মেজোমামা বললেন, ‘আইন ইজ আইন।’
বড়মামা ভেংচি কাটলেন, ‘আইন ইজ আইন! আমার জজসায়েব এলেন।’ মাসিমাকে বললেন, ‘বাজার যেতে হবে তো আগে বলিসনি কেন?
‘আমি বলব? কেন তোমার একটা দায়িত্ব নেই! রোজ খেচকে-খেচকে আমাকে সব বাজার। পাঠাতে হবে!’
বড়মামা চারটে বড় বড় ব্যাগ হাতে বাজারে ছোটার জন্যে তৈরি হলেন। মেজোমামা বড়মামাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, ‘আমি এখন আরাম করে এককাপ চা খাব, খবরের কাগজের পাতা ওলটাব, এডিটোরিয়ালটা মন দিয়ে পড়ব। তারপর টুক করে দাড়িটা কামিয়ে, গায়ে আচ্ছা করে ম্যাসেজ অয়েল মেখে চান। তেল আজ মাখতেই হবে। স্কিনটা খসখসে হয়ে যাচ্ছে। আমার আবার তেল মাখার ক্যালেন্ডার আছে। তারপর শরীরে হালকা করে পাউডার ছড়িয়ে সাদা। পাজামা আর-একটা টাওয়েল গেঞ্জি চড়িয়ে দোতলার দক্ষিণের ঘরে লম্বা বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে ভারী কিছু পড়ব না। পড়ব টিনটিন ইন আমেরিকা। তারপর যদি ছোট্ট একটা ঘুম এসে যায় তো যাবে। লাইট ন্যাপ।’
বড়মামা মাসিমার হাত থেকে বাজারের টাকা নিতে নিতে বললেন, ‘শুনছিস! আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কীরকম বলছে! রসিয়ে-রসিয়ে। তারিয়ে-তারিয়ে।’
‘বলছে বলুক। ওর মুখ আছে বলছে।’
‘আমার কান আছে ঢুকছে।’
‘ঢুকুক।’
‘আমার মনোবল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে।’
‘তুমি এ কান দিয়ে ঢুকিয়ে ও-কান দিয়ে বের করে দাও। ভগবান তোমাকে দুটো কান কী জন্যে দিয়েছেন?’
মেজোমামা যেন নিজের মনেই বললেন, ‘ও হ্যাঁ ভুলেই গেছি, চান করে উঠে কিছু একটা খাওয়া দরকার, তা না হলে পিত্তি পড়বে। চারটে নরম-পাক সন্দেশ বেশ বড় সাইজের, একমুঠো কাজু আর একটু ফুটজুস খাব। কে জানে বাবা, কখন বাজার হবে, কখন রান্না হবে! নিজের পেট নিজেকেই ঠান্ডা রাখতে হবে। যস্মিন দেশে যদাচার।’
মাসিমা বললেন, ‘এই সব কথা তুমি কাকে শোনাচ্ছ?’
‘নিজেকে। নিজের কর্মপরিকল্পনা নিজেকে শোনাচ্ছি।’
‘তোমার কর্মপরিকল্পনার বারোটা আমি বাজাচ্ছি। আজ তোমার নর্দমা আর বাথরুম পরিষ্কারের ডেট। তুমি খুব মজা করে ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি। কাল আমি অ্যাসিড আর নতুন ব্রাশ আনিয়ে রেখেছি। যাও, লেগে পড়ো।’
‘আমার লো-প্রেশার হয়েছে। পরিশ্রমের সব কাজ বারণ। ডাক্তারবাবু বলেছেন, ভালো-ভালো খাবে। গান শুনবে, মজার-মজার বই পড়বে আর নেহাত প্রয়োজন না হলে বিছানা ছেড়ে উঠবে না।’
বড়মামা দরজার কাছ থেকে বললেন, ‘না, আমি বলিনি।’
মেজোমামা বললেন, ‘তুমি ছাড়া ডাক্তার নেই না কি? তুমি হলে হাইপ্রেশারের ডাক্তার। আমি লো-প্রেশারের ডাক্তার দেখিয়েছি।’
‘ডাক্তারের আবার লো-হাই আছে নাকি?’
