বড়মামার জ্যাঠামশাই ঝিলটাকে বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। বিক্রির টাকায় ভেবেছিলেন বাড়িটাকে সারিয়ে দেবেন। না সারালে, ক্লাইভের আমলের তিনতলা প্রাসাদ একদিন পুরোটাই ভেঙে পড়ে যাবে। ঝিলটা কেউ কিনতেই চাইল না। ভয়ে! তা ছাড়া ঝিল কিনে করবেটা কী। মাছের চাষ! পাগল! ঝিলে প্রচুর মাছ এমনিই আছে। সেসব মাছ হল দেবীর মাছ। আমার মায়ের কাছে গল্প শুনেছি, ওইসব মাছের নাম ছিল। তীরে দাঁড়িয়ে নাম ধরে ডাকলে, মাছ ছুটে আসত। ‘মোহন এসো, এসো।’ জলে অমনি ঝাঁঝাঁ শব্দ। মোহন খপাং করে পায়ের কাছে মুখ তুলল। তার নাকে অমনি একটা সোনার নোলক পরিয়ে দেওয়া হল।
ঝিল যখন বিক্রি হল না, তখন ভয় তাড়াবার জন্যে সায়েব-মানুষ বড়মামার জ্যাঠামশাই খুব। ঢাকঢোল পিটিয়ে সকলকে জানান দিয়ে মাছ ধরতে বসলেন। যত সব কুসংস্কার। গ্রামবাসী। তোমরা দেখে যাও, আমি মাছ ধরব। সেই মাছ কেটে ফ্রাই করে মাস্টার্ড দিয়ে খাব, তোমাদের খাওয়াব।
মাথায় সোলার টুপি। সাদা হাফ প্যান্ট, সাদা স্পোর্টস গেঞ্জি। বড়মামার জ্যাঠামশাই মাছ ধরতে বসেছেন। বিলিতি ছিপ। বিলিতি হুইল। বিলিতি সুতো। আড়ালে-আবডালে মানুষের ভিড়। ভীষণ উৎকণ্ঠা। অবিশ্বাসী মানুষটির কী হয় কে জানে! মাছ শুধু ধরা নয়। ভেজে খাওয়া। কালীদা ছিলেন পাশে। চার, টোপ এইসব ঠিকঠাক করে দিচ্ছেন। বিশাল ফ্লাস্কে চা। বড়মামার। জ্যাঠামশাই বিলেত থেকে ব্রেড বক্স এনেছিলেন। তাইতে একশোটা স্যান্ডউইচ। বড়মামার জ্যাঠামশাই ছিপ ফেলতে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই কে যেন ‘ওহাহা’ করে হেসে উঠল। ‘কে হাসে?’ বড়মামার জ্যাঠামশাই ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেন। বড়-বড় চোখে তাকালেন চারদিকে।
কালীদা বুঝিয়ে দিলেন ব্যাপারটা। ‘মানুষে হাসেনি সাব। হেসেছে পাখি। এই পাখির নাম-উকো পাখি।’
‘আই সি।’ জ্যাঠামশাই সন্তুষ্ট হলেন। ‘ইফ ইট ইজ এ পাখি, আই হ্যাভ নাথিং টু সে।’
বড়মামার জ্যাঠামশাই বাংলাটা তেমন বলতে পারতেন না। বাংলায় চলতে-চলতে হঠাৎ-হঠাৎ ইংরেজিতে হোঁচট খেতেন। ভাত, ডাল দেখলে চোখ ফেটে জল আসত। ফিশ অ্যান্ড চিপস, ক্লাব স্যান্ডউইচ, ফিশফ্রাই, কাটলেট—এই সবই ছিল তাঁর খাদ্য। যাই হোক, বড়মামার জ্যাঠামশাই মাথার ওপর ছিপটাকে কায়দা করে ঘুরিয়ে জলে সুতো ফেললেন। এবার সেই উকো পাখিটা। খকখক করে কেসে উঠল। বড়মামার জ্যাঠামশাই পাখিটাকে ঠিক সহ্য করতে পারছিলেন না। কিন্তু কী করবেন। শুধু বলে উঠলেন, ‘মোস্ট ডিস্টার্কিং।’
পাঁচটা মিনিট অপেক্ষা করতে হল না। মাছ গেথে গেল। কাঁইকাঁই শব্দ করে ভীষণ বেগে হুইল ঘুরতে লাগল। বড়মামার জ্যাঠামশাইয়ের চিৎকার, ‘ক্যাচ, ক্যাচ।’ সারা ঝিল একেবারে। তোলপাড়। এ তো মাছ নয়, যেন বাছুর গেঁথেছে ছিপে। সাবমেরিনের মতো খেলে বেড়াচ্ছে। জলের তলায়। মাঝে মাঝে ডিগবাজি খাচ্ছে, তখন মাছের লেজটা জেগে উঠছে জলের ওপর। যেন উড়োজাহাজের লেজ। সবাই বলতে লাগল, বাঘা-ভালকোর লড়াই। হুইলের সব সুতো। শেষ। তখন বড়মামার জ্যাঠামশাই মাছটাকে গুটিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় আনার চেষ্টা করতে লাগলেন। মাছ ধরার নাকি সেইটাই নিয়ম। কিছুটা টানার পরেই মাছ লাগাল টান। বড়মামার জ্যাঠামশাই ছিপসমেত সড়াক করে চলে গেলেন জলে। ছিপটা ছেড়ে দিলেই পারতেন। বড়মামার জ্যাঠামশাই বড়মামার চেয়েও একগুঁয়ে, একরোখা মানুষ ছিলেন। কথায়-কথায় বলতেন, ‘সারেন্ডার নট।’ মানে আত্মসমর্পণ কোরো না। একটু আগে তিনি মাছকে খেলাচ্ছিলেন, একটু পরে মাছই তাঁকে খেলাতে লাগল। হঠাৎ একসময় বড়মামার জ্যাঠামশাই তলিয়ে গেলেন জলের অতলে। ঝিলের মাঝখানে ফাতনার মতো ভাসতে লাগল তাঁর সোলার টুপি। জলে ভেসে উঠল কিছু বুড়বুড়ি। সবাই বলতে লাগল, ‘উদ্ধার করো, উদ্ধার করো।’ কে উদ্ধার করবে! কার সাহস আছে জলে নামার? তখন সকলে সমবেত কণ্ঠে গাইতে লাগল, ‘ভবসাগর তারণ কারণ হে, গুরুদেব দয়া করো দীনজনে।’
