। আমার এক প্রাচীন গ্রন্থকীট বন্ধু বইটিকে কয়েকদিন আগে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে। উদ্ধার করেছেন এবং তারপর থেকে ভীষণ গম্ভীর হয়ে আছেন। মনে হয় সুখের গৃহশ্মশান করি স্ত্রী নোটিশ দিয়ে সরে পড়েছেন। একই বাড়িতে প্রজ্ঞাসুন্দরী আর আমি, অসম্ভব। সেই রন্ধনপ্রণালী এখন আমার আর এক সুহৃদয়ের গৃহে। হোল ফ্যামিলিই ভোজনরসিক। ধীরে ধীরে বইটিকে হজম করেছেন।
দার্শনিকের মতো বলা ভালো কী হবে খেয়ে? কিংবা বলা যেতে পারে, এমন খাও যাতে দীর্ঘদিন খেতে পারো। রোলিংস্টোনদের জন্যে রোল কাউন্টারই ভালো। অর্ধাঙ্গ কাগজের খোলে অর্ধাঙ্গ বাতাসের মধ্যাহ্নে কিঞ্চিৎ আলুর ঘাঁটি, না হয় ভাজা মাংস। কামড়াতে কামড়াতে নীচে নামো। ওপরে একটু কফি বা চা লড়িয়ে দাও। তারপর ধীরে ধীরে অম্নরসের আধিক্যে পেটটি হয়ে উঠবে চোলাই ভরা ব্লাডারের মতো। গৃহে প্রত্যাগমন করেই বাবুর উইকেট ডিক্লেয়ার নাকিসুরে, আজ আমার নো মিল।
ইয়েস স্যার
আজ শনিবার।
হেডস্যার আজ ছুটির পর মিটিং ডেকেছেন। মিটিং-এর পর ইটিং-এর ব্যবস্থা আছে। ক্লাস নাইন। আর টেনের ছেলেরাই শুধু থাকবে। আমারে স্কুলের বিশিষ্ট দারোয়ান রামাধর দা তাঁর ছোট্ট ঘরে ডাব্বা, ডাব্বা ঝালমুড়ি তৈরি করছেন। গুড়ো মশলার গন্ধে জিভে জল আসছে। হেডস্যার
এলেন। আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালুম। মধ্যবয়সি মানুষ। বেশ মোটাসোটা। ফরসা চেহারা। সাদা পাঞ্জাবি। বোধহয় খদ্দর। মোটা ধুতি। পায়ে বিদ্যাসাগরী চটি। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। কদমছাঁট চুল। আমাদের প্রায়ই বলেন—এদেশে একজন মানুষই জন্মেছিলেন, তাঁর নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আমরা তাঁর পায়ের নখের যোগ্য নই। আমরা সব স্বার্থপর শয়তানের দল। আমাদের ধরে ধরে পেটানো উচিত। আমরা দেশের কলঙ্ক। রবীন্দ্রনাথ লাখ কথার এক কথা বলে গেছেন, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি।
চেয়ারে বসতে বসতে স্যার বললেন বোসো, বোসো, আর সুব্রতটাকে কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে এসো।
সে কোথায় আছে স্যার?
