সেই রাতে বড়মামা মেঝেতে শুয়ে শুয়ে গেঁটে বাতের বক্তৃতা মকশো করছিলেন। গেঁটেবাতে মানুষের সব শেষে কী অবস্থা হতে পারে। বাঁশের মতো গাঁট গাঁট শরীর। প্রত্যেকটা গাঁট জানান দেবে, আমি তোমার গাঁট। সব আঁট হয়ে এমন হয়ে যাবে তখন আর নড়তে-চড়তে হবে না। শোয়াও যাবে না, বসাও যাবে না, দাঁড়ানোও যাবে না। তখন যে কী হবে, যার হবে, সেই বুঝবে। পিতার নাম কাগজে লিখে পকেটে ফেলে না রাখলে মনেই থাকবে না। বড়মামা এখনও যেমন, তখনও তেমনই ছিলেন। ভয় দেখাবার একখানি। শুয়ে শুয়ে এক বাজার লোককে গেঁটে বাতের ভয়ে যখন প্রায় অবশ করে ফেলেছেন, তখন খাটের ওপর কড়াং করে একটা আওয়াজ হল।
এইবার বড়মামার ভয় পাবার পালা। খাটের ওপর বসে আছে নায়ায়ণ। তাঁর বেদির ওপর। আওয়াজটা খাটের ওপরেই হল। তখন তো ইলেকট্রিক ছিল না। বড়মামা উঠে বাতি জ্বালালেন। ভেবেছিলেন, তিরের ফলায় চিঠি গেঁথে ডাকাতরা হয়তো ছুড়েছে। ‘সাবধান! কাল তোমাদের। বাড়িতে ডাকাতি হবে। বিনীত বিশু।’ দাদুর আমলে এইরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। ডাকাতরা ঠিক সময় এসেওছিল। সেই সময় ডাকাত আর বরযাত্রীদের সমান খাতির করতেন জমিদাররা। হালুইকররা এসে ভালোমন্দ খাবার তৈরি করত। কচুরি, রাধাবল্লভী, জিলিপি, কচি ভেড়ার কাবাব। শরবত, মঘাইপান। যেসব জমিদারের অনেক পয়সা, তাঁরা আবার বেনারস থেকে ওস্তাদ আনিয়ে কালোয়াতি গানের ব্যবস্থা করতেন। একদিকে ওস্তাদ আ-আ করছেন, আর একদিকে ডাকাতরা হাহা করছে। নায়েব-গোমস্তারা পরিবেশন করছেন ছুটে-ছুটে। জমিদারমশাই জরির লপেটা, কাঁচি ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি পরে ঘোরাফেরা করছেন। তদবির তদারকি করছেন। মেয়েরা সব গায়ে গয়না চাপিয়ে, মুখে জর্দাপান ঠুসে বসে আছেন চিকের। আড়ালে। সিঁড়ির মুখে হাতে দোনলা বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জমিদারের বড় ছেলে ব্রিচেস পরে। খাওয়া শেষ হবার পর, জমিদারমশাই জনে-জনে জিগ্যেস করছেন, ‘খাওয়া পরিভূত প্রমাণে হল ত? সন্তুষ্ট তো?’ ডাকাতদের মুখে কালো তেল রং। চারদিকে ঝাড়লণ্ঠন জ্বললেও, মশাল ছাড়া ডাকাতি হয় না। তাই মশাল জ্বলছে এদিকে-ওদিকে। ডাকাতরা যখন বলছে, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, যথেষ্ট খেয়েছি। এখন একটা চারপাই পেলেই গড়িয়ে পড়ি। কিন্তু আমাদের কর্তব্য বাকি আছে।’ তখন তাদের মূলোর মতো সাদা-সাদা দাঁতের সারি ফ্যাক-ফ্যাক করে উঠছে। এইসময় হেড ডাকাত জিগির তুললেন, ‘হা রে, রেরে’। তারপর জমিদার মশাইয়ের গালে ঠুস করে এক চড় মারবে। সেইটাই ছিল নিয়ম। সঙ্গে সঙ্গে কুমারবাহাদুর আকাশের দিকে বন্দুক তুলে ব্লাম ব্লাম করে দুবার ফায়ার করবেন। আর শুরু হয়ে যাবে মহা শোরগোল, দাপাদাপি। উঠোনে ডাকাতরা শুরু করবে ডাকাতে নৃত্য। কনসার্ট বাজতে থাকবে। মেয়েরা শাঁখে ফুঁ দেবে। ঘুমন্ত বাচ্চাদের টেনে তোলা হবে প্যাঁ-প্যাঁ করে কাঁদার জন্যে। তারপর এক সময় মশালচিরা একে-একে সব বাড়ির আলো নিবিয়ে দেবে। শুধু জ্বলতে থাকবে মশাল। আরও কিছুক্ষণ তাণ্ডব চলার পর ডাকাতরা দেখতে পাবে জমিদারমশাইয়ের রাখা পুঁটলিটা। যেই একটা বাঁশি বাজবে অমনি ডাকাতরা পুঁটলিটা তুলে নেবে, আর ‘হে রে রেরে’ করে বেরিয়ে আসবে জমিদারের লেঠেলরা। ঠকাস ঠকাস করে তারা লাঠিতে লাঠি ঠুকতে থাকবে। উঠোন জুড়ে শুরু হয়ে যাবে। তাদের লাঠি-নৃত্য। কুমারবাহাদুর এই সময় আবার দুবার ফায়ার করবেন। ডাকাতরা তখন মাঠ ময়দান ভেঙে ছুটতে শুরু করবে। হেড-ডাকাতের পায়ে রনপা। সে তখন অনেক দূরে; যেন একটা তালগাছ ফাঁকা মাঠের ওপর দিয়ে তিরবেগে ছুটছে। লেঠেলরা নানারকম চিৎকার করতে করতে তাদের পেছন পেছন কিছুদূর ছুটে মাঠে বসে পড়বে, দু-দশটা বিড়ি খাবে। লাঠিতে আচ্ছা করে তেল মাখাবে। নিজেদের গোঁফে মাখাবে মৌচাকের মোম। তারপর ‘জয় মা কালী পাঁঠা বলি,’ ‘জয় মা কালী পাঁঠা বলি,’ বলতে বলতে ফিরে আসবে দেউড়িতে। রটে যাবে—অমুক জমিদারের বাড়িতে মস্ত এক ডাকাতি হয়ে গেছে। জমিদারের সম্মান বেড়ে যাবে। পরের দিন প্রজারা এসে পায়ের ধুলো নেবে। বাচ্চারা ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাবে আর ঝড়লণ্ঠনের ভাঙা কাচ তুলে কোঁচড়ে ভরবে। যে যেমন পারবে জমিদারবাবুর পায়ের কাছে টাকার তোড়া। রাখবে। রাখবে লাউ, কুমড়ো, মোচা, কাঁচকলা, বড়-বড় রুইমাছ। জমিদারবাবু মিছিমিছি হাতে একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে হাতটা ঝুলিয়ে রাখবেন গলা থেকে বুকের কাছে। দিকে-দিকে রটে যাবে, জমিদারবাবু একা লড়াই করে সাতটা ডাকাত ঘায়েল করেছেন। তাদের লাশ পায়ে পাথর বেঁধে ফেলে দেওয়া হয়েছে আত্মহত্যার ঝিলে। প্রজারা চলে যাবার পর আসবেন ভবতারিণী মন্দিরের পুরোহিত। জমিদারবাবুর কপালে লেবড়ে দেবেন মায়ের পায়ের সিঁদুর। যাবার সময় তাঁর পেছন পেছন চলবে দড়িতে বাঁধা সাতটা নধর পাঁঠা। আগে আগে চলেছেন পুরোহিতমশাই, হাতে। একটা পাতাসমেত বটের ডাল নাচাতে-নাচাতে। পেছনে নাচতে-নাচতে চলেছে সাতটা পাঁঠা— ব্যা-ব্যাকরে কালোয়াতি গান গাইতে গাইতে। একটু পরেই শুরু হবে বলি। জমিদারের কল্যাণে। ওঁ ক্রীং, খ্রীং হ্রীং, ঘ্যাচাং। পুরোহিতমশাই নিজের জন্যে কিছুটা রেখে বাকি ঝুড়িটা পাঠিয়ে দেবেন জমিদারমশাইয়ের রান্নাঘরে। দুপুর থেকেই আসতে থাকবেন প্রতিবেশী। জমিদাররা বীরত্বের খবর নিতে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে বসে যাবে খানাপিনার আসর। পশ্চিমি ওস্তাদ গান ধরবেন আর পীড়নবাঈ নাচতে থাকবে ধিতিং ধাতাং ধিতিং।
