পটাপট দরজা-জানালা বন্ধ হচ্ছে। রক-বারান্দা সব খালি।
তপা বেরিয়ে এসেছে। হেডস্যার বললেন—তুমি আমাদের স্কুলের ছাত্র ছিলে। পরিচয় দিতে লজ্জা করে। তোমার বাবা ছিলেন সেক্রেটারি। লেখাপড়ায় তুমি ভালোই ছিলে। অধ্যাপক না হয়ে গুণ্ডা হয়েছ। খুব গর্বের কথা!
তপা মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে।
হেডস্যার বললেন তোমার কাছে তো রিভলভার আছে, যে রিভলভার দিয়ে স্বদেশিরা অত্যাচারী ইংরেজদের মারত, তুমি আমাকে মেরে ফেলল। এ লজ্জা আর সহ্য হচ্ছে না।
একে একে সব মাল ভেতরে উঠে গেল। জগদা বললে—কালই আমি বাড়িটা আপনাদের নামে রেজিষ্ট্রি করে দোব।
বিষ্ণুর মা ধীর শান্ত গলায় বললেন—দান আমরা নিই না। উনি অসুস্থ, বিপদে পড়েছি, সময় হলেই উঠে যাব।
জগদা বললে বাড়িটা তা হলে আমি সুন্দর করে সারিয়ে দোব। যতদিন ইচ্ছে আপনারা থাকবেন। আমার অপরাধ মার্জনা করবেন।
বাংলার স্যার—ইস করলেন।
ব্যায়ামস্যার বললেন—কী হল গোবর মাড়ালেন?
না, না, পরপর দুটো ক্রিয়া, আপনারা থাকবেন, মার্জনা করবেন।
দুটো নম্বর কেটে নিন।
সঞ্জয় আমার কানে কানে বললে—ইস আলুকাবলিটা।
হেডস্যার উঁচু রকে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা সব রাস্তায়। রাস্তার আলো তাঁর মুখে এসে পড়েছে। সুন্দর, সুপুরুষ চেহারা। হাসছেন আর বলছেন—আমি আমার পেসমেকারটা খুলে ফেলে দিতে পারি। তোমাদের সকলের হৃদয়ের শক্তিতে আমি আজ শক্তিমান। তোমরা আমার গর্ব।
আমরা সবাই চিৎকার করে বললুম—আপনাকে আমরা কোনওদিন ভুলব না স্যার। কোনওদিন। ভুলব না।
উপলব্ধি
ওহে তোমার ফোন, সেকশানের বড়বাবু লম্বা হলঘরের মাঝামাঝি জায়গা থেকে হেঁকে উঠলেন। বাঁ-হাতে রিসিভারটা মাথার ওপর তুলে বারকতক নাড়ালেন। এইটাই তাঁর অভ্যাস।
যে-কোনও ফোন এলেই প্রভাতবাবু এই রকম করে থাকেন। এতবড় অফিসে অনবরতই ফোন আসে। সারাদিনে প্রভাতবাবু দাঁড়ে বসা চন্দনার মতো কপচে চলেছেন, ওহে তোমার ফোন। গলার জোরেই বড়বাবু, গলার জোরেই কাজ। তোমার ফোন বলেই প্রভাতবাবু রিসিভারটা ঠকাস করে টেবিলে নামিয়ে রেখে পাশের চেয়ারে যিনি বসে আছেন তাঁর সঙ্গে গল্পে মেতে যান। পাশের চেয়ারটা কদাচিৎ খালি থাকে। তদবিরের জন্যে অনবরতই লোক আসছেন। কাপ কাপ চা আসছে, খিলি খিলি পান উড়ছে। অবশ্য এ না হলে কোনও অফিসের বড়বাবুরই শোভা খোলে না। তোমার ফোন-এ নামটা উহ্য থাকে বলে অফিসসুদ্ধ সকলেই তারস্বরে চিৎকার করে। ওঠেন, কার ফোন বড়বাবু, কার ফোন? বড়বাবু ইতিমধ্যেই কার ফোন ভুলে যান। গল্প করতে করতেই রিসিভার আবার কানে তুলে নিয়ে নামটা জেনে নেন। সেই প্রতিক্রিয়াতেই বিমান জানতে পারল এবারের ফোনটা তার।
