মেজোমামা আধবোজা চোখে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘সমাধি নয়, সমাধি নয়, হার্ট অ্যাটাক। করোনারি থ্রম্বোসিস।’ বাঁকি আর ঝাঁকাওয়ালারা বলছে, ‘আমাদের ছেড়ে দিন বড়বাবু।’
মাসিমাকে জিগ্যেস করলুম, ‘এটা কী হচ্ছে মাসিমা? বড়মামা তো তারা তারা করতেন। আজ হঠাৎ হরি হরি!’
মাসিমা যা বললেন, তা একমাত্র বড়মামার পক্ষেই করা সম্ভব। মাছের বাজারে ঢুকে দেখেন দর যাচ্ছে, পঁয়তাল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট। বড়মামার আটটা কুকুরে রোজ প্রায় আস্ত একটা পাঁঠা খেয়ে। ফেলে। এর ওপর গোটা কুড়ি ‘গেস্ট’ বেড়াল আছে। ঠিক একটা থেকে দেড়টার মধ্যে সব লাইন দিয়ে এসে বসে। যেন মধ্যাহ্নভোজনের নিমন্ত্রণের কার্ড পেয়ে এসেছে। রোজ তিন কেজির মতো মাছ লাগে। সব মিলিয়ে খরচের বহর দেখে বড়মামার মাথা ঘুরে গেছে। তাই তিনি মাছের বদলে, মাংসের বদলে, ছ’-রকমের ডাল কিনেছেন, চার কেজি ঘিয়ের টিন কিনেছেন। বাজার ঝেটিয়ে আনাজ কিনেছেন। এক বাঁক ছানা আর দই কিনেছেন। কিনে ফেরার পথে মোচ্ছবতলায় কীর্তন দলের সঙ্গে দেখা। তাঁরা খোলটোল বেঁধে, টগরটগর শব্দে রেলা নিচ্ছিলেন। বিরাটিতে বায়না ছিল আজ। বড়মামার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। মাছ, মাংস, ডিম, পেঁয়াজ প্রভৃতি আঁশটে জিনিস ত্যাগ করলুম বললেই তো ত্যাগ করা যায় না, মন পালটাতে হবে। তার জন্যে একটা অনুষ্ঠান চাই। প্রস্তুতি চাই। বাড়িতে তিনদিন লাগাতার কীর্তন লাগাও আর কাঁচকলার গুলিকবাব, ছানার কালিয়া, দই কলার ফলার খাও। কীর্তনে কুকুরদেরও স্বভাব বদলে যাবে। তারাও ফলার খেতে শিখবে।
মাসিমা টাকা দিয়ে ঝাঁকা মুটেদের বিদায় করলেন। ভাঁড়ারে পর্বতপ্রমাণ জিনিসপত্র। মাসিমা তার মাঝখানে বসে আছেন মাথায় হাত দিয়ে। রোজ দু-বেলা, তিনদিনে ছ’বেলা। এই এতজন। লোককে বেঁধে খাওয়াতে হবে। উনুন থেকে ভাতের হাঁড়ি নামাতে কপিকল লাগবে। একা আনাজ কুটতে হলে একটা দিন চলে যাবে।
মাসিমা আমাকে বললেন, ‘একটা ট্যাক্সি ডেকে দিতে পারিস?
‘কী করবে ট্যাক্সি?
‘আমি চলে যাব। অনেকদিন ধরেই ভাবছি চলে যাবার কথা। আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছেনা
এই পাগলাগারদে থাকা।’
‘কোথায় তুমি যাবে?’
‘আমার বন্ধু বাসন্তীদের বাড়িতে কিছুদিন থাকি, তারপর যা হয় ভাবা যাবে।’
‘তখন আমরা কী করব?’
