বিমান মনে মনে হাসল। কর্মহীনতা। যতদিন চাকরি পাইনি ততদিন ভেবেছি বসে বসে আর কতদিন পারা যায়? এখন চাকরি পেয়ে দেখেছি, বেকাররাই অফিসে আর এক বেকার মজলিশ বসিয়েছে। বাইরের বেকাররা মাইনে পায় না, এরা পায়। এই একটা বড় তফাত। যেহেতু বিমানের নতুন চাকরি, যত কাজ বিমানের ঘাড়ে। পুরোনো পাপীরা সারাদিন বসে বসে চা খাবেন, পান চিবোবেন, টেবিলে টেবিলে জটলা করবেন, আজ ইলেকট্রিক বিল জমা, কাল বিয়ের প্রেজেনটেশান কেনা, পরশু হাওড়া স্টেশনে ট্রেন অ্যাটেন্ড করার বাহানা করে হাওয়া হয়ে যাবেন। অফিস চালাবে নতুন রিক্রটরা। বলিহারি নিয়ম! রাসকেলদের জগতের রাসকেলিয়ান নিয়ম। ডায়েরি করার জন্যে একগাদা চিঠি খুলে বিমান আড়চোখে একবার বিকাশকে দেখে। নিল। প্রভাতবাবুর কীর্তনপার্টির লোক। কেমন সুখে আছে! এ জগতে যে আত্মবিক্রয় করতে পেরেছে সেই ব্যাটাই সুখী। এ এক সাধনা, এ-ও একপ্রকার সিদ্ধি! দল পাকাও, ঘোঁট পাকাও আর ক্ষমতার আসনে ফুল ফেলো, দুধের সরের মতো জগতে সুযোগের সরটুকু তুলে তুলে খাও।
কতরকমের চিঠি, কত রকমের আবেদন-নিবেদন, চাহিদা। কাদের কাছে আবেদন? সেই সংস্থার কাছে যেখানে বসে আছে বিকাশ, প্রভাত, মাধবীর মতো জনসেবকরা। এইসব চিঠি যাবে। প্রভাতবাবুর টেবিলে। সেই প্রভাতবাবু যিনি সারা সপ্তাহ ব্যাগপাইপ আর ফেয়ার প্রিন্সের চোদ্দোপুরুষ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। সারাটা দিন অফিসে যাঁর কাজ হল উলটো দিকের চেয়ারে ছড়িয়ে বসে থাকা মাধবীর শরীরের অনাবৃত অংশের দিকে তাকিয়ে থাকা। এই এক মেয়েছেলে মাইরি! সারা অফিসটাকে জ্বালিয়ে দিলে। যেমন সাজপোশাক, তেমনি চালচলন। কোনও ভদ্রঘরের মেয়েছেলে পারবে ওইভাবে টেবিলের তলায় বিশ্রীভাবে পা ছড়িয়ে বসতে পারবে বুকের। কাপড়টা ওইভাবে অনায়াসে ফেলে দিতে? পারবে সারা অফিসে ওইভাবে ফ্লার্ট করে বেড়াতে? পারবে বড়বাবুকে পিঠে করে খাওয়াতে? পারবে বিকাশের চেয়ারের হাতলে এসে বসতে? পারবে টাইপিস্ট নীলকণ্ঠর পিঠে হাত রেখে গায়ের ওপর ঢলে পড়ে দাঁড়াতে পারবে না। বিমান এতদিনে বুঝেছে কেন তার বোনের চাকরি হয় না। চাকরিও হবে না, বিয়েও হবে না। চাকরির বাজার মাধবীদের দখলে, বিয়ের বাজার ইলাদের। কীভাবে বিমানকে কামড়ে ধরেছে ইলা!
