লোকটা প্রভাত সরখেল। আরও পাঁচবছর চাকরি করবে নর্মাল কোর্সে, তারপর তদবিরের জোরে আরও তিন বছর একসটেনশন। বিমান প্রভাতবাবুর গর্দানের দিকে তাকিয়েছিল। বেশ ঘাড়ে গর্দানে চেহারা। মালটাল খায় নিশ্চয়ই। মেয়েছেলেও আছে। চুলে এখনও পুরো পাক ধরেনি। বয়েস পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে তিন বছর আগেই। এই বয়েসে বিমানরা বুড়িয়ে যাবে নিশ্চয়ই, বিমান ফিশফিশ করে বলল, আমাদের অফিসের বড়বাবু।
কী অসভ্য বাবা! তুমি কতটা দূরে বসো?
বিমান তার বসার জায়গার দিকে তাকিয়ে আন্দাজে একটা হিসেব করার চেষ্টা করল। গজ, ফুট, মিটার সম্পর্কে তার ভালো ধারণা নেই। বলে দিল, তা প্রায় বিশ গজ হবে।
বিশ গজ আসতে তোমার এত সময় লাগল? তার মানে তুমি আমাকে এড়াতে চাইছিলে! আমি এত কথা বলছি তুমি কেবল হ্যাঁ না দিয়েই সেরে দিতে চাইছ!
বিমান একটা কড়া জবাব দিতে যাচ্ছিল। এমন সময় বাইরের একটা লাইন ঢুকে পড়ল। অপারেটারের কীর্তি।
কে প্রভাত নাকি? আরে এবারে তো ব্যাগপাইপ বাজিমাত করবে বলে মনে হচ্ছে। সেমিখান এন্ড প্রিন্স টিউডর বুঝলে, লকে আটশো মিটার টাইমিং শুনবে—১৩ সেকেন্ড, ২৯ সেকেন্ড।
বিমান প্রভাতবাবুরই রেসুড়ে বন্ধুকে থামিয়ে দিলে, আজ্ঞে আমি প্রভাত নই।
প্রভাত নও, তাহলে বিশ গজ, তিরিশ গজ কী বলছিলে? আমি ভাবলুম ফেয়ার প্রিন্সের কথা বলছ। প্রভাতকে দাও, প্রভাতকে দাও। ব্যাগপাইপের কথাটা বলি। শালা কেবল হেরে মরে। আমার টিপস তো নেবে না।
আপনি একটু ধরে থাকুন প্লিজ। আমি একটা অন্য লাইনে কথা বলছি। এক্ষুনি হয়ে যাবে।
এক্ষুনি হবে না রে ভাই। মা আমার রেগে আছে। মেয়েছেলে আর ঘোড়া দুটোই এক জাতের রে
ভাই, মেজাজ বোঝা দায়।
ইলাকে ঠান্ডা করার জন্যে বিমান বললে, শোনো ইলা, এ লাইনে আর বেশিক্ষণ চালানো যাবে না। আজ আমি তোমার সঙ্গে দেখা করবই। হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলছি। পৃথিবী রসাতলে গেলেও। তুমি প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে চলে এসো। ঠিক তিনটের সময়। তিনটে থেকে তিনটে তিরিশ। কেমন। তখন অনেক কথা হবে! অনেক অনেক। আরে দুর, এটা তো অফিস, না কি? এক ঘর লোক। লক্ষ্মী প্লিজ রাগ কোরো না।
বিমান হাত থেকে গরম জিনিস ফেলার মতো করে রিসিভারটা যথাস্থানে ফেলে দিল। মুক্তি! বাবা! একবার কথা শুরু করলে সহজে কি থামতে চায়? মেয়েদের কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই। ফোনটা সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠল। প্রভাতবাবু বললেন, দ্যাখো না হে কার এল। আচ্ছা স্বার্থপর তো। নিজেরটা যেই হয়ে গেল অমনি পালাচ্ছ।
বিমান বললে, আপনারই। রিসিভারটা তুলে প্রভাতবাবুর হাতে ধরিয়ে দিল।
বিমান নিজের চেয়ারে এসে বসতেই পাশের চেয়ার থেকে বিকাশ বলে উঠল, তাহলে আজও আড়াইটেয় কাটছ!