বড়বাবুর পেছন দিকে একটা বড় জানলা। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে অনেকটা নীচে রাস্তায় ছোট পিঁপড়ের মতো লোক দেখা যায়। খেলাঘরের গাড়ি। পোর্ট কমিশনারের গোডাউন। গঙ্গা। পরপারের দূর আকাশ। বিমান ফোনটাকে টেবিলের কোনায় টেনে এনে জানলার নির্জনতার দিকে সরে গেল। মৃদু গলায় জানতে চাইল, হ্যালো। যা ভেবেছিল তাই, ইলার গলা ভেসে এল। রাগ, ভালোবাসা, অভিমান, বিক্ষোভ সব মিলেমিশে ইলার গলাটা খসখসে রেকর্ডের মতো শোনাচ্ছে। মৃদু, সংযত। আড়ালে লুকিয়ে আছে উত্তেজনা। বিমান জানলার দিকে সরে এসে ভালোই করেছে। ফোনে নারীকণ্ঠ শুনলেই প্রভাতবাবু মনে করেন হয় প্রেমিকা না হয় রক্ষিতা। অবশ্য তাঁরও দোষ নেই। একই অফিসে, একই ফাইলে মুখ গুঁজে জীবন প্রায় কেটে গেল। চুলে অল্প পাক ধরেছে। স্ত্রী-র যৌবন চলে গেছে। ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। জীবনীশক্তি আস্তে আস্তে কমে আসছে। লোভ বাড়ছে। প্রদীপ নেভার আগে ষড়রিপুর ছটি সলতে ছটি শিখার মতো। উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মানুষের চিন্তা, মানুষের রুচি এই বয়সে একটু অন্যরকম হয়ে যায়। পথের পাশে পড়ে থাকা আমের আঁটির গায়ে ঘিনঘিনে মাছির মতো।
বিমানকে কিছু বলার অবসর না দিয়েই ইলা শুরু করেছে এক গাদা অভিযোগ। দু-মাসের জমে থাকা অভিযোগ বাঁধ কেটে বেরিয়ে আসা জলের মতো কুলকুল করে বয়ে আসছে। তুমি আজকাল আমাকে এড়িয়ে যেতে চাও। কী তোমার এমন কাজ? রাখো রাখো, কাজ সবাই করে। এইরকম হয়, পুরোনো হয়ে গেলে তার আর দাম থাকে না! শনিবার তোমাকে গোলপার্কের কাছে দেখেছি। বুধবার তুমি সিনেমায় গিয়েছিলে। এর আগে তোমাকে আমি দুদিন ফোন করেছি। তোমাকে কেউ বলেনি! কই, তুমি তো রিংব্যাক করলে না! তুমি আমার সঙ্গে এরকম ব্যবহার। করবে না কিন্তু। পরে এজন্যে তোমাকে কাঁদতে হবে দেখো, বলে দিচ্ছি। ইলার গলা ক্রমশই ধরে আসছে। বিমান কোনও জবাব দিতে পারছে না। বিমান কোনও প্রতিবাদ করতে পারছে না। অফিসের ফোনে কাজের কথা বলা যায়, কোনও পাটিকে খেলানো যায়, অধস্তন কর্মচারীকে। ধাতানো যায়, কিন্তু অভিমানী কোনও মেয়ের মান ভাঙানো যায় না। ইলা যেভাবে শুরু করেছে তাতে চালাতে দিলে ঘণ্টাখানেকের আগে ফোন ছাড়বে না। ইতিমধ্যে বাইরের লাইন আসবেই। নিমতলার শ্মশানের মতো অফিসের জেনারেল ফোন কখনও খালি যায় না। বোর্ডে কল মুখিয়েই আছে। ঢোকবার জন্যে ঠেলাঠেলি করছে। অপারেটররা ঝুলিয়ে রেখেছেন। যাঁর ধৈর্য অসীম তিনিই প্রবেশপথ পাবেন। ইলা বলছে, ঘণ্টাদুয়েক চেষ্টা করে তবে তোমাকে পেলুম। তুমি দেখছি দুর্ভেদ্য দুর্গে বসে আছ। ফোনও করো না, দেখাও করো না। বেশ মজা! তোমাকে যে ফোন করব তাও সহজে লাইন পাবার উপায় নেই। দু-ঘণ্টা চেষ্টা করে আজ অবধি যদিও পেলুম, কী উকিলের জেরা রে বাবা! কে বলছেন, কেন বলছেন, কী দরকার? আমি কী বলেছি জানো? তোমার বোন বলছি। কী করব বলো? লোকটা কে গো?
