললেন, আজ যেন তাড়াতাড়ি কেটে পোড়োনা। সেন্ট্রাল বাজেটের দিন। সাতটা অবধি থাকতে হবে সকলকে। পার্লামেন্টে কোশ্চেন উঠলে জবাব দিতে হবে। নতুন ডিউটি যে যে। জিনিসে চাপল, লিস্ট করে সাইক্লোস্টাইল করতে হবে। বুঝলে কিছু?
বুঝলেও কিছু করার নেই। সাড়ে তিনটের সময় আমার এনগেজমেন্ট আছে। বিমান সোজাসুজি মুখের ওপর বলে দিল। প্রভাতবাবু বাঁকা চোখে বিমানের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ব্যঙ্গের গলায় বললেন, কোথায়? ক্যালকাটা ক্লাবে? তারপর অত্যন্ত অভদ্রভাবে যোগ করলেন, অফিসটা কি তোমার মামারবাড়ি ভাবো নাকি হে! যাও, অর্ডার ইজ অর্ডার। বিমানের ইচ্ছে করছিল প্রবীণ মানুষটির গালে ঠাস করে একটা চড় মারে কিংবা বাঘের মতো টুটি চেপে ধরে ভবসাগর তারণ পারণ করে দেয়। অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করে নিল। এখনও বোনের বিয়ে বাকি। ইলার সঙ্গে সংসার পাততে হবে। শিল-নোড়া, হাতা-খুন্তি, বেবিফুড, মশারি, গ্রাইপওয়াটার, কাফ মিক্সচার। বিমান চেয়ারে বসতে বসতে মনে মনে বলল, ইলা স্রেফ তোমার জন্যে বুড়োটা বেঁচে গেল।
তিনটের সময় বিমানকে অফিস ছাড়তেই হবে। ইলাকে সে কথা দিয়েছে—পৃথিবী রসাতলে গেলেও দেখা আজ হবেই। আবার ফোন করে বারণ করারও উপায় নেই। সে কোথা থেকে ফোন করছিল তাও জানে না। দাঁড়িয়ে থেকে থেকে হতাশ হয়ে ইলা ফিরে যাচ্ছে এর চেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা আর কী হতে পারে! বিমান যাবেই। দেখা যাক কী হয়! বড়জোর চাকরিটা চলে যাবে। যায় যাক। ফুটপাথে গামছা ফিরি করবে। হাওড়া স্টেশনে কুলিগিরি করবে। পারবে না? পারতেই হবে। জীবনের বাজি ধরে পাশার চালে হারলেই হল! এবার সে খেলবে। লোহার বাঁধনে সংসার বেঁধেছে সত্যি তবু দাসখত লিখিয়ে নিতে পারবে না। অন্তত একবার সে বিজয়ী হবে।
