ব্যায়ামস্যার বললেন—আমাকে আলুকাবলিটা দিয়ে দিলে এখুনি চলে যেতে পারি।
হেডস্যার অবাক হয়ে বললেন—এর ওপর আলুকাবলি চাপাবেন?
ব্যায়ামস্যার বললেন, হাওড়া স্টেশনে ট্রেন ধরতে গিয়ে দেখেননি। পোর্টারকে ডেকেছেন, ভারী ভারী মাল মাথায় তুলেছে। দু-কাঁধে দুলছে দুটোব্যাগ। আপনার হাতের হাতব্যাগটা দেখিয়ে বলছে, ওটাও আমার কাঁধে ঝুলিয়ে দিন। এ আপনার সেই কেস। যাহা বাহান্ন তাহা তিপান্ন।
আমাদের মধ্যে নিমাই খুব উশখুশ করছিল। উঠে দাঁড়িয়ে বললে—স্যার! আমাদের পাড়ায় একটা পরোপকার পাকছে।
হেড স্যার বললেন—ভাষাটা একবার শুনুন। পরোপকার কি ফল, যে পাকবে?
না স্যার, পরোপকারের একটা সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
শুনি কীরকম সুযোগ!
আমাদের বাড়ির পাশেই থাকেন পরেশ জেঠু। সকাল থেকেই খাবি খাচ্ছেন। একটু পরেই মারা যাবেন। খিটকেল টাইপের লোক। জ্যাঠাইমা কাঁদছেন আর বলছেন—কে কাঁধ দেবে।
হেডস্যার বললেন—আমাদের ছেলেরা একেবারে উচ্ছন্নে গেছে। কী সব ভাষা, খিটকেল, খিচাইন, ক্যাচাল!
ব্যায়ামস্যার বিশাল একটু ঢেঁকুর তুলে বললেন—সব ওই টিভি।
হেডস্যার করুণ গলায় বললেন,কথা বলছেন কেন! কথা বললেই ঢেঁকুর লিক করছে।
বাংলার স্যার বললেন—বড় বাজে দিকে আমাদের মন চলে যাচ্ছে। পরেশবাবুকে আমি চিনি। একটা মানুষ মারা গেলে তার যেমন প্রাণ থাকে না, সেইরকম গুণাগুণও থাকে না। আমাদের প্রত্যেকের একটা সামাজিক কর্তব্য আছে, সেই কর্তব্যবোধে ছেলেরা কাঁধ দেবে। একজন চলে যাও ওখানে। শেষ খাবিটা খাওয়া হয়ে গেলে খবর পাঠাও, আমাদের বিদ্যামন্দিরের টিম গিয়ে সল্কার করে আসবে।
হেডস্যার জনমত চাইলেন। কর্তব্য আর পরোপকার কি এক হল?
অবশ্যই হল। অত বড় একটা সমিতি তৈরি হয়ে গেল, হিন্দু সৎকার সমিতি। অসহায় মানুষ রাতবিরেতে মারা গেলে কী হবে? এ তো খালি প্যাকেট নয়, যে ডাস্টবিনে ফেলে দেবে। সেকালে কত হিতকারী সভা, সমিতি ছিল। জলে ডুবে গেলে, পাতকুয়ায় পড়ে গেলে, ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে ছাত থেকে গিরে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে…।
হেডস্যার বললেন—হঠাৎ হিন্দি শব্দ ব্যবহার করলেন কেন? গিরে!
আমি যে বাতলা। সাহিত্য আমার বিষয়। তিনখানা উপন্যাস শেষ। চতুর্থটাও প্রায় শেষ। একবার পড়ে গেল বলেছি। একই ক্রিয়া আমি পর পর দুবার ব্যবহার করি না। আমার ছাত্ররা ব্যবহার করুক তাও আমি চাই না। হেডস্যার বললেন,—উপন্যাসগুলো যন্ত্রস্থ হবে কবে?
সে কি এক কথায় হয় স্যার! মেয়ের বিয়ের মতো! প্রকাশকরা সব পাত্রপক্ষ। নতুন লেখকের লেখা ছাপবে কে?