‘সাপের পাঁচ পা দেখবে। যা প্রাণ চায় তাই করবে। পাগলদের পাগলামি দেখবে। তাদের তালে তাল দেবে। তোমার তো পোয়াবারো।’
বড়মামা তখন মহা উৎসাহে কীর্তনের দলকে বসাবার ব্যবস্থা করছেন। ঘেরা বারান্দায় মোটা গালচে পড়েছে। বড়মামার ডান হাত, মাসিমার কথায় অপকর্মের শাগরেদ মুকুন্দ খুব তড়বড় করছে। মুকুন্দর চেহারাটা ঠিক ডাংগুলির মতো। কালো তেল চুকচুকে চেহারা। মাথায় ভীষণ মোটা কালো কোঁকড়া চুল। মুকুন্দ চপচপে করে সরষের তেল মাখে সারা গায়ে, মাথায়। ওর। ঘরে বড়মামার দেওয়া বড় ওষুধ কোম্পানির একটা আয়না দেয়ালে ঝোলানো আছে। মুকুন্দ চানটান করে সেই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আমি তখন আড়াল থেকে দেখি। বেশ লাগে দেখতে। যেমন চুল তেমন চিরুনি। মোটা, চ্যাপটা বিস্কুটের মতো দেখতে। সাংঘাতিক মোটা। দাঁড়া। বেলঘরের রথের মেলা থেকে কেনা। সাঁওতালি চিরুনি। আয়নার সামনে মহিষাসুরের মতো দাঁড়ায় মুকুন্দ। তারপর সে এক যুদ্ধ। চুলের সঙ্গে চিরুনির লড়াই। তেলজল ছিটকে ছিটকে আয়নার কাচ দেখতে দেখতে ঝাপসা হয়ে যায়। মুকুন্দর চুল আর ঠিক হয় না। মুকুন্দ কখনও। নাচছে। কখনও যোগাসন করছে। চুল আঁচড়ে, সাদা গেঞ্জি আর খাঁকি হাফপ্যান্ট পরে ঘর থেকে যখন বেরিয়ে আসত তখন একেবারে ঘেমে নেয়ে যেত।
মুকুন্দটা মহা চালু ছেলে। যেই দেখেছে বড়মামা হরেকৃষ্ণর দলে ঢুকেছেন, ও নিজেও অমনি। গুনগুন করে গাইছে—প্রেমদাদা নিতাই বলে গৌর হরি হরি বোল।’ কোনও কাজ নেই, কিন্তু এমন করছে, যেন কাজের চোটে কথা বলার সময় নেই। এদিক যাচ্ছে, ওদিক যাচ্ছে। আমাকে দেখে বললে, ‘জয় প্রভু। জয় নিতাই।’
আমি কোনও উত্তর দিলুম না। ভীষণ মিথ্যে কথা বলে আমাকে। কথায় কথায় মিথ্যে কথা। আমাকে বলেছিল, সোদপুর থেকে দশখানা ভালো একতে ঘুড়ি কিনে এনে দেবে। রোজ বিকেলে কিনতে যাচ্ছি বলে বেরোয়, আর রোজই ফিরে আসে শুধু হাতে। এসে এমন সব মিথ্যে কথা। বলে! এক-একদিন এক-একরকম। শেষে একদিন এসে বললে, ‘কুড়িখানা ঘুড়ি কিনে, বগলদাদা করে আসছি, বৃষ্টিতে সব গলে বেরিয়ে গেল।’ আমি তো অবাক। সারাটা দিন গেল রোদঝলমলে, বৃষ্টি আবার কখন হল! মুকুন্দ বললে, ‘শরৎকালের বৃষ্টি ওইরকমই হয়। কখনও এখানে, কখনও ওখানে।’ আমি বললুম, ‘কই, কোথায় তোমার কাঁপকাঠি, বুককাঠি। কাগজ না হয় গলে গেছে, সেগুলো কোথায়?’ বললে, ‘কাঠিকুটি সব ফেলে দিয়েছি।’ তারপর থেকে আমি মুকুন্দর সঙ্গে একদম কথা বলি না। জোচ্চোর। আমি মিথ্যে-কথার নাম রেখেছি মুকুন্দ। আমি সেদিন চোখের সামনে দেখলুম মুকুন্দ বড়মামার সবচেয়ে ফেভারিট কুকুর লাকিকে শুধুমুধু একটা সাইড কিক করল। ও ওরকম আজকাল প্রায়ই করে। ক্যারাটে-কুংফু শিখছে কোনও মস্তানের কাছে। লাকি ক্যাঁক করে উঠল। বড়মামা দোতলার বারান্দায় বসে ডিপ ব্রিদিং। করছিলেন। জিগ্যেস করলেন, ‘কী রে মকা মারলি না কি?’ মুকুন্দকে বড়মামা বলেন মকা।। মুকুন্দ অম্লানবদলে বললে, ‘কই মারিনি তো। ও আপনার বাইরের কোনও কুকুর।’ আমি। বড়মামাকে ফিশফিশ করে বললুম, ‘আমার সামনে মুকুন্দ লাকিকে ক্যারাটে মেরেছে।’ ও বাবা! বড়মামার উলটো চাপ! আমাকে বললেন, ‘প্রমাণ করতে পারবি? সাক্ষী আছে?’ ও মা! আমিই তো সাক্ষী। এই পক্ষপাতিত্ব করে করেই দেশটা গেল।
