বড়মামার তখন টর্চলাইট ছিল না। সাইকেল, মোটর কিছুই ছিল না। বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। মাথার কাছে একটা দেশলাই, একটা কুপি, একটা হাতপাখা, একটা ঝাঁটা, আর-একটা লোহার রড নিয়ে শুতেন। কুপি জিনিসটা ভারী মজার। আমাকে একটা বড় মুখওয়ালা শিশি দিলে এখনই করে দেখাতে পারি। কালির দোয়াতে খুব সুন্দর হয়। ঢাকনায় একটা ফুটো করব। একটা সলতে পাকিয়ে চালিয়ে দেব তার মধ্যে দিয়ে। ভেতরে থাকবে কেরোসিন। হয়ে গেল কুপি। বড়মামা ছেলেবেলার সেই কুপিটা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছেন। মাঝে-মাঝে সেটাকে বের করে বলতে থাকেন, ‘মন ভুলে যেয়ো না, একসময় তোমার জীবনের আলো ছিল এই কুপি। আজ তোমার ফ্যান, ফোন, ফ্রিজ হয়েছে বলে মেজোর মতো অহংকারে মটমট কোরো না।’ সব উপদেশেই বড়মামা মেজোমামাকে টেনে আনবেন উদাহরণ হিসাবে। মাসিমা বলেন, ‘একেই বলে পায়ের ওপর পা দিয়ে ঝগড়া করা।’ বড়মামা ঝাঁটাটা রাখতেন ভূতের ভয়ে আর লোহার ডান্ডাটা রাখতেন সাপের ভয়ে। এখন রাতে খাওয়াদাওয়ার পর আমাদের যে গল্পের আসর।
বসে, সেই আসরে অতীত দিনের গল্প বলতে বলতে বড়মামা একটা কথা প্রায়ই বলেন, ‘অর্থের চেয়ে অনর্থ আর দুটো নেই। তখন আমার বাড়ির দরজা ছিল না, জানলা ছিল না, মাথার ওপর আধ-ভাঙা ছাদ, সিন্দুক নেই, স্টিল আলমারি নেই। কিছুই নেই। চোরডাকাতের ভয় নেই। মনের আনন্দে ঘুম। চারপাশ দিয়ে হুহু করে বাতাস ঢুকছে। বাতাস আবার দেয়ালের ফুটোর মধ্যে দিয়ে আসার সময় বাঁশি বাজাত। এক-এক ফুটোর মধ্যে দিয়ে আসার সময় এক-এক সুর। সা রে-গা-মা। চিত হয়ে শুয়ে আছি, ভাঙা ছাদে আটকে আছে আকাশের তালি। জ্বলজ্বলে তারা তাকিয়ে আছে আমার দিকে। শুক্লপক্ষে রাত বারোটার সময় মেঘের রুমাল ওড়াতে ওড়াতে। আমাকে দেখতে আসত চাঁদ—হ্যালো, বিমল। আর আজ আমাদের কী অবস্থা! চোরের মতো। চারপাশেদশফুট উঁচু জেলখানার পাঁচিল। তার ওপর লোহার আল। বাড়িতে সাত-সাতটা কোলাপসিবল গেট। মাঝরাতে খুট করে কোথাও একটা শব্দ হলেই মেজো অমনি হেঁড়ে গলায় চিক্কার জুড়ে দেয়, ‘কে, কে, কৌন হ্যায়?’ এমন গর্দভ। ওর ধারণা চোর আর ডাকাতরা হিন্দি ছাড়া আর কোনও ভাষা বোঝে না। আরে ঘরে খিল এঁটে, ‘কৌন কৌন’ না করে বেরিয়ে আয়। বেরিয়ে এসে দ্যাখ। ভীতু কোথাকার! আসলে তা নয়। বুঝলি তো কুসি, মানুষ যত বড়লোক হতে থাকে ততই তার ভয় বেড়ে যায়। জীবনের ভয়, ধনসম্পত্তি হারাবার ভয়। অসুখের ভয়। অ্যাকসিডেন্টের ভয়।’
বড়মামার এই কথায় কিছুক্ষণের জন্যে বড়মামার ছেলেবেলার গল্প ভন্ডুল হয়ে যেত। মেজোমামা বসেন একটা দোল-দোল চেয়ারে। সামনে-পেছনে হালকা চালে দুলতে দুলতে গল্প শোনেন। পরনে সাদা ঢোলা পাজামা, পাঞ্জাবি। কোলের ওপর কালো ফ্রেমের চশমা। মেজোমামার দোল-দোল থেমে গেল। প্রতিবাদ করে উঠলেন, ‘কতবার তোমাকে বলেছি বড়দা, আমি এখন বিশাল বড় হয়ে গেছি। আমাকে গর্দভ বোলো না। আমার মানসম্মানে ভীষণ লাগে। ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা আমাকে স্যার বলে।’
বড়মামা অমনি তাঁর হাঃ হাঃ হাসি দিয়ে মেজোমামাকে ঠান্ডা করে দেন, ‘আরে গাধা, এ-গর্দভ তোর ধোপার গাধা, বোকা গাধা নয়। এ হল আমাদের ফ্যামিলির আদরের গাধা।’
এরপরই আমার বড়মামার সেই এক কথা, ‘বল তো কুসি, কী করে আবার সেই পুরোনো দিনে ফিরে যাওয়া যায়!’