পেটুকরা যেখানে থাকে। রামাধরের ঘরের সামনে ছোঁক ছোঁক করছে। আমাদের যেতে হল না। সুব্রতই এল হুসহাস করতে করতে।
হেডস্যার জিগ্যেস করলেন, আপনি কোথায় ছিলেন জানতে পারি? সুব্রতর চোখ দুটো ছানাবড়ার মতো হয়ে আছে। মুখে হুসহাস শব্দ। সুব্রত খুব সহজ, সরল। একটু বোকা বোকা। বাঁকা কথা। বোঝে না। কেরিয়ার-ফেরিয়ার ধার ধারে না। নিজের জীবনের মজার মজার ঘটনা বলে সারাক্ষণ আমাদের মাতিয়ে রাখে। স্যাররাও তাকে খুব ভালোবাসেন।
সুব্রত বললে—অ্যায়সা ঝাল ছেড়েছে কেউ খেতে পারবে না। জিভের তলায় বাটি ধরতে হবে। আপনার স্যার আলসার আছে, তাই একটু টেস্ট করতে গিয়েছিলুম। ঝাল কমাও, ঝাল কমাও, মুড়ি ঢালো। আমার হেডস্যার মুখে দিতে পারবেন না। এ সেই সরস্বতী পুজোর আলুরদম-কেস। আমাদের কথা শুনলেন না। খেয়ে অসুস্থ হলেন।
স্যার সুব্রতর মন জানেন। অবিশ্বাস করলেন না। বললেন—সামনে বোস, আমার চোখের সামনে। একটা কথা জেনে রাখ এখন সব বাঙালির পেটেই আলসার।
আমরা সবাই কোরাসে বললুম-ইয়েস স্যার।
হেডস্যার সভার কাজ শুরু করলেন। ছোট্ট একটা বক্তৃতা—বয়েজ! যে ভাবেই হোক আমাদের পরোপকার করতে হবে। নিঃস্বার্থ সেবা। ঘোর দুর্দিন আমাদের সামনে। ছেলেরা বাপ-মাকে। দেখে না। ভাই ভাইকে দেখে না। নেতারা দেশ দেখে না। ফি না দিলে ডাক্তার রোগী দেখে না। মাতালে দেশ ভরে গেছে। চতুর্দিকে সন্ত্রাসবাদী। এই অবস্থায় আমাদের জীবনের একমাত্র ব্রত হবে পরোপকার। পরের উপকার। তোমরা সব গ্রুপ করে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ো। সমাজের সর্বস্তরে ঢুকে যাও। আমাদের আদর্শ হবে উইপোকা। উইপোকা যেমন বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে, খাঁজে খাঁজে ঢুকে যায়, আমাদেরও সেই সব ভাঁজে ভাঁজে সমাজের খাঁজে খাঁজে। ঢুকে যেতে হবে। উইপোকা ধ্বংস করে, আমরা গঠন করব। আমরা চটাপট, চটচট হাততালি দিয়ে উঠলুম। খুব ভালো লেগেছে আমাদের।
হেডস্যার খুব অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন—এটা কি নাট্যশালা। পায়রা ওড়াচ্ছিস! ঠিক এই সময় ঘরে প্রবেশ করলেন আমাদের বাংলার স্যার নিমাইবাবু। প্রায় ছ’ফুট লম্বা। স্বাস্থ্যবান। এমন চেহারা, কেন যে বাংলায় পড়ে আছেন আমরা বুঝতে পারি না। আবার কবিতা লেখেন। সেই সব কবিতা আমাদের ক্লাসে শোনা। মানে বুঝি না, তবে শব্দের খেলা, বেশ ভালো লাগে। মেঘলা দিনে সাংঘাতিক কবিতা আসে। কাল সেইরকম একটা দিন ছিল। ক্লাসে বসে বসেই স্যার লিখে ফেললেন,
মেঘের ফানুস উড়ছে
মানুষ কি আর দেখছে।
কাজের কথাই বলছে
ময়ূর কেবল নাচছে।
আমরা টেবিল চাপড়ে চিৎকার করে উঠলুম, ফাটাফাটি, ফাটাফাটি। স্যার বললেন— আলুকাবলি, আলুকাবলি। তার মানে আমাদের আলুকাবলি খাওয়াবেন। তৈরি করবে রামাধর।
আমাদের রামাধরের কোনও তুলনা নেই। রোজ ভোরবেলা গঙ্গায় চান করে। মহাবীরের পুজো করে। আগে কুস্তি করত, এখন আর করে না। যোগাসন করে। স্যার বললেন—আলুকাবলি নিয়ে কবিতা হবে, এক-একজন এক-একটা লাইন লিখবে। চলে এসো বোর্ডে।
আমাদের মধ্যে স্বরাজ কবিতা লেখে। বোর্ডে গিয়ে লিখে এল, ফাটাফাটি আলুকালবি।
মধুকর পরের লাইন লিখলে, সুদ চায় না এই কাবলি।
