এই গল্পের আসরেই বড়মামা সেই ঠাকুরঘর ভেঙে নারায়ণ বুকে নিয়ে দোতলার ঘরে খাটের ওপর পড়ে যাবার গল্পটা যে কতবার বলেছেন আমাদের। বলে-বলেও পুরোনো হয়নি। যত শুনি। ততই ভালো লাগে। মেজোমামা বলেন, ‘গাছে যেমন রোজ রোজ নতুন পাতা বেরোয়, বড়মামার গল্পের গাছেও সেইরকম রোজই নতুন নতুন গল্পের পাতা বেরোয়। এইটাই ইন্টারেস্টিং। সাতদিন আগে যা শুনেছি সাতদিন পরে তাইতে নতুন ফ্যাকড়া। ভদ্রলোক ডাক্তারি না করে কলম ধরলেও নাম করতে পারত।’
মাঝরাতে কড়াং করে শব্দ। বড়মামা ভেবেছিলেন, তিরের ফলায় চিঠি ফুড়ে ডাকাতরা ঘরে ছুড়েছে। ঘুমের ঘোর কেটে যাবার পর মনে হল ধুস, রঘুডাকাত, বিশুডাকাতের যুগ কবে শেষ হয়ে গেছে। আর এই বাড়িতে ডাকাতি করার আছেটা কী। ভাঙা ইট, বালি, চুন, সুরকি! দেশলাই জ্বেলে মাথার কাছে রাখা কুপিটা জ্বাললেন। লোহার ডান্ডাটা হাতে নিলেন। বলা যায় না, সাপখোপ হতে পারে। কুপিটা তুলে ধরলেন খাটের দিকে। অবাক কাণ্ড! নারায়ণ ঠাকুরের পায়ের দিকের একটা অংশ খুলে পড়ে গেছে। আর সেই ফুটো গলে একগাদা গোল গোল সোনার চাকতির মতো কী বেরিয়ে এসে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আছে। সব মোহর। সেই রাজার আমলের চাঁদির চাকতি। পরের দিন সকালে বড়মামার সায়েব জ্যাঠামশাই এসে বললেন, ‘ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে। আত্মহত্যার ঝিল বিক্রি হল না ভেবে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। আর আমাদের পায় কে? আমার প্ল্যান রেডি, বোলাও মিস্ত্রি।’
বড়মামার জ্যাঠামশাই বাড়িটার কিছুঝরিয়ে, কিছু গড়িয়ে এমন একটা ব্যাপার করে দিলেন, দেখে সকলের তাক লেগে গেল। বাড়ি উঠল। বড়মামা উঠলেন। জ্যাঠামশাই বড়মামাকে। ডাক্তার করে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বেরিয়ে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। এই বাড়িতে বসার ঘরে বড়মামার জ্যাঠামশাইয়ের বিশাল একটা তৈলচিত্র আছে। একেবারে পাক্কা সায়েব। মুখে। পাইপ। পায়ের কাছে বাঘের মতো বিশাল একটা কুকুর। বড়মামা জ্যাঠামশাইকে ভীষণ শ্রদ্ধা করেন। তেমনি ভালোবাসেন। গভীর রাতে শুতে যাবার আগে ছবিটার সামনে বেশ কিছুক্ষণ। দাঁড়িয়ে থাকেন স্থির হয়ে। তারপর মিলিটারি কায়দায় স্যালুট করে শুতে চলে যান। আমি আর বড়মামা একই ঘরে শুই। শুয়ে শুয়ে বড়মামা বলতে থাকেন, ‘গাড়ি যেমন পেট্রোলে চলে, মানুষ তেমনি চলে আশীর্বাদে। পূর্বপুরুষেরা আশীর্বাদ না করলে জীবনকে চালাতে হয় ঠেলে ঠেলে।’
আমি জিগ্যেস করলাম, ‘আমার পূর্বপুরুষ আছে বড়মামা?’
‘পূর্বপুরুষ ছাড়া মানুষ হয় বোকা! তোর পূর্বপুরুষ হলাম আমি। জলজ্যান্ত তোর পাশে খাটে শুয়ে আছি। তোর আরও পূর্বপুরুষ আছে তবে একেবারে সাক্ষাৎ পূর্বপুরুষ হলুম আমি। আমাকে ভক্তিশ্রদ্ধা করবি। আমি চলে যাবার পর আমার ছবিতে মালা দিবি।’
‘আর আমাদের সর্বপ্রথম পূর্বপুরুষ হল বাঁদর। তাই তো?’
