মেজোমামার এই একটা গুণ। বড়মামার সঙ্গে লাঠালাঠি ফাটাফাটি হয়ে যাবার পর বোঝা যায় মেজোমামা বড়মামাকে কত ভক্তিশ্রদ্ধা করেন। এই যে বললেন, ‘কার ভাই দেখতে হবে তো’। শুনে বড়মামার মুখে রামচন্দ্রের মতো অদ্ভুত হাসি ফুটল। বেতের গোড়া থেকে উঠে এসে। মেজোমামাকে জড়িয়ে ধরলেন।
মাসিমা বললেন, ‘আহা! কী সব ছিরি! ক্ষণে ক্ষণে বহুরূপীর মতো রূপ পালটায়। এই তরোয়াল হাতে লড়ছে, এই আবার ঈদের কোলাকুলি।
বড়মামা বুকপকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করে মেজোমামার হাতে দিয়ে বললেন, ‘কিছু কিনে খাস।’
মাসিমা বললেন, ‘আমরা শুধু দেখব?
বড়মামা হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘এটা একেবারে আমাদের নিজস্ব ব্যাপার। খুব ভেতরের ব্যাপার। ও যখন স্কুলে পড়ে আমি তো তখন খুব বড়। গোঁফ-দাড়ি গজিয়ে গেছে। হাতে-পায়ে লোম বেরিয়ে গেছে। দুই ভাইয়ের সংসার। তুই তো তখন প্যান্তাখ্যাঁচা এতটুকু একটা মেয়ে। সারা দিনরাত কেবল উঁ উঁ করে নাকে কান্না। তোর অবশ্য দোষ ছিল না। ওইটুকু একটা মেয়ে কী আর করতে পারে বল? তা ছাড়া ছোট-ছোট মেয়েদের শুয়োপোকার মতো খুব খিদে হয়। তোকে খাওয়ানোর মতো অত খাবার তখন আমি পাব কোথায়। সকালে ডাল-ভাত, রাতে গুড় ছাতু এই তো তখন চলছে। অভাবে অভাবে সবসময় আমার মেজাজ ঠিক থাকত না। ভাইয়ে ভাইয়ে মাঝেমধ্যেই ঘষাঘষি হয়ে যেত। আমারই দোষ, দাদাগিরি ফলাতে হবে তো। তখনও এইরকম রামলক্ষ্মণের মিলন হত। আমি আবার কলার-ফাটা ছেড়া জামার পকেট থেকে দুটো পয়সা বের করে মেজোকে দিতুম, ও অমনি ছুটে গিয়ে কিনে আনত পাঁচটা গুলি লজেনস। আমরা তিনজনে দুপুরবেলা আমাদের ভাঙা ছাদে বসে বসে খেতুম। দূর থেকে ভেসে আসত বড়লোকদের বাড়ির রেডিয়োর গান। কীসব সুন্দর গান ছিল তখন—শিল্পীমনের বেদনা নিঙাড়ি পথেই জনম, পথেই মরণ আমাদের জীবননদীর জোয়ার ভাঁটায় কত ঢেউ ওঠে পড়ে। উঃ, সেসব কী টেরিফিক দিন গেছে আমাদের! সেই সব সুখের দিন আর ফিরবে না। ভাঙা মেঝেতে ফাটা কলাপাতায় ডাল-ভাত। কোষো পেয়ারা শিলে থেঁতো করে নুন আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে আচার। তোকে ফ্রক কিনে দেবার পয়সা নেই, পুজো এসে গেছে। উঃ, কী উত্তেজনা! কুসিটার ফ্রক হবে না। মেয়েটা পুজোয় পাবে না কিছু। শেষে কাপড় কিনে এনে পুরোনো ফ্রক ফেলে ছাঁট কেটে, সারা রাত কুপির আলোয় বসে বসে সেলাই। কোথায় লাগে তোর উপন্যাস! মাই লাইফ ইজ এ উপন্যাস।’
মেজোমামার আবার কথায় কথায় চোখে জল চলে আসে। বড়মামার কথায় চোখ ছলছলে হয়ে এসেছে।
মেজোমামা বললেন, ‘মনে আছে, তুমি কত কষ্ট করে আমাকে স্কুলে ভরতি করেছিলে! তারপর সেই ফ্রি-শিপের জন্যে তোমার অপমান। দিনের পর দিন ঘুরিয়ে সেক্রেটারি তোমাকে কী বললেন?
