এই হল ধড়িবাজ মুকুন্দর বিখ্যাত কায়দা। জানে এইতেই বড়মামা কাবু হয়ে যাবেন। ও আবার। বড়মামাকে বড়দা বলে। বড়মামা কাবুও হয়ে গেলেন। বললেন, ‘শোন, তুই ভণ্ড নোস। কথায় কথায় জয় নিতাই, জয়ঠাকুর বলবি না।’
মুকুন্দ বললে, ‘বাবড়িদা আরও ফিরিস্তি বের করেছে।’
‘বাবড়িদা? সেটা আবার কে?’
‘ওই যে দলের হেড।’
‘কী বলছে?
‘বলছে, প্রভুকে বলো, একটা মাইকের ব্যবস্থা করতে; আর দু-কেটলি চা পাঠাতে বলো। এখন সন্দেশ চাইনা। গরম নিমকি দিয়ে শুরু করি। আর বলছে ভোগের ব্যবস্থা করতে।’
‘কার ভোগ? ওদের ভোগের জন্যে তো বাজারের পুরো ভেজিটেবিল সেকশানটা কিনে এনেছি।’
‘না, না, ঝোলা থেকে এতটুকু একটা জগন্নাথদেবের মূর্তি বের করে জানলার ওপর রেখে বলছে, ‘ভোগ দিতে হবে।’ একটা ফর্দ তৈরি করে আমাকে কী বিশ্রীভাবে বললে, ‘এই ছেলে, এটা। তোর ডাক্তারকে দে।’ আপনার প্লাস্টিক দেয়ালে নস্যি মুছেছে। আর উঠোনের পাশে নতুন যে তিনটে গোলাপ গাছ পুঁতেছিলেন, মাড়িয়ে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে। আবার বলছে, ‘কেলে কেলে আটটা কুকুর পুষেছে। মানুষ খেতে পাচ্ছে না, রাজভোগ দিচ্ছে কুকুরকে। পয়সা থাকলে কী না হয়? ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ দেয়।’
‘তুই বিনা প্রতিবাদে এই সব শুনে এলি!’
‘আপনার লোক!’
‘তুই কার লোক?
‘আপনার লোক।’
‘আমার লোক হয়ে, আমার নিন্দে শুনে এলি?’
‘নিন্দে তো তেমন করেনি। বড়লোক বলেছে।’
‘বড়লোক বলাটা একটা গালগাল। এই বুদ্ধিটুকু তোর ঘটে নেই! যা, এইবার তুই গিয়ে বৃন্দাবন দেখা।’
‘কী ভাবে দেখাব? ক্যারাটে কুংফু চালিয়ে দোব? দেখব একসঙ্গে এগারোটিকে পারা যায় কি না?’
‘কিচ্ছু করতে হবে না, তুই একসঙ্গে আমাদের আটটা কুকুরকে একবার খেলিয়ে দে, এধার থেকে ওধার।’
মেজোমামা বললেন, ‘বড়দা যা করবে আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে করবে। তোমার মনে আছে ফুলচুরি বন্ধের জন্য তুমি একবার কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিলে। সেই কুকুর লাট্ট বলে একটা ছেলেকে কামড়েছিল। লাটুর বাবা দলবল নিয়ে বাড়ি চড়াও হয়েছিল। থানা, পুলিশ শেষ পর্যন্ত পার্টি। শেষ পর্যন্ত অপমানজনক অবস্থায় তোমাকে হাজারটা টাকা দিতে হল। টুলের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইতে হল। তোমার ভুলোমন, ভুলে যেতে পারো। তোমার অপমান আমরা ভুলিনি। বেদনার মতো বিঁধে আছে মনে। সে ব্যথা, কী যে ব্যথা!’
বড়মামা মেজোমামার কথায় অভিভূত হয়ে বললেন, ‘অ্যাঁ বলিস কী? সেই অপমানের বেদনা কণ্টকসম খোঁচা মেরে আছে মানসমন্দিরে!’
