ব্যায়ামস্যার বললেন—আর আমারও অম্বল! আজ এক বছর হয়ে গেল একটা শিঙাড়া খাইনি, কড়াইশুটির কচুরি খাইনি।
আমাদের মধ্যে অপরেশ অন্য ধাতুতে তৈরি। যেমন চেহারা সেইরকম সাহস। ত্রিভুবনে। অপরেশের কেউ নেই। অনেক সময় মুটেগিরি করে পয়সা রোজগার করে। খুব ভোরে বাড়ি বাড়ি দুধ বিক্রি করে। লেখাপড়ায় ভীষণ ভালো। প্রাইভেট টিউটার রাখার ক্ষমতা নেই। রামকৃষ্ণ মিশনের এক সাধু অপরেশকে পড়ান। আমরা স্বামীজি স্বামীজি করি, অপরেশ স্বামীজিকে তার ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে। অপরেশ বলে, ঠাকুর আমার সব কেড়ে নিয়ে খুব ভালো করেছেন। ঠাকুর, মা, স্বামীজি ছাড়া আমার আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে। আমরা এসব বুঝি না, তবে এটা বুঝি অপরেশ একেবারে অন্য রকমের। যেমন দেখতে সুন্দর, সেইরকম সুন্দর মন।
অপরেশ আমাদের দিকে তাকিয়ে বললে—কেউ আসবে? সাহস আছে? আমরা চারজন এগিয়ে গেলুম। হেডস্যার আসছিলেন, অপরেশ বললে—আপনাকে চিনেছি স্যার। কথা আর কাজ এক করতে পেরেছেন। আপনি পরে আসবেন।
.
৪.
অপরেশ যেদিকে যাচ্ছে সেদিকে বিষ্ণুদের বাড়ি নয়।
ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলুম,—যাচ্ছিস কোথায়?
ফোর্স আনতে। আর একটা কথাও বলবি না। শুধু দেখে যা। আমরা একটা অন্ধকার পাড়ায়। এলুম। খুব খারাপ জায়গা। মেয়েরা ঘুরছে। অপরেশ হনহন করে হেঁটে একটা সাবেক কালের বাড়িতে ঢুকল। গোটা বাড়িটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। পেছন দিকের একটা ঘরে আলো জ্বলছে।
ঘরে একটা ডিভান। ডিভানে বলিষ্ঠ চেহারার এক যুবক আড় হয়ে শুয়ে আছে। আর চারজন মেঝেতে বসে আছে বেশ আয়েস করে। পেছন দিকের দরজাটা খোলা। সেখানে একটা মাঠ। দরজার ধারেই পাঁচটা মোটর সাইকেল অন্ধকারে চকচক করছে। মাঠের ওপারে বড় রাস্তা। আলো জ্বলছে। রাস্তার ওপারে জমজমাট বাজার দোকানপাট, নতুন নতুন বাড়ি। সেটা পেরোলেই রেললাইন। আবার অন্ধকারের এলাকা। মেঝেতে যারা বসেছিল তাদের মধ্যে একজন খুব সুন্দর গলায় রবীন্দ্রনাথের গান গাইছে তোমার অসীমে।
অপরেশ ঘরে ঢুকেই বললে—নিবারণদা, উঠে পড়ো, অ্যাকশান। আবার কী হল? আজ যে আমার অফ ডে। ঠাকুরের জন্মদিন বুধবারে আমিও কোনও কাজ করি না।
ঠাকুরেরই কাজ। তপার দল আমাদের এক হেডমাস্টারের বাড়িতে ঢুকে অত্যাচার করছে। স্যার হাসপাতালে আই সি ইউতে পড়ে আছেন।
কেসটা কী?