বিমান অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, তার মানে?
তার মানে তুমি আজও কাটছ, এখান থেকেই আমি শুনতে পাচ্ছি, প্লিজ আর লক্ষ্মীটির ছড়াছড়ি। আর কতদিন ঝুলিয়ে রাখবে। অনেক দিন তো হল। এবার ঘরের জিনিস ঘরে তুলে ফেল। রোজ রোজ এই অফিস থেকে আগে আগে বেরিয়ে পড়া, ব্যাপারটা বড় দৃষ্টিকটু হে! আফটার অল আমরা হলুম গিয়ে পাবলিক সারভেন্ট!
বিমান সবে চাকরিতে ঢুকেছে। ঢুকেই পাবলিক সারভেন্টদের যা নমুনা দেখছে তাতে পাবলিকদের ভবিষ্যৎ ভেবে আতঙ্কিত হওয়ারই কথা। অফিসের বাইরে সে-ও তো পাবলিকের একজন। বিকাশও তাই, প্রভাতবাবুও তাই। বিমান বিকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। বিমানের সারা মুখে অত্যাচারের চিহ্ন। মুখ দেখলেই একজন মানুষের জীবনধারণ পদ্ধতির, তার চিন্তাজগতের কিছু আভাস পাওয়া যায়। বিকাশ চেয়ারে গা এলিয়ে সিগারেট ফুঁকছে। সকাল। থেকে একটাও ফাইল ধরেনি। সিনেমা-পত্রিকা ওলটাছে। বিমান বললে, আমার জন্যে তোমার চিন্তার প্রয়োজন নেই। ছুটি পাওনা আছে। প্রয়োজন হলে হাফ সিএল নিয়ে নেব। তুমিও তো পুরো খেলার সিজনটা তিনটের মধ্যেই হাওয়া হয়ে যাও। আজও তো বড় খেলা আছে।
বিকাশ গুম হয়ে গেল। বিমান বললে, নিজেকেই বললে, পেড ব্যাক ইন হিজ ওন কয়েনস। অফিসের যে কটা লোক চাকরি করছে তাদের নব্বই ভাগের স্বভাব যেমন, চরিত্রও তেমন। আসলে এই ধরনের লোককেই বেছে বেছে চাকরি দেওয়া হয়, না চাকরি করতে করতে এইরকম হয়ে যায়! কথায় বলে, দশ বছর স্কুল মাস্টারি করলে গাধা হয়ে যায়, তেমনি হয়তো বছরকয়েক সেরেস্তায় চাকরি করলে মানুষের কালচার-টালচার নষ্ট হয়ে গিয়ে মোটামুটি একটা পশুতে পরিণত হয়। না পশুরও তো গুণ আছে, ক্রিমিনাল হয়ে যায়। একদিন আমিও হয়তো এদের মতো হয়ে যাব। বিমান যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। জীবিকার জন্যে এ কী দাসত্ব, এ কোন পরিবেশে তিল তিল করে শুকিয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে তার প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করে। বিকাশের গালে ঠাস করে একটা চড়। বাপের বয়সি প্রভাতবাবুর ঘাড়ে একটা রদ্দা। চড় অথবা রদ্দা সম্ভব না হলেও, কড়াকড়ি কিছু কথা। নেহাত চাকরিটা বেশি দিন হয়নি। এইসব দপ্তরে। কোথায় যে কী ফাঁদ পেতে রেখেছে জানা নেই। তারপর শালা ক্লিকবাজি করে এমন গাড়ায় ফেলে দেবে—ফিউচার ডুমড। যে করে চাকরি পেয়েছে ভাবলে গায়ে জ্বর আসে। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে নাম। লাখ লাখ বেকার থেকে একটি নাম, ঝাঁক থেকে একটি পাখি তুলে আনার মতোই কঠিন কাজ। তারপর কম সে কম ছবার ইন্টারভিউ। চাকরি যেন দৈত্যের প্রাণ। এক ডুবে সরোবরের তলায় গিয়ে স্ফটিকস্তম্ভ চুরমার করে কৌটোর মধ্যে থেকে ভোমরা বের করে ছাইগাদায় ফেলে টিপে মারতে পারলে তবেই সিদ্ধিলাভ। নচেৎ সেই অফুরন্ত কর্মহীন অবসর।