মেজোমামা বললেন, ‘এই আবেগের মুহূর্তে তোমার ভাষা-সংশোধনের চেষ্টা আমি করব না। এইটুকু বলতে পারি সাহিত্য তোমার লাইন নয়। তবে জেনে রাখো, আমরাই তোমার প্রকৃত আপনজন।’
মাসিমা বললেন, ‘দাদা মনে করে, আমরা দাদার কেউ নই। দাদার যত আপনজন রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে আছে। দাদা আমাদের পরামর্শ নেবে না। দাদার যত পরামর্শদাতা হল বাইরের লোক। তুমি আমাদের যখন চাও না, আমরা তখন চলেই যাই।’
বড়মামা বললেন, ‘চান্স পেয়েছিস এখন, আমাকে যত পারিস আঘাত কর। এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো। এই করেছ ভাল নিঠুর হে।’
মুকুন্দ বললে, ‘আমি তা হলে আটটা কুকুরকে খেলিয়ে দিই। জিনিসটা বেশ জমে যাবে। এদের পেছনে পার্টির কোনও লোক নেই। না সি পি এম, না কংগ্রেস!’
মেজোমামা বললেন, ‘তোমাকে পাকামো করতে হবে না। আমি দেখছি। এটা বড়দের ব্যাপার। আমাদের একটা মানসম্মান আছে।’ মেজোমামা আর আমি যখন বারান্দার সামনের উঠোনে ফিরে গেলুম তখন কীর্তনিয়ারা বেশ জাঁকিয়ে বসে গেছে। তিলক মাটি বের করে সব দগদগে রসকলি করেছে। কপাল থেকে একেবারে নাকের ডগা পর্যন্ত। কপালে মেরেছে তে-দাঁড়ি।
আমাদের আসতে দেখে দলের হেড অমনি উঁচু গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘কই, কী হল, মাইক আনতে গেছে? চা কোথায়? চা! খোকা কই, সিগারেট তো পাঠালে না।’ আর একজন অমনি পাশ থেকে আখর দিয়ে উঠলেন, ‘লবঙ্গ আর বচ?’’
কীর্তনের দল তো! কথাও বলেন সব কীর্তনের কায়দায়। একজন ছাড়েন তো আর একজন পাশ থেকে ধরে নেন। মেজোমামা সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়েই দুটো হাত মিশনারি ফাদারদের কায়দায় ওপরে তুললেন। দলের লোকেরা সব চুপ মেরে গেল।
মেজোমামা যেন ইলেকশনের বক্তৃতা দিচ্ছেন, ‘বন্ধুগণ, অনিবার্য কারণে আজ এখানে কীর্তন। হবে না। আপনারা দয়া করে শোরগোল করবেন না। আমাদের আটটা কুকুর কীর্তন একেবারে সহ্য করতে পারে না। শুনলেই খেপে গিয়ে চেন ছিঁড়ে তেড়ে যায়। তখন আর তাদের সামলানো যায় না। আষাঢ় মাসে রথের সময় একটা কুকুর ভগবানদাস বাবাজিকে এমন কামড়েছিল যে। সাতটা স্টিচ করতে হয়েছে। আমার অনুরোধ আপনারা সব মালপত্র গুছিয়ে নিন। বিপদের ঝুঁকি নিয়ে হরিনাম চলে না। হরিনাম করতে হবে নির্জনে। নিরাসক্ত মনে। আপনাদের একটা লম্বা। সিধে দেবার ব্যবস্থা করেছি আমরা। সঙ্গে ভালো প্রণামী। আপনারা যে-যার জায়গায় শান্ত হয়ে বসুন। ছটফট করবেন না। আমাদের সবচেয়ে মেজাজি কুকুরটা চেন ছিঁড়ে বেরিয়ে গেছে। যে কোনও মুহূর্তে ছিটকে চলে আসতে পারে।’
মেজোমামা অন্দরমহলে ফিরে এলেন বিজয়ীর মতো।
মাসিমা জিগ্যেস করলেন, ‘কি, ম্যানেজ করতে পারলে?’
‘পারব না মানে, কার ভাই দেখতে হবে তো!’
