সব লেখালিখির পর কবিতাটা যা দাঁড়াল, ফাটাফাটি আলুকাবলি,
সুদ চায় না এই কাবলি,
জিভে জল, টক, ঝাল, আর মিষ্টি,
কাবুল ফেলে বাঙলায় এল এই কাবলি।
নিমাই স্যার হেডস্যারের পাশের চেয়ারে বসে বললেন—পরোপকার খুব কঠিন কাজ। আমাদের এই জায়গাটা এত হতচ্ছাড়া, না হয় বিধ্বংসী বন্যা, না হয় দুর্ভিক্ষ। এই দুটো হলে পরোপকারের কাজটা সহজ হয়। হাণ্ডা হাণ্ডা খিচুড়ি বানাও, ঝপাঝপ দিয়ে যাও, কপাকপ খেয়ে যাও। হেডস্যার বললেন—সকলের ভাগ্য কি আর ভালো হয় নিমাইবাবু। আমাদের গভীরে ঢুকে কাজ করতে হবে। বেগুন গাছে ঝোলে। মারো টান। হাতে এসে গেল, আর আলু! মাটি খুঁড়ে তুলতে হয়। কারও বেগুনের বরাত কারও আলুর বরাত। আমাদের খুঁড়তে হবে। প্রথমে সারভে।
সুব্রত বলল—স্যার! আমার একটা প্রশ্ন আছে।
একটা কেন, তুমি হাজারটা প্রশ্ন করো।
স্যার! পরোপকার জিনিসটা ঠিক কী?
জিনিস বলছিস কী রে গাধা। বল কর্ম। পরের উপকার।
উপকার কাকে বলে স্যার?
অপকারের উলটোটাই হল উপকার। যেমন মানুষের উলটো হল অমানুষ। উদাহরণ শোন—
একটা মানুষকে ঠেলে ফেলে দিলি। এটা হল অপকার। হাত ধরে টেনে তুললি এটা উপকার। একজন মানুষ খেতে পায় না, তাকে খাওয়ালি, এটা উপকার।
নিমাইস্যার বললেন—এটা উপকার নয় সেবা।
আপনি আবার নতুন কথা এনে ব্যাপারটাকে গুলিয়ে দেবেন না।
ব্যাপার নয়, বলুন বিষয়।
ব্যাপার আর বিষয় এক। এটা ভাষা শিক্ষার ক্লাস নয়। উপকার হল এমন কাজ করা যাতে সমস্যার সমাধান হয়। তোমরা ঘুরবে। ঘুরে ঘুরে দেখবে। নোট নেবে। প্রথমেই কিছু করবে না। আমাদের জায়গায় অর্থাৎ কমিটিতে এসে জানাবে, তারপর অ্যাকশান।
ঝালমুড়ি এসে গেল। রামাধর বানায় বটে! দরজা দিয়ে ঢুকছে ঘরটা গন্ধে ভরে গেল। মার মার কাট কাট। ঠোঙায় ঠোঙায় ভাগ ভাগ করে এনেছে। সুব্রত টপাটপ সব দিয়ে দিল। একটা ভাগ বেশি হয়েছে।
হেডস্যার বললেন—ওটা রামাধরের।
সুব্রত বললে—আমি স্যার বাইরে গিয়ে খাব?
কেন?
গাছতলায় বসে খেতে ভালো লাগে।
নিমাইস্যার বললেন—ঠিক বলেছিস। চল আমিও যাই।
.
২.
একটু দূরে বারুইপাড়া। ওই পাড়ায় বড় বড় কারিগরদের বাস। তাঁরা সেতার, সরোদ, তানপুরা, হারমোনিয়াম, তবলা এইসব তৈরি করেন। বড়-ছোট অনেক দোকান আছে। আমরা ওই দিকটায় যাই লোভে লোভে। একটা বড় কুলবাগান আছে।
আমি আর সঞ্জয় গেছি। বিকেলবেলা। সরস্বতী পুজো আসছে। গাছে গাছে কেমন কুল ধরেছে দেখতে হবে তো। হঠাৎ দেখি একটা দোকানের সামনে এক বৃদ্ধ মইয়ের ওপর কোনওরকমে দাঁড়িয়ে বেশ বড় একটা সাইনবোর্ড লাগাবার চেষ্টা করছেন, পারছেন না। বয়েস হয়েছে। দুর্বল শরীর।
সঞ্জয় বললে—এই দেখেছিস?
