কে যেন বলল—রাত তখন তিনটে। উনিশনম্বর মারা গেছে। একটু জল, নার্স আমাকে একটু জল।
আপনি কি ডাক্তার ভাই! আমার স্ত্রী, একেবারে শেষ অবস্থা। কী কেস? ডেলিভারি কেস। এখানে কী? তবে? চলুন চলুন, ডেলিভারি ওয়ার্ডে। সার্জেন–কী হয়েছে সিস্টার? এমারজেন্সি ওয়ার্ডে আর একটা এসেছে। কিছু নেই, একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, বম্ব ইনজুরি। এখনও প্রাণ আছে। তাপসকে বলুন, অ্যাটেন্ড করতে এখুনি, স্যলাইন রেডি করুন। আমার হাতে ডেলিভারি কেস।
ডেটল, ইথার, ইউরিন্যাল, সব মিলিত, মিশ্রিত গন্ধ। বড় বড় চওড়া করিডর, খোলা-গরাদহীন জানালা, উঁচু উঁচু ছাদ, সারি সারি লোহার খাট, সরু সরু লম্বারডে পাখা ঝুলছে, ঘুরছে, হাইহিল জুতোর খটখট, চকচকে, বড় বড় বেঞ্চি, কাবেরী এখন ওই ডেলিভারি লেখা দরজার ওপাশে। কী হচ্ছে সিস্টার, এত দেরি কেন? সিস্টার, ওই যে ছেলেটি এল বললেন, সব ঝাঁঝরা, ওর নাম কি বিশু? সিস্টার তাপসবাবু কি ওকে অ্যাটেন্ড করেছে?
খবর আছে? কী হল কাবেরীর? সিস্টার—শিইজ অল রাইট। ভালো আছে সে, আপনার একটা ছেলে হয়েছে, সাড়ে ছপাউন্ড ওজন। ঠিক চারটে পঞ্চান্ন মিনিটে জন্মেছে। না, এখন দেখতে পারবেন না। সকাল আটটায় আসবেন।
সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে নামছি। পুবের আকাশে আলোর ছোঁয়া লেগেছে। ছেলে হয়েছে! প্রথম সন্তান! কার মতো দেখতে হয়েছে কে জানে। কী নাম রাখব। সময়টা নিশ্চয়ই ভালো ছিল। কেমন হবে! নিশ্চয়ই খুব বড় হবে। হাউস স্টাফদের মিষ্টি খাওয়াব, আর ওই ছেলেদের! ওরা না থাকলে কী করতুম!
—দাদা, একটা সিগারেট দেবেন?
—কে পিন্টু তুমি?
—হ্যাঁ দাদা, কী হল আপনার, বউদি ভালো আছেন তো?
—হ্যাঁ ভাই, ছেলে হয়েছে; কিন্তু বিশু? সে কেমন আছে?
পিন্টু ধোঁয়া ছেড়ে প্রচণ্ড একটা দার্শনিকের মতো বলল—নাঃ বাঁচল না, একেবারে ফর্দাফাই হয়ে গেছে, চারটে পঞ্চান্ন মিনিটে সব শেষ হয়ে গেল। শালা বোমাটা বেশ জবরদস্ত ছিল। ওর মাটার বড় কষ্ট হবে; ওই একটাই তো ছেলে। যাকগে, অতসব ভাবলে চলে না।
মনটা ভারাক্রান্ত হল। পুত্রলাভের আনন্দের অনেকটাই পুত্রশোকের ব্যথায় যেন মিলিয়ে গেল।
—আমার জন্যেই হল ভাই।
—দুর দাদা, কী যে বলেন, ও তো হবেই। আমরা এই আছি এই নেই। আপনি কিছু ভাববেন না। এখন শালা ডেডবডি বার করাই মহা হ্যাপা, পোস্টমর্টেম হবে, মর্গে যাবে। সেই বডি পচে ফুলে উঠবে, তবে শালারা ছাড়বে।
—তোমরা একদিন এস ভাই একটু মিষ্টিমুখ করে যাবে।
—কী যে বলেন দাদা। আমাদের চেনেন না তাই। পাড়ার খবর তো রাখেন না। আমাদের সঙ্গে বেশি দোস্তি মানেই জানেন তো—এই। পিন্টু গলার কাছে হাতের চেটো নেড়ে একটা ভঙ্গি করল যার মানে—জবাই। পিন্টু সিগারেট খেতে খেতে করিডরের আলোছায়ায় মিলিয়ে গেল।
আহারের বাহার
