আমি বড়মামাকে বলতে এসেছিলুম, মাসিমা আমাকে ট্যাক্সি ডাকতে বলেছেন। বলব কী! কীর্তনের দল বড়মামাকে হেঁকে ধরেছে। হেড বলছেন, ‘তা হলে, আমাদের প্রত্যেকের জন্যে একটা করে গোড়ের মালা আনান। আমার মালাটা যেন বড় হয়। আর লবঙ্গ, তালমিছরি, ডালচিনি, যষ্ঠিমধু আর বচ আনাবেন বেশি করে। বহুত চেঁচাতে হবে মালিক। আর আহারাদির ব্যবস্থা তো করবেনই। তিন-চার রকমের ব্যঞ্জন। গোবিন্দভোগ চালের ভাত। গাওয়া ঘি-টা আমাদের একটু বেশিই লাগে। ওইটাই আমাদের শ্বাসের শক্তি। কণ্ঠকে নরম রাখে।’
আমি ভাবলুম, আহা, ওই তো গলার ছিরি! তার আবার ফিরিস্তি কত! একফাঁকে বড়মামাকে বললুম, ‘মাসিমা ট্যাক্সি ডাকতে বলছেন।’
কী বুঝলেন কে জানে! হাতের ঝটকা মেরে বললেন, ‘এখন আমার সময় নেই। দেখছিস, বাড়িতে এত বড় একটা উৎসব!’
‘আমাকে ডাকতে বলছেন।’
‘কাকে ডাকতে বলছেন?’
‘ট্যাক্সি। ট্যাক্সি ডাকতে বলছেন।’
‘ট্যাক্সি? ট্যাক্সি কী হবে?’
‘আপনার উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে মাসিমা তাঁর বন্ধু বাসন্তীর বাড়িতে চলে যাবেন।’
‘বলিস কী? আমার উৎপাত? আমি আবার কার কী করলুম? চল, তো! দেখি। এ এক অদ্ভুত বাড়ি ভালো করলেও মন্দ, মন্দ করলেও মন্দ।’
মাসিমা সেই একইভাবে বসে আছেন। কিছু দূরে মেজোমামা বসে আছেন ব্যাজার মুখে। বড়মামা মাসিমাকে দেখে বললেন, ‘আরে, এ তো নার্ভাস ব্রেকডাউনের কেস! ব্লাডপ্রেশার ফল করেছে। আমি এখনই একটা স্টিমুলান্ট ইঞ্জেকশান করে দিচ্ছি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
মাসিমা বললেন, ‘নার্ভাস ব্রেকডাউন নয়, আমরা দুজনে সিদ্ধান্ত করেছি, তোমার অপশাসন, তোমার স্বেচ্ছাচারিতা, তোমার স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত হয়ে আমরা কোথাও চলে যাব। মেজদা আজকের মতো কোনও হোটেলে গিয়ে উঠবে। আর আমি চলে যাব আমার এক বান্ধবীর বাড়ি। তারপর দুজনে মিলে যা হয় একটা কিছু ব্যবস্থা করব। আর যে-কটা বছর বাঁচি, আমরা একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই।’
বড়মামা হাঃ হাঃ করে পায়রা-ওড়ানো হাসি হেসে বললেন, ‘খুব পাকা পাকা কথা শিখেছিস। আমার সব হাঁটুর বয়সি, বলে কি না, যে-কটা বছর বাঁচি! জীবন এখনও শুরুই হল না। শোন, তোদের এই সিদ্ধান্তকে কী বলে জানিস! রাজনীতির ভাষায় বলে, কু-অভ্যুত্থান বিদ্রোহ। তোদের ভালোর জন্যেই আমি একটা পাকাঁপাকি ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলুম। তা দেখছি যাদের জন্যে চুরি করি, তারাই বলে চোর। স্বার্থপরের দুনিয়ার এইটাই হল নীতি।’
মেজোমামা বললেন, ‘পাকাঁপাকি ব্যবস্থাটা কী? বছরের পর বছর ধরে সারা দিনরাত কীর্তন। এতে আমাদের কী ভালো হবে শুনি। আমরা কালা হয়ে যাব। পাগল-পাগল হয়ে যাব। আমাদের কাঁপুনি রোগে ধরবে। হার্ট অ্যাটাকও হয়ে যেতে পারে! আর কী ভালো হবে শুনি?
