সেই বাড়ির নিমন্ত্রণে বড়মামা গেছেন বাজারে বাজার করতে। মিনিমাম সাঁইত্রিশ পদ রান্না তো হবেই। আর সেই বড়মামা বেপাত্তা। মাসিমা বারান্দায় পায়চারি করছিলেন আর বলছিলেন, ‘দু ভাই দুটি অবতার! কাণ্ডজ্ঞান নেই, সময়জ্ঞান নেই। ইরেসপনসিবল।’ আর ঠিক সেই মুহূর্তে। বড়মামার অবির্ভাব। কীরকম আবির্ভাব? না, নিমাই প্রভুর মতো। নদীয়ার পথ ধরে আসছেন কীর্তনে লিড করে।
কীর্তনের দল তারস্বরে গাইছেন, ‘আমি প্রেমের ভিখারি, কে প্রেম বিলায় এই নদীয়ায়?’ আর সে কী খোলবাদ্য? কলাপ-কলাপ করে। আর কীর্তন এমন জিনিস না নেচে পারা যায় না। বড়মামা তো বড় ডাক্তার। চিকিৎসার পদ্ধতিও অদ্ভুত। কারও কোমরে বাত হলে প্রেসক্রিপশান করে হরিসভা। রুগি ওষুধের দোকান থেকে ফিরে আসে।
‘ডাক্তারবাবু প্রথম ওষুধটাই তো নেই? ওর বদলে একটা কিছু…।’
‘ওর তো বদল হয় না ভাই। সকাল-সন্ধে হরিসভায় যাবে আর কীর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দু-হাত তুলে শরীর দুলিয়ে নাচবে। ফর লাইফ। বাকি জীবনটা এইভাবেই কাটাবে। বাতের বাপও তোমার কিছু করতে পারবে না।’
বড়মামার ওই আগমন দেখে, মাসিমা বললেন, ‘সেরেছে। এ দেখি বাজার থেকে কীর্তন কিনে নিয়ে এল? নাও, এইবার বোঝো ঠ্যালা! বাবুর হাতে তো খঞ্জনি। ব্যাগফ্যাগ কিছুই তো নেই।’
‘তাই তো?’ বলেই দেখি, সব শেষে আসছে তিনজন ঝাঁকামুটেওয়ালা, ‘মাসিমা, ওই দ্যাখো।’ সবশেষে বাঁক কাঁধে একজন। তার বাঁকের একদিকে ছানা, আর একদিকে দইয়ের ভাঁড়। কীর্তনের দল বাগানে এসে ঢুকল। সেখানে ঘুরে-ঘুরে নাচ হল। সঙ্গে গান, ‘যে যত চায়, সে তত পায়, আমি প্রেমের ভিখারি কে প্রেম বিলায় এই নদীয়ায়!’
খোল আর খঞ্জনির খচাখই শব্দ, সেই সঙ্গে দশজন পুরুষের সমবেত চিকার। মেজোমামা ভুরু কুঁচকে মারমুখী হয়ে বেরিয়ে এলেন, ‘স্টপ স্টপ। না চেঁচালেও পয়সা যাবে। পয়সা পাবে।’
আমি জানি মেজোমামার কীর্তনে অ্যালার্জি আছে। পাড়ায় অষ্টপ্রহর হলে, মেজোমামা বসিরহাটের বাগানবাড়িতে চলে যান। মেজোমামা বলেন, ‘কীর্তনের কামড়ের চেয়ে মশার কামড় ঢের ভালো।’
মেজোমামার ধমক শুনে বড়মামা বারান্দার সামনে মাথা নীচু করে এসে দাঁড়ালেন। বৈষ্ণবরা যেমন করেন, মাথায় খঞ্জনি রেখে অবিকল সেইরকম গলায় বললেন, ‘জয় নিতাই।’
বড়মামাকে তো সহজে চেনা যাচ্ছে না। বাজার করার নরম সাদা থলিটাকে ভাঁজ ভাঁজ, পাট পাট করে টুপির মতো মাথায় পরেছেন। ঠিক মনে হচ্ছে ব্রহ্মচারী।
২.
মাসিমা রেগে গেলে র্যান্ডম ইংরেজি বলেন। কীর্তনিয়াদের দল থেকে বড়মামাকে আড়ালে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘হোয়াট ইজ দিস? আই ওয়ান্ট টু নো হোয়াট ইজ দিস?’
