অবশেষে ফোন। গৃহ চিকিৎসক। আমি কী করব মশাই, এ তো আমার কেস নয়, কোনও গাইনোকোলজিস্টকে যোগাযোগ করুন। তাছাড়া আমার জীবন এমনিতেই বিপন্ন, আজ তো। কোনও কথাই চলে না। হাসপাতাল। একের পর এক। রোগী নিয়ে আসুন। অ্যাম্বুলেন্স নেই, কোথায় পাবো অ্যাম্বুলেন্স! প্রথমত হাউস স্টাফরা আগের মতো কাজ করে না। এছাড়া আজকের প্রেসারটা বুঝতে পারছেন না! আপনিও তো আচ্ছা ক্যালাস, এসব কেস বাড়িতে ফেলে রাখে!
বলছেন কী? রুগি বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে? যাবে। কী করা যাবে! ওসব সেন্টিমেন্টাল কথা বলবেন না। এতে আর চিঁড়ে ভেজে না।
—কী করি বলুন তো। প্লিজ আপনি একটু সাহায্য করুন। আমার স্ত্রী..আমি আর বলতে পারলুম না। অফিসার ইনচার্জ সিগারেট খেতে খেতে একটি মাত্রই জবাব দিলেন—শেষ জবাব—কাঁধে করে নিয়ে যান।
আমি প্রায় উড়তে উড়তে ফিরে এলুম আমার ফ্ল্যাটে। সমস্ত বিছানার চাদর হাত দিয়ে খামচাতে খামচাতে কাবেরী যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে প্রায় ধনুকের মতো হয়ে গেছে। সমস্ত মুখে তার। আতঙ্কের ছায়া। না অসহ্য, এ দেখা যায় না। জীবন দিয়েও আমাকে কিছু একটা করতে হবে। ভাবছি আমি। ইতিমধ্যে ঘামে শরীর ভিজে গেছে। বুদ্ধি আর চিন্তাশক্তি ঘোলাটে হয়ে গেছে।
দরজার কড়া নড়ে উঠল। ভারি উত্তেজিত গলার আওয়াজ। আলো নেভান। এই একটা কথায় আমি যেন আলো দেখতে পেলুম। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে গিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ালুম। হাতে ধারালো অস্ত্র চারজন যুবক। আমি দ্বিতীয় কোনও কথা না বলে, সরাসরি আত্মসমর্পণ করলুম—ভাই, তোমরা আমাকে বাঁচাও। আপনাকে মারতে আসিনি আমরা। আলো নেভান। আমাদের কাজের অসুবিধে হচ্ছে। না, সে কথা নয়। আমার স্ত্রী, আমার স্ত্রী আসন্নপ্রসবা। এই মুহূর্তে সে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আমি কোনওভাবেই তাকে হাসপাতালে নিতে পারছি না। তোমরাই আমার ভরসা। তোমরা বাঁচালে বাঁচবে, তোমরা মারলে মরবে।
—পন্টু, দাদা কী বলছে রে! কী করতে হবে আমাদের?
—একটা গাড়ি ভাই। কোনও রকমে আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে হবে। আমাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই। তোমরা ছাড়া।
—ঠিক আছে, বিশু তুই ঝট করে একটা রিকশা ধরে নিয়ে আয়। শালারা এমনি আসতে চাইবে। জোর করে ধরে আনবি। কাছাকাছি যে ডাক্তাররা আছে তাদেরও তো পাবি না, সব লকার এ বসে আছে। শালা প্রাণের কী মায়া! একটা গোঙানির আওয়াজ আসছে?
—ওই তো, ওই তো আমার স্ত্রী যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
—শালা ঠিক মার্ডার করলে যেমন আওয়াজ হয় তেমনি হচ্ছে।
—পন্টু, তোর কোনও বুদ্ধি নেই, একে বলে প্রসববেদনা। আমাদের মায়েদেরও এমনই হয়েছিল, বুঝেছিস!