‘সেটা তোর হতে পারে, আমার নয়। আমি স্ট্রেট একেবারে ভগবানের কাছ থেকে আসছি। আমার স্বভাব-চরিত্র দেখে তাই মনে হয় না কি? আমার কীরকম একটা ভাব আছে, তাই না? তুই বুঝতে পারিস না?’
‘পারি তেতা। একেবারে খামখেয়ালি।’
‘তাই তো! ভগবান নিজেই তো খামখেয়ালি। কখন কী যে করে বসেন!’
বড়মামা বাজার থেকে ফিরে এলেন প্রায় ঘণ্টাদুয়েক পরে। সে এক কাণ্ড! বড়মামা আসছেন আগে-আগে, পেছন-পেছন আসছে কীর্তনিয়ার দল। তা প্রায় সাত-আটজন হবে। আমরা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। বারান্দায় দাঁড়াবার কারণ ছিল। এত দেরি হচ্ছে দেখে আমি আর মাসিমা চটি পায়ে দিয়ে রেডি হয়েছিলুম খুঁজতে বেরোবার জন্যে। মাসিমার আবার। প্রেশারটা মাঝে মাঝে চড়ে যায়। বড়মামা আর মেজোমামাই হাই প্রেশারের কারণ। মাসিমা একেবারে রেগে ফায়ার হয়েছিলেন। নিমন্ত্রিত একজন খাবেন। এ বাড়িতে কাউকে খাওয়াতে হলে তাকে একেবারে খাইয়ে শেষ করে দেওয়া হয়। খেতে খেতে তিনি একসময় কেঁদে ফেলেন। হাতজোড় করে বলতে থাকেন, ‘বিশ্বাস করুন, আমি আর পারছিনা। আমার পেটে আর জায়গা নেই। আমি পেট ফেটে মরে যাব।’
বড়মামা অমনি বললেন, ‘ছি-ছি, কী অবৈজ্ঞানিক কথা। পেট আর বেলুন এক জিনিস। যত ফোলাবেন তত ফুলবে। পেট এমন এক বেলুন, যা ফাটে না। পেটটা একটু টাইট হবে। এই আর কি। আমার পিতামহ যখন আহারাদি শেষ করে উঠতেন, পরিমাণ মতো খাওয়া হল কি না। পরীক্ষা করার জন্যে একটি পদ্ধতি ছিল। পিতামহ যে খাটে শুতেন, সেই খাট আর মাথার দিকের দেয়ালের মাঝে চারফুটের মতো একটা ফাঁক ছিল। আহারের পর সেই ফাঁক দিয়ে সহজে অনায়াসে গলে যেতে পারলে পরিমাণ ঠিক হয়নি। আর ভুঁড়ি আটকে গেলে পরিমাণ ঠিক হয়েছে। নিন, নিন, আর তো মাত্র তিন-চারটে আইটেম বাকি আছে। কৌটো ঝাঁকানোর মতো শরীরটা ঝাঁকিয়ে নিন।’ বড়মামা একদিন আমাকে একটা গল্প বলেছিলেন, রোম যখন সভ্যতার একেবারে তুঙ্গে, সেই সময় রোমান রাজপুরুষদের খাওয়ার গল্প। বিশাল টেবিলে সব খেতে বসেছেন। প্রত্যেকের পায়ের কাছে একটা করে ঢাকা পাত্র। ক্রীতদাসরা পরিবেশন করছে। একের পর এক আইটেম আসছে। আসছে তো আসছেই। আর সে তোমার গিয়ে আমাদের মতো ভাত, ডাল, আলুভাতে নয়। মাছ, মাংস, দুম্বা, সুপ, সস, গরু, ভেড়া, ছাগল, শূকর। ধপাধপ টেবিলে এসে পড়ছে। রোমান রাজপুরুষরা খেতে খেতে কাত হয়ে পড়ছেন। আর ঢাকাঁপাত্রের রহস্যটা হল, পেটে চাপ পড়ার ফলে অনেকেরই বেগ এসে যাচ্ছে। তাঁরা পেট খালি করে আবার খাওয়া শুরু করছেন। কী অসভ্য কাণ্ড!
