জীবনদর্শন হয় কামিং জেনারেশনটা কী দাঁড়াবে। আগামী পুথিবী কি শাসন করবে বাস্টার্ডরা? সেদিনই তোমার দাঁত ভেঙে দিতুম হারামজাদা যেদিন তুমি বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলেছিলে, মেয়েটা কে হে বিমান? প্রায়ই তোমাকে ফোন করে। একদিন ব্যবস্থা করো না। ডায়মন্ডহারবার থেকে ঘুরে আসি। টানা ট্যাক্সিতে যাব-আসব। মালফাল খাওয়াদাওয়া সব খরচ আমার, তোমার নো এক্সপেন্স।
বিমান জিগ্যেস করেছিল, কেন?
বিকাশ বলেছিল, দেখব মালটা কেমন! তোমার সঙ্গে ফিট করবে কি না! আমরা হলুম গিয়ে এসব ব্যাপারে এক্সপার্ট। বিমান সঙ্গে সঙ্গে কলার চেপে ধরেছিল। তুমি শালা ইউনিয়নের নেতা। অফিসে মর্যাল গার্জেন। দাবিদাওয়া নিয়ে তুমি যাও কর্তৃপক্ষের কাছে। আর এই তোমার ভেতর! বিকাশ ভাবতেও পারেনি তার মতো একজন নেতার ওপর বিমান হঠাৎ এমন। খেপে উঠবে। নিজের আখেরের কথা ভেবেও বিমানের অন্তত হয় রাজি, না হয় হজম করা উচিত ছিল। বিকাশ বলেছিল, ইয়ার্কি বোঝো না! কথায় কথায় অত তেরিয়া হয়ে ওঠো কেন? আজকাল বিয়ে করা বউ ঘরে থাকছে না, এ তো প্রেম করা মেয়ে! তুমি কি ভাবো এ অন্য কোনও ছেলের সঙ্গে ঘোরে না, সিনেমা দেখে না? ধারণা পালটাও বিমান। যুগ পালটাচ্ছে। বি প্র্যাকটিক্যাল। কলারটা চেপে ধরা অবস্থাতেই বিমান বলেছিল, সবাইকে তুমি নিজের মতো ভাবো, তাই না? শালা, তোমার হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেব। সব মেয়েই বেশ্যা তাই না?
অফিসে পাশাপাশি চেয়ারের ঘটনা এর চেয়ে বেশি দূর এগোয়নি। পেছন থেকে মোহন মিটমাট করিয়ে দিয়েছিল। মোহন আবার বিকাশের চামচা। এক কলকের স্যাঙাত। ইউনিয়নের নাম। করে চাঁদা তোলে, যার কোনও হিসেব নেই। কোথাকার চাঁদা কোথায় যায় জিগ্যেস কোরো না। মাসে মাসে শুধু চাঁদাটা দিয়ে যাও। বছরে একটা করে থিয়েটার, একবার পিকনিক, এ তো বাঁধা ব্যাপার। রিহার্সালে ভাড়া করা মেয়েরা আসবে। মোহন চা আর খাবার সাপ্লাই করবে। বিকাশ আর প্রভাতবাবুর পকেটে এক আউন্স শিশিতে ভাইনাম গ্যালেসিয়া থাকবে। হাফ চা, হাফ এ জিনিস। মেজাজ ফুরফুরে হয়ে যাবে। প্রভাত সরখেল একটা চেয়ারে বসে রিহার্সাল শুনতে শুনতে রসের কথা বলবেন। মাঝে মাঝে মেয়েদের পিঠে কিংবা হাতে আঙুলের খোঁচা মেরে খিক খিক করে হেসে উঠবেন। মেকআপ করা গালে বুড়ো বয়সের পাকা আঙুলের টুসকি মারবেন। বিকাশ বলবে, প্রেমের দৃশ্যে অত আড়ষ্ট হলে চলে? আহা স্টেজে না হয় চুমু চলবে না। রিহার্সালে দোষটা কি? চাঁদার টাকায় বিকাশ চুমু খাবে। প্রভাত সরখেল যৌবনে খোঁচা মারবেন, মোহন মালের হিসেব রাখবে। বিমান বলেছিল তোমরা হিসেবটা দাও না কেন? বিকাশ বলেছিল, কালকা যোগী, ব্যাটাকে থেফট কেসে ফেলে সাসপেন্ড করিয়ে দেব। কত হাতি ঘোড়া গেল তল, মশা বলে দেখি কত জল!