কামড় শব্দটা বিমানের খুব ভালো লাগল না। মনে হল ইলাকে ছোট করা হল। আসলে অনেকদিন ইলার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ নেই বলে ইলার আকর্ষণটা বোধহয় ক্রমশ কমে আসছে। অভাবের জগতে প্রেমের ভাব কতদিন বজায় রাখা যায়? তা ছাড়া দিনের পর দিন রোজ ঘন্টাসাতেক মাধবীকে খুব কাছ থেকে দেখতে দেখতে ইলা আর মাধবী যেন এক হয়ে গেছে। অফিসটা যেন মাধবীর কুঞ্জবন। প্রেম মানেই মাধবীর প্রেম। বড়বাবু যখন মাধু বলে ডাকেন, বিমানের পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে যায়। সব মেয়েই যদি মাধুহত, সব ছেলেই যদি বিকাশ হত, সংসারের কী অবস্থা হত! ভাবা যায় না শালা। সব সংসারই হয়ে যেত মাধবীর সংসার, হাফগেরস্তর সংসার। স্বামীও থাকত, আবার অফিসের প্রভাতবাবু, বিকাশ-মিকাশও থাকত।
মাধবীর স্বামী! মনে হতেই বিমান খুব নার্ভাস হয়ে গেল। ইলাকে যদি বিয়ে করে তাহলে সেও মাধবীর স্বামী হয়ে যাবে না তো! মেটামরফসিস। তার এই আবরণটা ক্রিশ আলিস-এর মতো খুলে পড়ে যাবে। বেরিয়ে আসবে মাধবীর স্বামী। খেকুরে, দাঁত উঁচু একটা লোক। গায়ে গেরুয়া পাঞ্জাবি। থাকে আলাদা। মাঝে মাঝে চোরের মতো অফিসে এসে ইশারায় মাধবীকে বাইরে ডেকে নিয়ে যায়। দুজনকে একসঙ্গে দেখলে মনে হয় স্বামী নয়, ট্যাক্স কালেকটার কিংবা জলের মিস্তিরি। মাধবীর বাথরুমের কল ঠিক করতে এসেছে কিংবা মেয়েছেলের দালাল, মাধবীকে বুক করতে এসেছে। অফিসের বাইরে দুজনের গুজুর-গুজুর ফুসুর-ফুসুর হয়। ব্লাউজের বুকের কাছে হাত ঢুকিয়ে মাধবী ব্যাগ বার করে। লোকটা মাধবীর এই অবস্থা করেছে, না মাধবী লোকটার। ওই অবস্থা করেছে বিমানের জানতে ইচ্ছে করে। কী করলে কী হয়, কী থেকে কী হয়, জীবন শুরুর আগেই জানতে পারলে সচেতন মানুষ সাবধান হতে পারে।
বিকাশের মতো সচেতন-অচেতন জড়পদার্থ কিংবা প্রভাতবাবুর মতো জীবনহীন জীবদের কথা অবশ্য আলাদা। সংসারে এরা চেনামুখ। কিন্তু ঘরের বউ মাধবী কী করে প্রভাতবাবুর মাধু হল, বিকাশের মাধবীদি, জানার জিনিস। জানতে হলে বিমানকে মধুচক্রের সভ্য হতে হয়। শনিবার শনিবার প্রভাতবাবু আর বিকাশের সঙ্গে রেসের মাঠ থেকে বেরিয়ে দিশির বোতল ব্যাগে ভরে। খানদানি পাড়ায় মাধবীর বাড়িতে গিয়ে রাত কাটাতে হয়। তার আগে মাধবীদি নামের মহিলার সঙ্গে অফিসেই ঘনিষ্ঠ হতে হয়। বিমানচন্দ্র তা কি তুমি পারবে? বিমান নিজেকেই নিজে প্রশ্ন। করল। জবাবে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বড় ধরনের একটা না। অসম্ভব। মাধবীকে সে ঘৃণা করে। মাধবী তার কাছে নারীত্বশূন্য সেক্স। মাধবী তার কাছাকাছি বিকাশের টেবিলে এলে তার মনে হয় ঘিনঘিনে কোনও সরীসৃপ এসে দাঁড়িয়েছে।
সে যদি বিকাশ হত, তাহলে জানতে পারত, মাধবীরা কেন মাধবী, বিকাশরা কেন বিকাশ। জানতে পারত জীবন এক, অথচ জীবনদর্শন এত ভিন্ন কেন। কী করে বিকাশতাকে একদিন বলেছিল, এ যুগে বিয়ে করে কারা? যারা বোকা। এ যুগ হল জিও-পিওর যুগ। মেয়েছেলে সো চিপ। গোটাকতক সিনেমা দেখালেই দে আর বেডেবল। বিমান চমকে উঠেছিল। এই যদি