‘উঃ, সে এক জিনিস রে ভাই! রাত সাতটা অবধি বসিয়ে রাখার পর বাবু আমাকে বললেন, ‘কোন বংশের ছেলে তুমি! ভাইকে ফ্রি-তে পড়াতে তোমার লজ্জা করবে না? মান-সম্মানে লাগবে না? স্কুলের ক’টা টাকাই বা মাইনে। তুমি কি বলতে চাও সেই ক’টা টাকা তুমি জোগাড় করতে পারবে না? ফ্রি-তে পড়লে তোমার ভাইয়ের মনের অবস্থা কত হীন হয়ে যাবে একবার ভেবে। দেখেছ? আহা, অন্য কেউ নয়, তোমার নিজের ভাই। তাকে কি এইভাবে তোমার ফাঁকি দেওয়া উচিত!’ আমি চেয়ার উলটে দিয়ে পালিয়ে এসেছিলুম। সেইদিন আর একবার ভালো করে। বুঝেছিলুম, দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না। তারপর আমি করলুম কী? আমার হাত আছে, পা। আছে, মাথা আছে। ভাইটাকে লেখাপড়া শেখাতে পারব না! খাটালের রামখেলোয়ানকে বললুম, ‘তুমি আমাকে সাহায্য করো।’ রাম আমার খুব বন্ধু ছিল। রাম আমাকে ফ্রি দুধ খাওয়াত বলেই না আজ আমার এই স্বাস্থ্য! রাম বললে, ‘কী সাহায্য মেরা গোপাল?’ ‘আমি তোমার কাছে গোবর কিনব। তোমাকে একটু দাম কমাতে হবে।’ রাম বললে, ‘গোবর কী করবে?’ ‘ঘঁটে দেব।’ ‘তুমি ঘুটে দেবে?’ সব শুনে বললে, ‘তোমার যত লাগে ফিরি নিয়ে যাও।’ উঃ, সে কী উত্তেজনা! সারা সকাল, গোটা দুপুর পাঁচিলে পাঁচিলে ঘুটে দিচ্ছি থ্যাপ থ্যাপ করে। প্রথম দিন তো এমন ঘেন্না, নিজের ডান হাতে খাবার তুলে খেতে পারি না। আমাকে দাবিয়ে রাখবে ব্যাটা সেক্রেটারি! ওপর থেকে দ্যাখ—এই আমার ভাই, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, গোল্ড মেডালিস্ট। পেরেছ আটকাতে কুচক্রী ধনগোপাল?’
মেজোমামা হঠাৎ নীচু হয়ে বড়মামার পায়ের ধুলো নিলেন। বড়মামা কাঁধ ধরে তুললেন। মেজোমামার গাল বেয়ে জল নামছে। মেজোমামা বড়মামার দু-কাঁধ ধরে বললেন, ‘বড়দা, তুমি। কত বড়! তোমার চরিত্রের একটুও যদি পেতুম!’
বড়মামা বললেন, ‘তুই আমার গর্ব।’
মেজোমামা বললেন, ‘তোমার একটা জীবনী লেখো।’
‘আমার বাংলা আসে না।’
‘তুমি যেমন বলো বলে যাবে, আমি লিখে যাব।’
বিরাট সিধে আর পাঁচশো টাকা নিয়ে কীর্তনের দল চলে গেল। মুকুন্দর ভীষণ রাগ। দেখো তো মাসি কী কাণ্ড! কোনও মানে হয়! কেমন টাকাটা মেরে নিয়ে চলে গেল।’ মুকুন্দর সম্পর্ক পাতানোর যেমন ছিরি। বড়মামাকে বলছে বড়দা আর মাসিমাকে বলছে মাসি। আমাকে বলতে এসেছিল, আমি পাত্তা দিলুম না। সেই ঘুড়ির ঘটনার পর আমার পিত্তি চটে আছে। মুকুন্দ সেটা বুঝতে পেরেছে। আমার দুটো হাত ধরে বললে, ‘তুমি আমার সঙ্গে কথা না বললে ভীষণ খারাপ লাগে। তুমি আমার ওপর রাগ করেছ। আমি ইচ্ছে করেই তোমার জন্যে ঘুড়ি আনিনি। কেন। বলো তো? ভাদ্রমাসের রোদ খুব খারাপ। তুমি সারা দিন রোদে ঘুড়ি ওড়াবে, রং কালো হয়ে যাবে, পিত্তি পড়ে চোখ হলদে হয়ে যাবে। বিশ্বাস করো আমি সেটা চাই না। তোমাকে আজ আমি কানাই মোদকের গোলাপি ছানার মুড়কি খাওয়াব।’
