তখন হল কী, সাদা গাড়িটা বাড়ির সামনের মাঠে ঢুকল আর তিনতলার ঠাকুরঘরটা ঝুপ করে ভেঙে পড়ে গেল দোতলার ঘরে। নারায়ণ, নারায়ণের বেদি, বড়মামা, পুজোর ঘট, কাঁসর, ঘণ্টা সব জড়ামড়ি করে তালগোল পাকিয়ে দোতলার শোবার ঘরের খাটের ওপর। হুম্মাড়, হুম্মাড় শব্দ শুনে যিনি যেখানে ছিলেন সবাই ছুটে এলেন। ধুলোয় চারপাশ অন্ধকার। ইট, টালি, পলেস্তারা, কাঠকুটো। দরজা ঠেলে খোলা যায় না এমন অবস্থা। সাহসী যাঁরা তাঁরা ঠেলেঠুলে, টপকে-টাপকে ভেতরে দেখেন কী, ফটফট করছে রোদ। খাটের ওপর আমার বড়মামা চিত। এমনভাবে ঠাকুর তাকে ফেলেছেন, যেন মাপ করে, তাগ করে। মাথাটা বালিশে, পা দুটো তাকিয়ার ওপর আর নারায়ণ তাঁর বুকের ওপর উপুড় হয়ে। যেন চার হাত দিয়ে বড়মামাকে জড়িয়ে ধরে রক্ষা। করছেন। সকলে বড়মামাকে তুলবেন কি, হাঁ হয়ে গেলেন! সবাই সমবেত কণ্ঠে গাইতে। লাগলেন, ‘জয় নারায়ণ পরম কারণ।’ নারায়ণ-নারায়ণ ধ্বনি মিলিয়ে যেতেই অনেকে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ‘একটা ছবি তোলাবার ব্যবস্থা করো, করুণাময়ের এই করুণা ধরে রাখো, ধরে রাখো। খবরের কাগজের লোককে খবর পাঠাও।’
বড়মামা ওঠার চেষ্টা করতেই সবাই হাঁহাঁ করে উঠলেন, ‘উঠো না, উঠো না, আমরা না বলা পর্যন্ত উঠো না।’
আর ঠিক সেই সময় ফস করে একটা আলো চমকে উঠল। সবাই ফিরে তাকালেন। দরজার সামনে ইটের স্তূপের ওপর এক সায়েব। বুকের কাছে ক্যামেরা ঝুলছে। তিনি আদেশ করলেন, ‘গেট আপ বিমল। আমাকে তুমি চিনবে না। আই অ্যাম ইওর জ্যাঠামশাই। টুয়েলভ লংইয়ারস পরে গ্লাসগো থেকে পরশু ফিরেছি।’
সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের সবাই চিৎকার করে উঠলেন, ‘প্রভু, প্রভু! কৃপা কৃপা।’
সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বড়মামাকে সেই বিলেত-ফেরত ইঞ্জিনিয়ার জ্যাঠামশাই টেনে তুললেন। আর সেই যে তুললেন, বড়মামা ক্রমশই উঠতে লাগলেন, ওপরে আরও ওপরে, আরও আরও ওপরে। জ্যাঠামশাই বালিগঞ্জে বাংলো কিনলেন। এই বাড়িতে তাঁর যে অংশটুকু ছিল তা বড়মামাকে লিখে দিলেন। দাসপাড়ায় বিশাল একটা ঝিল ছিল আমার মামাদের। সেটার নামই হয়ে গিয়েছিল আত্মহত্যার ঝিল। কারও সঙ্গে কারও ঝগড়া হলেই যার বেশি অভিমান হত, এই ঝিলে এসে ঝুপুং করে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তারপর খোঁজ খোঁজ। কী যে সব বলত লোকে! বলত, এই ঝিলের তলায়, তোমরা জানো না ভাই, সাঙ্তিক সব কাণ্ড হয়ে আছে। বড়-বড় চেন দিয়ে মোহর-ভরতি ঘড়া বাঁধা আছে। ঝিলের তলায় বড়-বড় সাত-আটটা কুয়ো আছে। যক্ষের কুয়ো। ঝিলে একবার ঝাঁপ মারলে তার আর উঠে আসার উপায় নেই। পা ধরে টেনে ওই