হঠাৎ একসময় অনেকটা দূরে বড়মামার জ্যাঠামশাই ভুস করে ভেসে উঠলেন। হাতে ছিপও নেই, মাছও নেই। সাঁতার কেটে তীরে এসে একটা কথাই বললেন, ‘ডেনজারাস, ভেরি ভেরি ডেনজারাস।’ ভয়ে ভয়ে তাকাতে লাগলেন ঝিলের দিকে। গেঞ্জি ফালাফালা। মাছটা শরীরের এখানে-ওখানে আঁচড়ে দিয়েছে। একটু সামলে উঠে বললেন, ‘যা দেখে এলুম তলায়! মাথা ঘুরে গেছে আমার।’
‘কী দেখলেন? কী দেখলেন?’
বড়মামার জ্যাঠামশাই বলেছিলেন, ‘আর একবার না দেখলে আমি বলতে পারব না। অবিশ্বাস্য সব ব্যাপার হয়ে আছে।’
ঝিল বিক্রি হবে না—এই সিদ্ধান্তই হল। বড়মামার বাড়ি তা হলে মেরামত হল কী করে? সেইটাই তো মজা। সেইজন্যেই তো বড়মামার এত হাঁকডাক। এত খাতির। সবাই বড়মামাকে এত ভালোবাসেন। সেই ছেলেবেলায় বড়মামার বাবা মানে আমার দাদু স্বদেশী করতে গিয়ে পেঁচো দারোগার গুলি খেয়ে ক্যান্টনমেন্টের কাছে মারা গেছেন। দিদিমা মারা গেছেন ম্যালেরিয়ায়। কী মশা! কী মশা! সূর্য ডোবার পর মুখের ওপর চায়ের ছাঁকনি ধরে কথা না বললে, মুখে মশা ঢুকে চলে যেত টাগরায়। তখন কাশি আর কাশি। বড়মামার তখন কেউ নেই। ছোট-ছোট ভাই-বোন। সেই অবস্থায় বড়মামার জ্যাঠামশাই এসে বসে খাট থেকে তুলেছেন। ঝিল বিক্রি হয়নি, হবে না। কোথায় টাকা, কোথায় টাকা! বাড়ি মেরামত হবে কীভাবে! বড়মামার জ্যাঠামশাই প্ল্যানটা করে দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছেন। বড়মামা মনখারাপ করে ঘুরছেন। নারায়ণকে খাটের ওপরেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিছানার ওপর পড়ার ফলে ঠাকুরেরও কিছু হয়নি, বেদিরও কিছু হয়নি। নারায়ণ খাটে, বড়মামা মেঝেতে। অনেক রাত। চিন্তায় চিন্তায় বড়মামার ঘুম আসছে না। চিন্তা তো হবেই। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাইবোনদের শুকনো মুখ দেখলে মনখারাপ হয়ে। যায়। সকালে উঠে ছোটরা কত কী খায়! বড়মামা শুনতেন, ছোটবোন মেজোভাইকে বলছে, ‘আয় ভাই, এইবার আমরা একটু জল খাই।’ এইসব শুনলে বড়মামার বুক ফেটে যেত। রোজ রাতে শুয়ে শুয়ে প্ল্যান করতে হত, কাল সকালে কী হবে! ভগবানই বড়মামাকে ডাক্তারির লাইনে ঠেলেছিলেন। চণ্ডীমণ্ডপের ভাঙা সিন্দুক থেকে হাতে লেখা একটা পুথি পেয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, নানারকমের টোটকা ওষুধের ফর্মুলা। বড়মামা সেই পুথি দেখে তৈরি করেছিলেন বাতের তেল আর দাঁতের যন্ত্রণার গুড়ো। ওষুধদুটোর ডিম্যান্ড হচ্ছিল একটু একটু করে। বড়মামার। কোনও লজ্জা, অহঙ্কার ছিল না। বাজারের একপাশে দাঁড়িয়ে মুখে কাগজের চোঙা লাগিয়ে খুব বক্তৃতা দিতেন। গলা ভালো ছিল, খানিক ভজন গান গাইতেন। তারপর তুলে ধরতেন ওষুধ। দুটো। বাত আর দাঁত। সকলে বলাবলি করত, জমিদারের ছেলে। দ্যাখো, দেখে শেখো। তা, বড়মামা শুয়ে শুয়ে পরের দিন সকালের বক্তৃতা তৈরি করতেন মনে-মনে। দুশো রকমের নাকি বাত আছে। বাবা, পৃথিবীতে এত সব আছেও বটে! বড়মামা এখন যেমন বলেন, যত না মানুষ তার চেয়েও বেশি রোগ।