এ আবার কী? সব লেখকই তো একসময় নতুন ছিলেন। ছাপতে ছাপতে তবেই না পুরোনো হলেন।
সে কথা কে শুনছে স্যার!
যাক, আমাদের কথায় আসি। কতকগুলো জিনিস বোঝার আছে, যেমন পরোপকার, সেবা, সাহায্য কর্তব্য, পরহিত, কোনটা কী? আমাদের মধ্যে থেকে শ্যামল উঠে দাঁড়িয়ে বললে, স্যার! আমার ঠাকুমা একেবারে বুড়ি, কোমর ভাঙা। আমাকে ধরেছেন রোজ সকালে গঙ্গায় স্নান। করিয়ে আনতে হবে। এটা কি পরোপকারের মধ্যে পড়ে। যদি পড়ে, তা হলে আমাকে করতে। হবে। আর তাহলে সকালে আমার পড়া হবে না। আর পড়া না হলে আমি ফেল করব। আর ফেল করলে আমাকে বাড়ি থেকে দূর করে দেবে। আর দূর করে দিলে আমি কোথায় যাব, কী খাব!
শ্যামল বসে পড়ল।
হেডস্যার বললেন—ঠাকুমা পর নন, আপনজন। এ তোমার পরোপকারের মধ্যে পড়ছে না। আপনি কি বলেন?
বাংলাস্যার বললেন—আমার আমি ছাড়া বাকি সবাই তো পর। শ্যামলের পেট খারাপ হলে শ্যামলকেই বাথরুমে যেতে হবে। শ্যামলের ঠাকুমা গেলে হবে না। অতএব?
হেডস্যার বললেন—অতএব?
বাংলা স্যার বললেন—শ্যামলের কেসটা সেবার মধ্যে পড়ছে। আর স্বামীজি পরোপকার, দয়া এইসব কথা সহ্য করতে পারতেন না। তিনি বলতেন শিবজ্ঞানে জীব সেবা। তা হলে?
হেডস্যার বললেন—তা হলে!
তা হলে ব্যাপারটা একটা কথায় এসে দাঁড়াল—সেবা। সেবার মধ্যেই আছে।
ব্রজ উঠে দাঁড়িয়ে বললে—স্যার! আমার বোনের যখনই জ্বর হয় তখনই পা দুটো এগিয়ে দিয়ে বলে, পদসেবা কর।
ব্যায়ামস্যার বললেন—করবি! সঙ্গে সঙ্গে ভেউ করে ভেঁকুর।
নীলাঞ্জন উঠে দাঁড়িয়ে বললে—স্যার! আমার মনে হয় কামারপাড়ায় একটা প্রাইমারি স্কুল করা যেতে পারে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা সারাদিন মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ায়। খুব গরিব ওরা।
হেডস্যার বললেন—গুড আইডিয়া!
বাংলা স্যার বললেন—আইডিয়া গুড; কিন্তু করা যাবে না। রাজনীতি।
হেডস্যার ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন—আমরা তা হলে কী করব?
কিচ্ছু করব না, মিটিং করব।
বিষ্ণু হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে এসে ঢুকল।
কী রে! বাঘে তাড়া করেছে?
বিষ্ণু বললে—শিগগির, পরোপকারের মেশিন বের করুন।
সে আবার কী?
বাড়িওয়ালা গুন্ডা এনে আমাদের সব জিনিসপত্তর বাইরে ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। বাবাও হাসপাতালে। মাকে মেরেছে। দিদির চশমা ভেঙে দিয়েছে।
হেডস্যার বললেন—পুলিশ।
ব্যায়ামস্যার বললেন—পুলিশ কী করবে? এসব পেটি কেস।
তা হলে কে করবে?
কেউ করবে না। দেশ এখন আইনের হাতের বাইরে।
অপরেশ উঠে দাঁড়াল—চলুন না স্যার আমরা দল বেঁধে সবাই যাই।
হেডস্যার উঠে দাঁড়ালেন—নিশ্চয় যাব।
বাংলাস্যার সাবধান করলেন—আপনার বুকে পেসমেকার। আর আমি তো যেতে পারবই না, গলব্লাডার।