‘অবশ্যই আছে। এ হল গিয়ে তোমার স্পেশ্যালিস্টের যুগ।’
‘তা হলে আমাকে প্রেশারমাপার যন্ত্রটা বের করতে হচ্ছে। বাজারে যাবার আগে ওই কাজটাই করি।’
মাসিমা বললেন, ‘দাদা, তুমি আর বিলম্ব কোরো না। আমার হঠাৎ মনে পড়ল, তুমি আজ শরৎবাবুকে নিমন্ত্রণ করেছ?’
বড়মামা চমকে উঠলেন, ‘আরে তাই তো।’
সকালে আমার মামার বাড়িতে যত গোলমালই হোক, রাতের দিকে সব ঠান্ডা। আর গোলমাল মানে কী, সবই তো মজার ব্যাপার। ঘরে-ঘরে আলো। আমার মাসিমা বলেন, ‘উঠুক ইলেকট্রিক বিল, নেভার মাইন্ড, কোনও ঘর অন্ধকারে রাখা চলবে না। মা লক্ষ্মী কখন কোন ঘরে এসে বসতে চাইবেন, কে বলতে পারে।’ রাতে দূর থেকে আমার মামার বাড়িটাকে দেখলে মনে হয় স্বপনপুরী। চারপাশ ফাঁকা। সারি-সারি গাছ দিয়ে ঘেরা বিশাল একটা তিনতলা বাড়ি। রংবেরঙের কাচের ভেতর দিয়ে আলোর রামধনু বেরিয়ে আসছে। সেকালের জমিদার বাড়ি। শুনেছি, আমি জন্মাবার আগে অবস্থা খুব খারাপ হয়ে এসেছিল। এদিক ভেঙে পড়ছে, ওদিক ভেঙে পড়ছে। একবার ছোটমতো একটা ভূমিকম্প হল। চণ্ডীমণ্ডপ আর উত্তর দিকটা ভেঙে। স্তূপমতো হয়ে গেল। ভাঙা বাড়ির ফাঁকফোকর থেকে শেয়াল বেরিয়ে এসে প্রহরে-প্রহরে ডেকে যেত। সেই সময় আমার বড়মামা—তিনতলার ভাঙা ঠাকুরঘরে নারায়ণের সামনে বসে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘আমি যদি তোমার বাচ্চা হই, তা হলে এই ধ্বংসস্তূপ ঠেলে আমি উঠবই উঠব, উঠব, উঠব। তোমার ডান হাত আমার মাথায় রাখো। আমি যদি বাঘের বাচ্চা হই, তোমাকে আমি সোনার মুকুট পরাব, হিরে সেট করা। আর যদি শেয়াল হই তা হলে ভৈরবীর ত্রিশূলের খোঁচায় বুক ফেঁড়ে মরে যাব। মাই নেম ইজ বিমল মিত্র।’
বড়মামা যখন নারায়ণের সঙ্গে এইসব কথা বলছেন, তখন একটা নতুন মোটর গাড়ি শাঁ-শাঁ করে এগিয়ে আসছে এই বাড়ির দিকে। গাড়ি চালাচ্ছেন সায়েবের মতো এক বাঙালি। পরনে কালো। সুট। সাদা সিল্কের জামার ওপর কালো টাই। ঠোঁটে বাঁকা করে ধরা পাইপ। বড়মামা এসবের কিছুই জানতে পারছেন না। তিনি নারায়ণের সঙ্গে রাগারাগি করছেন। এদিকে নারায়ণের ইচ্ছায় একই সঙ্গে দুটো ঘটনা ঘটে চলেছে। ওইজন্যেই ভগবানের ওপর মানুষের এত বিশ্বাস বেড়ে যায়। একটা সাদা গাড়ি শাঁই-শাঁই করে আসছে, আর বড়মামা যে ভাঙা ঘরে বসে আছেন তার তলায় কড়ি-বরগা থেকে চুনচুন করে চুনবালি খসে-খসে পড়ছে। নারায়ণ হাসছেন, বড়মামা। রেগে-রেগে যা-তা বলছেন। আমি এখন বড়মামা বলছি বটে, বড়মামা তখন ছোট, আর মামাই হননি। কী করে হবেন! আমি না হলে, বড়মামা বড়মামা হবেন কী করে! আমার ওপর রেগে গেলে, আমি তো সেই কথাটাই বলি। মনে করিয়ে দিই।
