প্রগতি আরও এগোলে এই হবে, স্বামীকে বা স্ত্রীকে সহ্য না হলে মামলা, বিচ্ছেদ, পুনর্বিবাহ। তুমি কার কে তোমার! বৃদ্ধের স্থান পথে, পার্কে। বৃদ্ধার স্থান দেবালয়ে। মৃত্যুর পর চটজলদি। বৈদ্যুতিক চুল্লিতে দাহ। আর ব্রাহ্মণকে মূল্য ধরে দিয়ে মাথার ঝুমকো চুল বাঁচানো। ঝুমকা গিরা রে। মানুষ বাঁচে মৃত্যুর পর কারুর না কারুর দু-ফোঁটা চোখের জলের আশায়। এই চাতক সভ্যতায় জল কোথায়! সাগর শুকোলো, মেঘ লুকোলো। ছাই রঙের আকাশে শুধুই পলিউশান। চোখে। বালি না পড়লে চোখের জল আর পড়বে না। সব রাগপ্রধান সংসারেই, একটি পালা—স্ত্রী-র মানভঞ্জন পালা।
মামার বোমাবাজি
বড়মামা চিঠিটা তিনবার পড়লেন। যতবার পড়ছেন ততবারই মুখের চেহারা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। শেষবার পড়ে যখন আমার দিকে তাকালেন, তখন মুখ একেবারে উজ্জ্বলতম। আমি এখন পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে সংস্কৃত শিখছি। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় সংস্কৃতে আমি মাত্র। তিরিশ নম্বর পেয়ে কেঁদেককে পাশ করায়, বড়মামা পুরো তিনটে দিন আমার সঙ্গে কথা বলেননি। মেজোমামাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের হল গিয়ে পণ্ডিতের বংশ। আমার জ্যাঠামশাই ছিলেন বিখ্যাত তর্কচ। মোচ্ছবতলায় নবদ্বীপের তর্কচূড়ামণিকে পরাজিত করে কৃষ্ণনগরের মহারাজের কাছ থেকে এই উপাধি পেয়েছিলেন। সেই বংশের কুলাঙ্গার হল এই কুষ্মাণ্ডটি। ইনি হলেন বাক্যচূড়ামণি। সকালে ওর মুখদর্শনে শরীরে পাপ সঞ্জাত হয়। গাত্রদাহ উপস্থিত হয়।’
মেজোমামা বললেন, ‘দাদা, তোমার হলটা কী? পটাপট শুদ্ধ বাংলা বেরোচ্ছে! তোমার মুখে তো চিরকাল শুনে এলুম ধুর ব্যাটা, ধ্যার ব্যাটা, রামছাগল, ধেড়ে ইঁদুর, পটকে দে, লটকে দে। মনে হচ্ছে, তোমার নবজন্ম হল।’
বড়মামা বলেছিলেন, ‘আমার ওপর পূর্বপুরুষের আবেশ হয়েছে। আজকাল মাঝে মাঝে আমার এইরকম হচ্ছে।’
‘তাই তুমি উলটোপালটা বকছ। ভুল বলছ। ইতিহাসকে বিকৃত করছ। তর্কচঞ্চু আমাদের জ্যাঠামশাই ছিলেন না। তিনি ছিলেন পাক্কা সাহেব, ইঞ্জিনিয়ার। সাতবার বিলেত গিয়েছিলেন। বাংলা ভুলে গিয়েছিলেন। বাঙালিকে বলতেন কাওয়ার্ড। মুম্বাইতে চাকরি করতেন। ঘোড়ায় চড়তেন। গলফ খেলতেন। জ্যাঠাইমাকে গাউন পরিয়ে ঘোড়ায় চাপা শেখাতে গিয়ে আছাড় খাইয়ে ঠ্যাং ভেঙে দিয়েছিলেন। তর্কচথু ছিলেন আমাদের বাবার বাবা। আচ্ছা, ডাক্তার হলে কি এমন অজ্ঞ হতে হয়! নিজের পরিবারের ইতিহাসটুকু জানো না!’