কুয়োর মধ্যে নামিয়ে নিয়ে যায়। কেউ বলত ঝিলের তলায় গোটা একটা মন্দির আছে। সেই মন্দিরে মা কাত্যায়নীর সোনার মূর্তি আছে। অনেক রাতে আকাশপথে হিমালয় থেকে উঠে আসেন এক সন্ন্যাসী। তাঁর গা দিয়ে সোনালি জ্যোতি বেরোয়। তিনি ঝিলের ধারে এসে দাঁড়ালেই সব গাছ নুয়ে পড়ে। জল সরে গিয়ে দু-ভাগ হয়ে যায়। বেরিয়ে পড়ে ধাপ-ধাপ সিঁড়ি। সন্ন্যাসী নেমে যান সেই সিঁড়ি ধরে। নেমে যাবার সঙ্গে-সঙ্গে জল আবার সরে আসে। মন্দিরে শুরু হয় পূজারতি। একটা আলোর রেখা উঠে আসে নীচ থেকে ওপরে। মাঝখানে ভেসে ওঠে আলোর বিন্দু। একটা নয় অনেক। ঝিলের জলে মন্ত্র পড়তে শুরু করে। সকালে সবাই এসে দেখতে পায় রাশি-রাশি। ফুল ভাসছে ঝিলের মাঝখানে। রাতে মরে গেলেও সেই ঝিলের ধারে কেউ যেত না। অশরীরীর ভয়ে। যারাই দুঃসাহস দেখিয়ে গেছে, তারাই পরের দিন পাগল। সেই পাগলদের লোকে বলত, ঝিল-পাগলা। তারা সারাদিন পথে-পথে ঘুরে বেড়াত আর বলত, ‘হায়, হায়, কী দেখলুম! হায়, হায়, কী দেখলুম!’ আমরা দিনের বেলায় সেই ঝিল দেখেছি। উঃ, কী সুন্দর! কালো মিশমিশে জলে ঝিরিঝিরি ঢেউয়ের কোঁচ। যেন রূপোর টুকরো খেলছে। চারপাশে বড় বড় গাছ। ঝুসন্ধুস। শব্দ। ডালের আড়ালে-আবডালে কাটুম-কুটাম পাখির ডাক। টিরর-টিরর পোকার শব্দ। জায়গাটা একেবারে নির্জন, শীতল। গাছের মাথায়-মাথায় রোদ, তলায় ঘন ছায়া। ঝিলের জলের ধারে। ধারে পানিফলের চাষ। ফুটে আছে শালুক আর পদ্ম। কে কবে একটা নৌকো ভাসিয়েছিল, কোন সালে তা কে জানে! সেই নৌকোটা তখন আর ঘাটে বাঁধা ছিল না। ছাড়া ছিল। ভেসে বেড়াচ্ছিল, আপনমনে বাতাসে। কেমন মজা। কেউ কোথাও নেই, বিশাল ঝিলে রংচটা একটা ভূতুড়ে নৌকো কখনও এই ঘাটে, কখনও ওই ঘাটে, কখনও মাঝখানে গোল হয়ে ঘুরছে। আমাদের কোনও ভয় করছিল না। ভূতের না, চোর-ডাকাতের না। কেবল মনে হচ্ছিল যদি একটা অজগর বেরোয়। যদি বেরিয়ে আসে একটা গুলবাঘ। আমরা কালীদার সঙ্গে ঝিলে যেতুম। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর। বিশেষ করে শীতকালে। ওখানে যেন আরও শীত ছিল। বর্ষাকালে কালীদা কোমর জলে নেমে ঝপাঝপ পানিফল তুলে আনতেন। আমি জিগ্যেস করতুম, ‘এই যে জলে নামলেন, কই আপনাকে তো পা ধরে টেনে নিয়ে গেল না!’ কালীদা বলতেন, ‘সব সময় টানার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আমি যে মা কালীর মন্ত্র পড়ছিলুম, হুড়-হুড় করে। মন্ত্রে মন্ত্রে কোনও ফাঁক রাখিনি। ভেতর থেকে একেবারে শিকলের মতো বের করছিলুম টেনে টেনে। তবে তোমাকে বলে রাখি, এই ঝিলটা খুব সহজ জায়গা নয়। অনেক রাতে তুমি কান-খাড়া রাখলে শুনতে পাবে, টং টং, ঠং ঠং শব্দ। ঘড়া আর চেনে ঠোকাঠুকি।’