মাসিমা অমনি বলবেন, ‘আর তো সম্ভব হবে না বড়দা। তোমরা এখন পয়সার স্বাদ পেয়ে গেছ। মানুষখেকো বাঘ কি আর আলোচাল-খেকো হতে পারে?
বড়মামা দুঃখ-দুঃখ মুখে বলবেন, ‘কী করে যে আবার গরিব হওয়া যায় কুসি?’
মেজোমামা অমনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবেন, ‘কতদিন যে আমার খিদে পায়নি? সেই গরিবের খিদে! কী খাই, কী খাই করে সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মুড়ির টিনে মুড়ি নেই। ভাতের হাঁড়িতে ভাত নেই। কোথাও এক টুকরো শুকনো রুটি নেই। ক্ষুধার্ত বেড়ালের মতো এ-ঘরে, ও ঘরে, সে-ঘরে। পেয়ারা গাছের ফুলকচি পেয়ারা ফাঁক। বাসনমাজার তেঁতুল, তাই, তা-ই সই। পাকা তেলাকুচো। সে কী খিদে! এখন খিদের আগেই খাবার, তার ওপর খাবার, খাবারের ওপর খাবার। আর পারছি না কুসি। কুসি তাও দিয়ে যাচ্ছে।’
মেজোমামা প্রায় কেঁদে ফেলেন আর কী। বড়মামা অমনি বলবেন, ‘দুঃখ করিসনি মেজো। কী আর করবি বল, যার যেমন বরাত ভাই। এই তো দ্যাখনা, আমি কতদিন ভেলিগুড়ের গোঁদো। চ্যাটচ্যাটে মুড়কি খেতে পাইনি। ছোলার পাটালি খাইনি। ছাতু খাইনি। ঠান্ডা ফুলুরি খেয়ে অম্বলে গেলাসের পর গেলাস জল খাইনি। অম্বল হলে জল খেতে কী ফ্যান্টা লাগে জানিস? কী করবি ভাই? সকালে তোকে চা খেতে হবেই। চা খালি পেটে খাওয়া যায় না। কুসি অ্যালাউ করবে না। দুটো পাউডার পাফ বিস্কুট তোকে খেতেই হবে।’
মেজোমামা সংশোধন করে দিলেন, ‘পাউডার পাফ নয়, লেমন পাফ।’
‘ওই হল। তারপর ব্রেকফাস্ট তো ভাই জল খেয়ে হয় না। যার যা নিয়ম! দুটো ডিম, হয় পোচ, না হয় ওমলেট, দু-পিস টোস্ট। একটা কলা। কর্নফ্লেকস। থাকবেই থাকবে। কান্ট হেল্প। যে পুজোর যা উপচার। শুধু ব্রেকফাস্ট খেয়ে পৃথিবীর কেউ বাঁচতে পারে না। তা হলে লাঞ্চ শব্দটা এল কোথা থেকে? লাঞ্চে তোমার টেবিল-রাইস, মাছ-মাংস, ভেজিটেবল। ডেসার্ট থাকবেই। কান্ট হেলপ। বিকেলে তোমাকে চা নিতেই হবে। সামান্য স্ন্যাকস। রাতে ডিনার। বলো, এর হাত থেকে বাঁচার কোনও পথ আছে? কে তোমাকে বাঁচাবে ভাই?’