বড়মামা মাসিমাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। প্রায় জোড়হাত করে। কীর্তনিয়ার দল খ্যাংখ্যাং করে খঞ্জনিতে বিকট শব্দ তুলে নীরব হলেন। মনে হল, এইমাত্র পৃথিবীর সবাই যেন একসঙ্গে মরে গেল। মেজোমামা বললেন, ‘আঃ, কী শান্তি! সত্যিই কী শান্তি! বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক, এমনকী নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে।’
কীর্তনদলের হেড বললেন, ‘স্বরূপ দেখে মনে হচ্ছে আপনি এই বাড়ির মেজোকর্তা।
ঠিক বটে? মেজোমামা বললেন, ‘ঠিক বটে।’
‘আ, বড়কর্তা বলছিলেন আপনি বিধর্মী। আপনার মনের পরিবর্তন করতে হবে। মাছ, মাংস আর ডিম্ব—এই তিন ম্লেচ্ছ সংসর্গ থেকে উদ্ধার করতে হবে। তা করে দেব। কী আছে! প্রভুর কৃপায় সবই সম্ভব। চব্বিশ ঘণ্টা এই নাম শুনলে মিলিটারি সায়েবও রসকলি ধারণ করে ঘোর বৈষ্ণব হয়ে যাবে। নামের এমন মাহাত্ম।’
কথা শেষ করে তিনি ইশারা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে খচাখাঁই, খচাখই খোল করতাল বেজে উঠল। আর সবাই নাচতে লাগলেন, ‘প্রেমদাতা নিতাই বলে, বোল হরি হরি বোল। প্রেমদাতা নিতাই বলে।’ মেজোমামাও নাচছেন, তবে অন্য তালে। গানও গাইছেন, তবে অন্য গান। ‘চুপ চুপ। একদম চুপ। চুপ চুপ, একদম চুপ।’
কে কার কথা শোনে। যাঁরা কীর্তন করছেন, তাঁদের কানে কিছুই ঢুকছেনা। ঢাকার উপায়ও নেই। ইতিমধ্যে বড়মামার আটজাতের আটটা কুকুর বেরিয়ে এসেছে। কুকুররা দেখছি কীর্তন একেবারে সহ্য করতে পারে না। তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করছে। শ্যামাসংগীত শুনলে এইরকম করে না কিন্তু। ঘাড় বাঁকিয়ে কান খাড়া করে সমঝদার শ্রোতার মতো বেশ শোনে।।
মেজোমামাকেও থামানো যাচ্ছে না। তিনি চুপ চুপ করতে করতে শেষমেশ ‘চোপ চোপ’ বলতে শুরু করেছেন। অবশেষে চিৎকার, ‘পোলিশ পোলিশ।’ মেজোমামা রেগে গেটের দিকে এগোতে এগোতে বললেন, ‘আমি থানায় চললাম। কোনও ভদ্রলোকের পক্ষে এই অত্যাচার সহ্য করা শক্ত। আমি একটা ডায়েরি করে আসি।’ কিন্তু গেট পর্যন্ত যেতে পারলেন না। কীর্তনিয়ারা ঘিরে ধরল। মূল গায়েন মেজোমামার ডান হাত ধরে ওপর দিকে তুলে নিজেও নাচছেন, আর মেজোমামাকে নাচাচ্ছেন। সমানে গেয়ে চলেছেন, ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।’
মাসিমার সঙ্গে কথা শেষ করে, বড়মামা বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ভাব এসে গেছে। থেকে থেকে বলছেন, ‘হরি বোল। হরি হরি বোল। হরি বোল।’ এদিকে মেজোমামা নাচের চোটে গলগল করে ঘামছেন। মেজোমামা একটু সুখী মানুষ। বেশি পরিশ্রম তাঁর সহ্য হয় না। ছোট। একটা কুঁড়ি আছে। পাঞ্জাবির তলায় সেইটাই বেশি নাচছে। থলথল, ধলধল করে। মেজোমামা একসময় থ্যাস করে পড়ে গেলেন। বড়মামা চিৎকার করে উঠলেন, ‘সমাধি, সমাধি হয়েছে, সমাধি। আমাদের বংশে এই প্রথম। ফাস্ট টাইম ইন আওয়ার ফ্যামিলি।’