বিশু নামক ছেলেটি একটা রিকশা ধরে নিয়ে এল। ঘুম জড়ানো চোখ অথবা নেশার ঘোরে রিকশাওয়ালা জিগ্যেস করল কোথায় যেতে হবে? হাসপাতালে। দাদা, সময় আমাদের কম, বউদিকে নামান, গোটা কতক বালিশ আনবেন, বেশ করে সাজিয়ে বউদিকে আরামে বসান, কিংবা কোলে নিন। একলা নামাতে পারবেন?
দেখি চেষ্টা করে।
ওরা পাঁচজন নীচে দাঁড়িয়ে রইল, আর আমি একসঙ্গে দুটো করে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গেলুম। কাবেরীর তখন অন্তিম অবস্থা। যন্ত্রণা যে কত ভয়ানক! একটা প্রাণ পৃথিবীতে আসতে চাইছে, সে যে কী অসহ্য দৃশ্য, জন্ম যে এত বেদনাদায়ক, আমার জানা ছিল না।
কাবেরীকে কোনওরকমে পাঁজাকোলা করে তুলে সবে সিঁড়িতে পা রেখেছি প্রচণ্ড শব্দে একটা বোমা ফাটল, কাবেরী চমকে উঠল, যন্ত্রণা যেন সাময়িকভাবে অপসৃত হল, অন্যরকম একটা আতঙ্কে। বারুদের গন্ধ এল নাকে, একটা আগুনের ঝিলিক, কিছু শক্ত কঠিন জিনিস দেওয়ালে, কাচে লাগল। সিঁড়ির শেষ ধাপে দরজার সামনে তখন ধোঁয়ার কুণ্ডলি।
কিন্তু এ কী! দরজার সামনে বিশু পড়ে আছে রক্তাক্ত। ক্ষতবিক্ষত, জীবন আছে কি নেই বোঝা যাচ্ছে না। রিকশা দাঁড়িয়ে আছে, রিকশাওয়ালা নেই, নেই আর চারটি ছেলে। কাবেরীর যন্ত্রণা আবার ফিরে এল। আমার জামাটা খামচাতে লাগল, দাঁত দিয়ে টুকরো টুকরো করল শাড়ির আঁচল। ভাবছি এখন কী করব! তারা কোথায়? হঠাৎ অন্ধকার থেকে পন্টু বেরিয়ে এল—ভাববেন না কিছু বউদিকে বসান রিকশায়।
—কিন্তু বিশু, বিশুকে তো আগে হাসপাতালে নেওয়া দরকার। ও কি বাঁচবে? দৃশ্য দেখে কাবেরী তখন মূৰ্ছিত।
—আপনি কিছু ভাববেন না দাদা, আমরা মরতেই জন্মেছি, ওকে আমরা কাঁধে করেই নিয়ে যাব। আর সময় নেই, আপনি উঠে বসুন, ব্যাটা রিকশাওয়ালা ভয়ে ভেগেছে, আশেপাশেই আছে ধরে আনছি।
ইতিমধ্যে অন্ধকার ঠেলে ঠেলে আর তিনটে ছেলে ফিরে এল।
—শালা, ওরা তিনজন ছিল। দুটো পালিয়েছে, একটাকে খতম করেছি। শালা, কী রক্ত মাইরি, যেন পিচকারি। মানুষের শরীরে এত রক্ত থাকে! দেখ, জামা-প্যান্টের কী অবস্থা।
—তুই আর এগোসনি, বউদি ভয় পেয়ে যাবে। তোরা একজন রিকশাওয়ালাকে ধরে নিয়ে আয়, তারপর চল, বিশুটাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাই। যদি বাঁচে।
রাত তখন কটা! হাসপাতাল যেন ক্লান্ত; মৃদু আলোকিত করিডর, সারি সারি নিদ্রিত রোগী। কোথাও কোনও রোগী আধবসা, ঘুম তার আসছে না, কেউ কাতরাচ্ছে যন্ত্রণায়। ওয়ার্ড খালি, কোথায় নার্স, কোথায় হাউস সার্জেন। কিন্তু এতদূরে যখন আসতে পেরেছি তখন বাকিটারও ব্যবস্থা করতে হবে।