দুজনে পাশাপাশি বসলেও সেই থেকে বিকাশ বিমানের শত্রু। বিমানের সব কিছুর ওপর বিকাশের নজর। স্পাইং করে চলেছে। সাপের ফণা তোলাই আছে, সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। মাঝে মাঝে বিমানের খুব ইচ্ছা করে বিকাশের চোয়ালে একটা আন্ডারকাট ঝেড়ে প্রভাত সরখেলের মুখের ওপর একটা রেজিগনেশান ছুড়ে দিয়ে রাস্তায় নেমে জনতার দলে মিশে গিয়ে বহুতল এই বাড়িটার দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে বলে—ওই দেখুন, ওই বাড়িটার তলায় তলায় আপনার আমার পয়সায় একদল করাপ্ট পাবলিক সারভেন্ট দিনের পর দিন আমাদের স্বার্থ নিয়ে তামাশা করে চলেছে। আমি দেখেছি আপনারা আশা নিয়ে, বিশ্বাস নিয়ে প্রতিকার চেয়ে, বিচার চেয়ে সব চিঠি লেখেন। ওরা দিনের পর দিন সেইসব চিঠির ওপর চেপে বসে থেকে সময় পার করে দেয়। নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়েই ওরা ব্যস্ত। ডিএ চাই, টিএ চাই, ক্ষমতা চাই। লাঠি ঘোরানোই ওদের কাজ। ওই পুরো কাঠামোটাই ঘুণ ধরা। সাহস করে নাড়া। দিতে পারলেই ভেঙে পড়বে। বিমান ভাবে, কিন্তু পারে না। পারে না, কারণ সে জন্ম থেকেই ক্রীতদাস। ক্রীতদাসের পুত্র ক্রীতদাস। কে বলেছে, এ দেশ থেকে দাসব্যবসা উঠে গেছে? জন্ম থেকেই শুনে আসছে—ভালো করে পড়ো, চাকরি করতে হবে। কই তার বাবা তো বলেননি, চাষ করতে হবে, কী পান-বিড়ির দোকান করতে হবে। মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক হতে হবে। মাধবীর মতো হাফগেরস্ত হতে হবে। বিমানবাবু হতে হবে। হরিদাসবাবুর ছেলে, যিনি জর্জ শেফিল্ডের ক্যাশিয়ার ছিলেন। বর্তমানে রিটায়ার্ড। বয়স তিয়াত্তর। এক ছেলে তিন মেয়ের জনক। যাঁর। শরীর বর্তমানে জরাজীর্ণ, যাঁর অ্যাসেটের চেয়ে লয়াবিলিটিই বেশি। যিনি যাওয়ার আগে আর এক হরিদাসকে রেখে যাবেন। সেই এক ইতিহাস, এক গতি! এ যেন ইংল্যান্ডের রাজসিংহাসন —প্রথম জর্জ, দ্বিতীয় জর্জ…পঞ্চম জর্জ, ষষ্ঠ জর্জ।
বিমান ভাবতে ভাবতেই কাজ করছিল। একের পর এক ডায়েরি। প্রেরকের নাম, সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, যে ফাইলে সমাধি হবে সেই ফাইলের নম্বর। পাকা কাজ। চিঠি যেন না হারায়, মিসপ্লেসড না নয়, অ্যাকশন চুলোয় যাক। সারা বছর চিঠির সংখ্যা দেখিয়ে এতগুলো লোকের চাকরির প্রয়োজনের জবাবদিহি করতে হবে। সারা বছর আমরা ভেরেন্ডা ভাজিই না। কাজে কাজে আমাদের নাভিশ্বাস। সুধীর চা দিয়ে