বড়মামা বলেছিলেন, ‘একটা সুযোগ পেয়েছ, এখন বলে নাও। তবে তোমার ভাষা আমি দু জায়গায় সংশোধন করব। বাবার বাবা নয়! প্রপিতামহ।’
মেজোমামা হইহই করে হেসে উঠলেন, ‘প্রপিতামহ নয় পিতামহ। শোনো, অর্ডারটা হল এইরকম —পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ প্রপিতামহ। ক’পুরুষ হল? চার পুরুষ। ব্যস, আর ওপরে ওঠার দরকার নেই।’
বড়মামা বললেন, ‘অত বক্তৃতা দেবার দরকার নেই। একে বলে, স্লিপ অব টাঙ্গ। জিহ্ব…লন। আমি রোজ পূতপুরুষের তর্পণ করি। তোমার কি মনে হয়, এই ওপরে ওঠাটা আমি জানি না? বালক! শোনো, আমি এইভাবে মনে রাখি, পি, প্রপি, বৃপপি।’
‘হল না, একটা বাদ চলে গেল। ওটা হবে, পি, পিপি, প্রপি, বৃ্পপি।’
‘কী পিপি করছিস? একি মোটরগাড়ি না কি? শ্রদ্ধা ভক্তির প্রভূত অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে কারণে তুমি অনায়াসে অক্লেশে বলতে পারলে জ্যাঠাইমার ঠ্যাং। তুমি শিক্ষিত, অধ্যাপক। তোমার মুখ থেকে এ আমি আশা করিনি। তুমি মুরগির ঠ্যাং বলো, সংশোধন করব না, জ্যাঠাইমার ঠ্যাং বললেই প্রতিবাদ করব। তুমি বড় হয়েছ, লেখাপড়া শিখেছ, তোমাকে দেখে ছোটরা শিখবে। তুমি এখানে বসে-বসে ঠ্যাংনাচাচ্ছ আর বলছ জ্যাঠাইমার ঠ্যাং। ছিঃ, ছিঃ। একে আমি বলতে পারি তোমার অধঃপতন।’
‘তুমি যে ঠ্যাং বললে?’
‘কখন বললুম?’
‘এই তো বললে, বসে-বসে ঠ্যাং নাচাচ্ছ। জ্যাঠাইমার ঠ্যাংও বলেছ।’
‘তোমার ঠ্যাংকে ঠ্যাং বলব না তো কি শ্রীচরণ বলব! তুমি কী আশা করো আমার কাছ থেকে?
‘পুরু আলেকজান্ডারকে যেমন বলেছিলেন, ভদ্রলোকের প্রতি ভদ্রলোকের মতো ব্যবহার।’
বড়মামা বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। এখন সমস্ত বিভেদ ভুলে ঐক্যমত হয়ে…।’
‘হল না বড়দা। চেষ্টা করছ বটে, হচ্ছেনা। য-ফলা সরাও তিন ঘর। ঐকমত্য বলো।’
ঠিক ওই সময় মাসিমা ঘরে ঢুকে বললেন, ‘তখন থেকে ওঘরে কাজ করতে-করতে শুনছি, তিন ঘর সরাও, য-ফলা দু-ঘর সরাও, আর কাগের ঠ্যাং, বগের ঠ্যাং মুরগির ঠ্যাং। এদিকে সকাল। ন’টা বাজতে চলল, আজ কার বাজার করার পালা শুনি? কে আজ বাজার করে আমাকে উদ্ধার করবে!’
বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বিশাল একটা দেয়াল ক্যালেন্ডারের দিকে এগিয়ে গেলেন। ঠিক যতটা উৎসাহ নিয়ে গেলেন, ঠিক ততটা নিরুৎসাহ হয়ে ফিরে এলেন। মাসিমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আজ আমার পালা, কিন্তু আজ আমার ভীষণ রুগির চাপ। আমি যেতে পারছি না। আমি নাতিশয় দুঃখিত।’
মেজোমামা বললে, ‘এঃ, অকারণে একটা ‘না’ যোগ করে মানেটাই পালটে দিলে। না অতিশয়, নাতিশয়, মানে তুমি আদৌ দুঃখিত নও। তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ! অতিশয় দুঃখিত, ভেরি সরি—তাই তো?’
‘হ্যাঁ, ভেরি সরি।’
মাসিমা বললেন, ‘ও সব সরি-ফরি ছাড়ো। রুগির সঙ্গে তোমার কত যে সম্পর্ক আমার জানা আছে। আজ তিনমাস হল, তোমার স্টেথেসকোপ ঘরের দেয়ালে ঝুলছে। যার যেদিন পালা, সে সেদিন যাবে। আমার কড়া আইন। এই নিয়ে পরে ভাইয়ে-ভাইয়ে চুলোচুলি হবে, তা আমি চাই না। আমি বিশ্বশান্তি চাই না, আমি চাই গৃহশান্তি।’