কী দেখব?
পরোপকার।
কে করছে?
কেউ করেনি। আমরা করতে পারি। ওই দেখ, দাদু সাইনবোর্ড ঝোলাচ্ছে। একা। পারছেন না। যে-কোনও মুহূর্তে মই নিয়ে পড়ে যেতে পারে। চল সাহায্য করি।
সঞ্জয় বললে—অতবড় জিনিসটা একা পারবেন?
আর একজন পাচ্ছি কোথায়?
আপনার ছেলে নেই?
ছিল। বিয়ে করে বউ নিয়ে পালিয়েছে। ছেলেরা যা করে থাকে!
কই আমার দাদা তো তা করেনি।
তোমার দাদা একটি গাধা।
সঞ্জয় আমাকে বললে—দেখছিস, দাদাকে গাধা বলছে!
এ গাধা ভালো গাধা। তোর দাদার প্রশংসা।
সঞ্জয় বৃদ্ধকে বললেন—আমরা আপনাকে সাহায্য করব।
বৃদ্ধ বললেন—মতলব?
সঞ্জয় বললে—আমরা পরোপকার করে থাকি।
আমি মরলে এসো। কাঁধ দিয়ো। বাঙালি তো একটা পরোপকারই জানে বলো হরি হরিবোল।
কথা শেষ করেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক মই, সাইনবোর্ড, সবসুদ্ধ নিয়ে দাম করে পড়ে গেলেন। সাইনবোর্ডের তলায় বৃদ্ধ। চিৎকার করছেন হিন্দিতে জানে মারা, জানে মারা। চারপাশ থেকে লোকজন ছুটে আসছে। আমি আর সঞ্জয় ছুটছি। পেছনে চিৎকার—পালাচ্ছে, পালাচ্ছে। পাকাড়া, পাকাড়ো।
আমরা কুলবাগানের মধ্যে দিয়ে, পুকুর পাড় ধরে কোনওরকমে পালিয়ে এলুম। কুলকাঁটায় শরীর ক্ষতবিক্ষত। হাপরের মতো হাঁপাচ্ছি। হেডস্যার অনেক রাত পর্যন্ত স্কুলের অফিসে কাজ করেন।
আমাদের দেখে বললেন—কী ব্যাপার? এ কী চেহারা?
সব শুনে বললেন—আমি তোদের কী বলেছিলুম, আগে এসে রিপোর্ট করবি। কমিটি মিটিং-এ পাস হবে, তারপর অ্যাকশান। তোরা যেটা করতে গিয়েছিলিস, সেটা পরোপকার নয় সাহায্য। কালই আমি মিটিং ডাকছি!
সঞ্জয় বললে—ঝালমুড়ি হবে স্যার?
না, আলুকাবলি হবে।
সঞ্জয় উল্লাসে চিৎকার করে উঠল, ইয়া হু!
হেডস্যার ভুরু কুঁচকে বললেন—এটা কী হল?
এটা স্যার আনন্দের চিৎকার।
.
৩.
সেই নিউহলে মিটিং। বাংলার স্যার আর আমাদের ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাকটারও এসেছেন। আমাদের ব্যায়াম, আসন করান বটে, নিজের অম্বলের অসুখ। দশ মিনিটের মধ্যে তিনবার ভেঁকুর তুললেন ভেউ ভেউ করে। হেডস্যার বিরক্ত হয়ে বললেন—জোয়ানের আরক খেয়েছিলেন?
করুণ মুখে বললেন—ইলিশ মাছ!
এদিক নেই ওদিক আছে। যার জল সহ্য হয় না ইলিশ মাছ! ক’টা খেয়েছেন?
খাব না, খাব না করে তিন পিস মেরে দিয়েছি।
আপনি ইলিশ মেরেছেন এইবার ইলিশ আপনাকে মারবে। গঙ্গার ধারে গিয়ে এক ডেলা মাটি খেয়ে আসুন। মিনিটে, মিনিটে এইরকম সেঁকুর তুললে সভা তো সাসপেন্ড করে দিতে হবে।
বাংলার স্যার বললেন—সভা সাসপেন্ড না করে এই ব্যায়ামবীরকে সাসপেন্ড করে দিন। বাড়ি গিয়ে বারান্দায় বসে ভেঁকুর তুলে বাড়ির লোককে মোহিত করুন।