বড়মামা বললেন, ‘মানুষ যখন রেগে থাকে, তখন তার বুদ্ধি কীরকম বিকল হয়ে যায় দেখেছিস! কীর্তন হল বৈষ্ণব ধর্মের প্রধান অঙ্গ। মস্ত বড় একটা সাধনা। এতে শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম, প্রাণায়াম আছে। সুর আর তাল সহযোগে আত্মনিবেদন আছে। ভক্তি আছে। ঈশ্বরকে পাবার সব ব্যবস্থাই আছে। এতে মানুষের মনের পরিবর্তন হয়। আমরা খুনি। কত মুরগি, কত পাঁঠার খুনের কারণ হয়েছি আমরা। আমাদের রক্তে, আমাদের নিশ্বাসে, পেঁয়াজ-রসুনের ম্লেচ্ছ গন্ধ। ম্লেচ্ছ আহারে আমাদের লোভ বাড়ছে, হিংসা বাড়ছে। ক্রোধ বাড়ছে। নামগান ছাড়া আমাদের মুক্তি নেই। তোদের জানা নেই, মাছ, মাংস, ডিম আমাদের কত সর্বনাশ করে! শরীর বিষিয়ে দেয়। বাত হয়, হার্টের অসুখ হয়। নিরামিষ খেলে শরীর ভালো হয়। চেহারায় একটা লালিত্য আসে। মানুষ দীর্ঘজীবী হয়।’
মাসিমা বললেন, ‘তুমি আমাদের নিরামিষ খাওয়াবে খাওয়াও। কিন্তু এই দলটাকে তুমি কোথা থেকে ধরে আনলে? শ্রাদ্ধের কীর্তন। সারা বাড়িতে মৃত্যুর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এদের আমি চিনি। এরা ডেডবডির পেছন পেছন গান গেয়ে ফেরে। এ-কীর্তন সে-কীর্তন নয় বড়দা। এ হল মৃত্যুর কীর্তন। এদের বাড়িতে ডেকে আনা মানে মৃত্যুকে ডেকে আনা। অলক্ষণ।’
বড়মামা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
মেজোমামা বললেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে তুমি অগণতান্ত্রিক কায়দায় অত্যাচারী ডিকটেটারের মতো সংসার চালাচ্ছ।’
বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে ভাব পালটে বললেন, ‘ওই অত্যাচারী শব্দটায় আমার ঘোরতর আপত্তি। আমি স্বীকার করছি, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি একটু কম। আমি একটু হুজুগে আছি। আমাকে তোরা আজ এতবড় একটা কথা বলতে পারলি? আমি অগণতান্ত্রিক, অত্যাচারী, ডিকটেটার! বেশ, তোদের কাউকে যেতে হবে না। আমিই চলে যাচ্ছি।’
বড়মামা আমাকে বললেন, ‘এই, একটা ট্যাক্সি ডাক তো।’
‘আপনার তো গাড়ি আছে বড়মামা!
‘না না, এটা গাড়ি-ঘোড়ার ব্যাপার নয়। কোথাও বেড়াতে যাওয়া নয়। এ হল গৃহত্যাগ। এদের আমি কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। আর আজ এরাই আমাকে বলছে অত্যাচারী, স্বৈরাচারী!
‘তা হলে আমি ক’টা ট্যাক্সি ডাকব?’
‘আমি আমারটা বলতে পারি। আর কার কী লাগবে আমি জানি না। জানলেও বলব না।’
ঠিক এইসময় মুকুন্দ সামনে এসে দাঁড়াল। এসেই বললে, ‘জয় নিতাই।’
বড়মামা ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘জয় নিতাই মানে?
মুকুন্দ ভেবেছিল খুব বাহাদুরি নেবে। বড়মামার মেজাজ দেখে চুপসে গেল। আমতা আমতা করে বললে, ‘ওরা সব কথায় কথায়, জয় নিতাই জয় শ্রীগৌরাঙ্গ বলছে তো, তাই আমিও বলেছি। যদি অপরাধ হয়ে থাকে, আমার গালে মারুন দুই থাপ্পড়।