মডার্ন ইলেকট্রনিকসের জগদা মণ্ডল বাড়িওয়ালা। ভাড়াটে উচ্ছেদ করে বাড়িটা প্রোমোটারকে দেবে। উৎপাত চলছে অনেক দিন ধরে। স্যার হাসপাতালে। এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে।
তোর প্ল্যানটা বল? তোর মাথা আমার চেয়ে অনেক ভালো।
আমরা পাঁচটা বাইকে চড়ে সোজা জগদার ঠেকে যাব। কোথায় এই সময়ে থাকে তুমি জানো। আমিও জানি। এখন সে খুব দুর্বল। সঙ্গে মেশিন রাখে চালাতে জানে না। যদি ট্যান্ডাই ম্যান্ডাই করে সোজা তুলে নিয়ে যাব ওর গুরুর বাড়িতে। সেখান থেকে মোবাইলে তপাকে বলবে। যদি না বলতে চায় বারুইপুরে তোমার ডেরায় ডামপ।
মন্দ বলিসনি, তপা তো ওইটার কুত্তা। চল তাহলে।
যে গান গাইছিল, সে এবার গাইতে লাগল—কোন খেলা যে খেলবে কখন।
.
৫.
পাঁচখানা মোটর সাইকেল একসঙ্গে পাড়ায় ঢুকল। বিকট শব্দে। আমরা অবাক। জগদার ফুর্তির ডেরার সামনে আমাদের বিদ্যায়তনের অন্তত দুশো ছেলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভেতরে ঢুকে আরও অবাক। জগদা কাঁদছে, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের হেডস্যার, বাংলার স্যার, আর ব্যায়াম স্যার। বেশ একটা নাটক। ব্যায়াম স্যার ঘন ঘন ভেঁকুর তুলছেন।
আমরা যখন ঢুকলুম তখন হেডস্যার বললেন—জগদা! তুমি আমাদের এক্স স্টুডেন্ট। তোমার বাবা ছিলেন অতি সম্মানিত, সাধক মানুষ। ভগবান তোমাকে কিছু কম দেননি, তোমার এই অধঃপতন! গুণ্ডারাজ একদিন শেষ হবে। তখন তুমি কী করবে? বাইরে তাকিয়ে দেখো আমার দুশো ছাত্র হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে আছে আদেশের অপেক্ষায়। আর এই তো আমাদের নিবারণ এসে গেছে। নিবারণকে তুমি চেনো নিশ্চয়।
জগদা হাঁ-করে চেয়ে আছে। ফোলা ফোলা মুখ। কাতলা মাছের মতো চোখ। বাবু আবার মদ খাচ্ছিলেন। সামনের বার ইলেকশানে দাঁড়াবে। এইসব লোক সমাজের মাথা হবে!
হেডস্যার বললেন যে বাপের পরিচয় দিতে গিয়ে ছেলে-মেয়ের মাথা হেঁটে হয়, তারা তো অরফ্যান। তুমি যখন তোমার পিতার পরিচয় দেবে লোকে বলবে আম গাছে আমড়া হয়েছে। শোনো জগদা, আমার শরীরে বিপ্লবীর রক্ত বইছে। এখুনি তোমার সাজানো-গোজানো দোকানটা আমার ছেলেরা চুরমার করে দিতে পারে।
জগদা উঠে দাঁড়াল। টলছে। বললে—আর আমাকে কিছু বলবেন না স্যার। আমি নিজে যাচ্ছি ক্ষমা চাইতে।
একটা মিছিল। পাঁচখানা মোটর সাইকেল আগে। তারপর আমাদের তিনজন স্যার। তারপর আমরা। বিষ্ণুদের বাড়ির সামনের রাস্তায় মালপত্তর ডাঁই। বিষ্ণুর মা আর দিদি সামনের বাড়ির রকে চুপ করে বসে আছেন। আর বাঙালি ভদ্দরলোকের যা রীতি, সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল। আমাদের মিছিল দেখে সব পালাচ্ছে।
নিবারণ একটার হাত চেপে ধরে বললে—পালাচ্ছিস কোথায়! বাকি মজাটা দেখে যা। এই এর ফুলপ্যান্টটা হাফপ্যান্ট করে দে। প্রতিবাদ না করে এই পাড়ার যারা মজা দেখেছে তাদের সঙ্গে ক’টার বাড়ি আজ ভাঙচুর হবে। একসঙ্গে দুশো ছেলে চিৎকার করে উঠল—হবে।