গেছে। বিমান চা খেতে খেতে একটু উদাস হয়েছে। রাগটা ক্রমশ থিতোচ্ছে। অফিসটাকে সে এখন চোখের অফ লেন্সে ঝাপসা দেখছে। চাকরিটা সে ছাড়তে পারবে না দুটো কারণে—তাকে এখানেই থাকতে হবে। থেকে থেকে ওই প্রভাত সরখেলের চেয়ার পর্যন্ত যেতে হবে। প্রথম কারণ, তার সংসারে মা, বাবা, বোন। দ্বিতীয় কারণ, ইলা। যে। মেয়ে তিন বছর ধৈর্য ধরে তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকতে পারে সে মেয়ে, বিকাশ যতই বলুক, সস্তা মেয়ে নয়। বাজারের মেয়ে নয়। বিমান এমন কিছু রাজপুত্র নয়। হিরো নয়। বড়লোকের পয়সা ওড়ানো ছেলে নয়। কী দেখেছে ইলা তার মধ্যে এই তিন বছরে বিমান তাকে কোনও উপহার দিতে পারেনি, দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়াতে পারেনি, এখানে-সেখানে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেনি। হ্যাঁ, সিনেমায় গেছে মাঝে মাঝে, তাও সব সময় বিমানের একার পয়সায় নয়। আর মাঝে মাঝে ময়দানের ঘাসের ওপর বসে একশো গ্রাম চিনেবাদাম ভেঙে ভেঙে খেয়েছে, গল্প করেছে। এই একশো গ্রামই বরাদ্দ। তাও ইদানীং দাম বাড়ায় কমে পঞ্চাশ হয়েছে। ইলা সময় সময় বিমানের কাছে কর্কশ ব্যবহারও পেয়েছে! সংসারের চাপে, সমাজের উৎপীড়নে সবসময় মানুষ মানুষের মতো ব্যবহার করতে পারে না। সবসময় প্রেম থাকে না! কাম থাকতে পারে। ক্রোধের মতো কামও একটা জৈব তাড়না। প্রেম অনেকটা চোলাই করা সিজনড মদের আবেশের মতো। সুইচ টিপে আলো জ্বালাবার মতো চট করে প্রেমের আবেগে মন ভরে তোলা যায় না। দুটো মন সব সময় একই তরঙ্গে কাঁপে না। সেই সব ক্ষত-বিক্ষত মুহূর্তে ইলা হয়তো এসে পড়েছে। তার নারীসুলভ ভবিষ্যৎ কল্পনার ছবি তুলে ধরেছে। ভবিষ্যৎকে দ্রুত বর্তমান করে তুলতে চেয়েছে। বিমানের জীবনে ভবিষ্যৎ কোথায়! বর্তমানের ভেলায় ভেসে চলেছে। কোথায় গিয়ে ঠেকবে সে কিছুই জানে না। সে পরিস্থিতির দাস। মুহূর্ত ঝরছে বৃষ্টির মতো। বিমান ভিজতে ভিজতে চলেছে। ইলারও ভবিষ্যৎ তৈরি করার ক্ষমতা নেই। তবে স্বপ্ন তৈরি করার ক্ষমতা আছে। সময় তার তাসের ঘর তৈরিতে ব্যস্ত বিমান তাস সাজিয়ে দেয়নি তা নয়, তবে বেশির ভাগ সময়ই ইলা যতটুকু সাজিয়েছে বিমান ভেঙে দিয়েছে। ইলা হয়তো অভিমান করেছে, কিন্তু ত্যাগ করেনি। অধৈর্য হয়েছে, ধৈর্য হারায়নি। দুমড়ে গেছে, ভেঙে যায়নি। এই ইলাকে নিয়ে বিকাশ যাবে ডায়মন্ডহারবারে মালের সঙ্গে টেস্ট করতে। শালা মাংসলোলুপ হারামজাদা!