মারা যাওয়ার পর জনৈক প্রখ্যাত সংগীতশিল্পীর আক্ষেপের মন্তব্য: খাওয়ার বারোটা বেজে গেল। মৃত্যু শোকাবহ নানা কারণেই। বিচ্ছেদ-বেদনার ঊর্ধে শিল্পীর মনে আর একটি শিল্পের মৃত্যুর ক্ষোভ দীর্ঘকাল জাগ্রত ছিল। সে শিল্পটি হল, রন্ধনশিল্প। প্রাচীনারা জাগতিক নিয়মেই বিদায় নিচ্ছেন। সেইসঙ্গে বিদায় নিচ্ছে রন্ধন নৈপুণ্য। কথায় বলে, শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবে তাই সয়। খাদ্যবস্তু দেখে জিভে জল না এলেও উদরপূর্তির জন্যে যে-কোনও আহার্যই গলাধঃকরণ করার উদারতায় আমরা অভ্যস্ত। আধুনিকারা হামেশাই বলেন, খোকা ডুডুও খাব টামাকুও খাব, তা তো আর হয় না। কথাটা ঠিকই। পি এইচ ডি মহিলা খোলা ছাতে পৌষের রোদে পিঠ কুঁজো করে সাদা কাপড়ে গুটি গুটি বড়ি দিচ্ছেন ভাবাই যায় না। ঝালের, ঝোলের, অম্বলের, হেঁচকির। সকালের সব কাজ ফেলে চিত্রতারকা শিফনের শাড়ি পরে বঁটিতে হোড় ডিসেক্ট করছেন আর ম্যানিকিওর করা চাঁপার কলির মতো আঙুলে কলাগাছের আঠার সুতো জড়িয়ে জড়িয়ে নিচ্ছেন। অত সময় কোথায়। সেই নাটকের ডায়ালগ, তবে আজ আসিবে খেদী, আমি বড় বিজি। প্রফেশনাল ম্যান। রন্ধনের সময় নেই, আহারেরও মেজাজ নেই। সকালে তরল কিছু কোঁত করে গলায় ঢেলে তড়াক করে লাফিয়ে রাস্তায়, রাস্তা থেকে গাড়িতে, গাড়ি থেকে লিফটে, তারপর চেয়ারে—এইরকম হলেই ভালো হয়।
শিল্পকর্মের উৎসই হল অফুরন্ত অবসর। রাঁধার যেমন তরিবাদি আছে, তেমনি সময়ও লাগে। থালার চারপাশে গোল করে বাটি সাজিয়ে খেতেও সময় লাগে, সাহসও চাই। খেয়ে মরব না তো
এই চিন্তায় খাবার ইচ্ছেও মরে যায়। চিংড়ির মালাইকারি? মন্দ না। বড়ই সুস্বাদু। কিন্তু অ্যালার্জি। কান চুলকে, ঠোঁট চুলকে, পিঠ চুলকে ফুলে ডবল সাইজ হয়ে, চেত্তা মেরে পড়ে। রইলুম তিনদিন! লাল বুলডগের মতো মুখ দেখে সকলেরই প্রশ্ন, আহা ছোকরার অমন মিঠে মুখ এরকম টেগার্ট মার্কা হয়ে গেল কী করে? আজ্ঞে, গলদা খেয়ে।
গঙ্গার ইলিশ বড়ই লোভনীয়। শ্বশুরমশাইয়ের দেওয়া ডে-ডেট, অটোমেটিক ঘড়িটি বাঁধা রেখে ভূতঘাট থেকে না হয় একটা কিনেই ফেলা গেল। তিনি কড়ায় চেপে পোয়াটাক তেল পোড়ালেন, তার ওপর পড়ল কচি সরষে বাটা, লয়া লয়া কাঁচালঙ্কা। খুবই মুখরোচক। ভাত উড়ে গেল সপাসপ। তারপর অফিসের চেয়ার তিনদিন খালি। পি এল-এর দরখাস্ত অফিসকর্তার টেবিলে। না আসার কারণ বাবুর তেলানি হয়েছে। নিজেই ইলিশ হয়ে ঘন ঘন বাথরুমের মাঝখানে খেলে খেলে বেড়াচ্ছেন। ইলিশের ইবলিশ এতকালের শুকনো পাকস্থলীতে ঢুকে ফাউন্ডেশন নাড়িয়ে দিয়েছে। এক্সপার্ট বললেন, তোমার কী করা উচিত ছিল জানো? প্রিভেনশান ইজ বেটার দ্যান কিওর। ইঞ্চি ছয়েক ব্লটিং পেপার প্রথমে কোঁত করে গিলে নিয়ে ইলিশের কাঁচা ঝাল খাওয়া উচিত। আসলে আর্ট এখন বেঁচে আছে প্রোফেশনালদের হাতে। অ্যামেচারের যুগ শেষ। হালুইকর হেলে-দুলে হেলান মেরে রাঁধবেন কারণ সেইটাই তাঁর জীবিকা। ছতারা হোটেলের শেফ, মাথায় সাদা টুপি এঁটে ছত্রিশ পদ লাঞ্চ বানাবেন কারণ ওই আর্ট ভাঙিয়েই তাঁর রবরবা। চিনের রেস্তোরাঁয় হাফপ্যান্ট পরা রন্ধন-বিশারদ পাখির বাসার স্যুপ বানাবেন, কি চিনি স্যুপ তুলে ধরবেন রসিক মানুষের টেবিলে অথবা তৈরি করবেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামি আহার্যপদ—বুদ্ধ জামপিং ওভার দি ফেনস।
