ডোন্ট বি এ ফুল।
আমরা টেকওভার করব।
কত জায়গায় কত লস দেবেন! আপনার স্টেট তো ওভার ড্রাফটে চলছে। এরপর কর্মচারীদের মাইনে দেবেন কী করে! আপনি ভেবে দেখুন। তা না হলে সাতটা ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা ক্লোজার ডিক্লেয়ার করব। তার ফলটা কী হবে বুঝতে পারছেন?
জৈন চলে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে আই জি-রে ফোন। আপনাকে একটা বাজে খবর শোনাই, চকমুকুন্দপুরে তিনটে গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। ধরা যেতে পারে মৃতের সংখ্যা শ দুই। শিশু আছে, নারী আছে।
কারণ?
ল্যান্ডলর্ডরা জমি দখল করছে। আগের বার যাঁরা বসিয়ে গিয়েছিলেন, সেই মুরুব্বিরা নেই।
আপনি কিছু করুন।
কী করে করব, এর মধ্যে তো আপনার মন্ত্রী রয়েছেন।
আই সি।
আবার ফোন, উত্তরবঙ্গের ডি. এম। কাল রাতে তিস্তার বাঁধ কেটে দিয়েছে। তিন হাজার একর জলের তলায়।
বাঃ, শুভ সংবাদ। কিছু একটা করুন।
কী করে করব! এখানে ইরিগেশান ইঞ্জিনিয়াররা গণছুটি নিয়ে বসে আছে।
টার্মিনেট অল সার্ভিস, অ্যাপয়েন্ট নিউ ইঞ্জিনিয়ারস।
ভদ্রলোক হাসলেন। আবার ফোন, বডিগার্ডর্স লাইনে দু-দল পুলিশে সশস্ত্র লড়াই। একজন অফিসারসহ তিনজন শেষ। আবার ফোন, দমদমের কাছে রেলের ওভারব্রিজ খুলে পড়ে গেছে। লাইন মালার মতো ঝুলছে।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালুম। চেয়ারটার দিকে তাকালুম একবার। দুলছে। যেন বলতে চাইছে, হুঁ হুঁ!
আমার কালো অ্যামবাসাডার রাজভবনের গেট পেরিয়ে ঢুকছে। আজ আর আমার পাশে আমার স্ত্রী নেই। আজ আর আমার বুকটা ধক করে উঠল না। জিভের তলায় সরবিট্রেট রাখতে হল না। চাকার তলায় মোরামের ঘসঘস শব্দ। রাজ্যপালের অফিসে ঢুকে চমকে উঠলুম। আমার সেই গর্তে পড়া পূর্তমন্ত্রী ও গঙ্গাবতার বুবনা ওয়েটিং রুমের সুদৃশ্য সোফায় বসে আছেন পাশাপাশি। দু-তরফের দৃষ্টি পরস্পরের লগ্ন হয়ে থমকে রইল কিছুক্ষণ। বুবনা হঠাৎ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে এয়ার ইন্ডিয়ার মহারাজার ভঙ্গিতে বললেন, আইয়ে আইয়ে, মিট আওয়ার নিউ চিফ মিনিস্টার। বুবনার হাতে লম্বা একটা কাগজ। ওদিকে রাজ্যপাল ঢুকছে ধীর পায়ে, ওয়েল কাম, ওয়েলকাম। বুবনার হাতে অনাস্থার চিঠি, দলত্যাগী মন্ত্রীদের লিস্ট। আমার হাতে রেজিগনেশান লেটার। কোনটা আগে জমা পড়বে! রাজ্যপাল দুদিকে দু-হাত মেলে বললেন, নো প্রবলেম, আই হ্যাভ টু হ্যান্ডস।
মানব অথবা দানব
বৃদ্ধ ছিটকে খানায় পড়ে যাচ্ছিলেন, ধরে ফেললুম। একেবারেই পেছনে ছিলুম। বৃদ্ধ ভ্যাবাচ্যাকা। জিগ্যেস করলুম, কী দেখছেন?
কেমন ধাক্কা মেরে চলে গেল। কোনও দৃকপাত নেই। ভাবছি, আমি গরু, না, ওই নব্যযুবকটি গরু?
কিচ্ছু ভাববেন না, ও যখন আপনার মতো বৃদ্ধ হবে, তখন ওর নেকস্ট জেনারেশন ওকে এর চেয়েও জোরে ধাক্কা মারবে। আপনাকে আমি ধরেছি। ওকে ধরার কেউ থাকবে না। নর্দমাতেই পড়ে থাকবে, পরের দিন স্ক্যাভেঞ্জার গাড়ি এসে ক্লিয়ার করে নিয়ে যাবে। কিচ্ছু ভাববেন না। তা এই নড়বড়ে শরীর নিয়ে চলেছেন কোথায়?
স্কুল থেকে নাতনিকে আনতে।
ছেলেবেলায় পড়েছিলেন, পথে বড় রিপু ভয়, মিনি, মিডি, অটো, টেম্পো, মোটরবাইক, সাইকেল রিকশা, ঠ্যালা, লরি, সাইকেল, স্টেটবাস, প্রাইভেট বাস, ট্যাক্সি, প্রাইভেট, গরু, ষাঁড়, কুকুর, মানুষ—এদের কেউ কি আপনাকে খাতির করবে? নাতনি আপনাকে রক্ষে করবে, না, আপনি নাতনিকে রক্ষা করবেন?
কী করব বাবা! ছেলে সকাল আটটায় বেরিয়ে যায়, বউমা বেলা একটায় স্কুল থেকে ফেরে। আমি যদি এই কাজটুকু না করি, কথা হবে, রাগ হবে, সমালোচনা হবে! তাই যদ্দিন পারি!
ধুতি-পাঞ্জাবি পরাবৃদ্ধ। চোখে মোটা কাচের চশমা। রোদের তেজে নাকের ওপর কপাল তিন ভাঁজ খেয়ে আছে। ব্যস্ত বললে ভুল হয় উদব্যস্ত বাজারের পথ ধরে, উন্নত বক্তৃতাসর্বস্ব আধুনিক কালের খানাখন্দে ভরা পথ মাড়িয়ে ধীরে ধীরে চলেছেন। বুঝতে পারছেন না, সব কিছু কেন এত এলোমেলো, নৃশংস, হৃদয়হীন!
না জানলেও আমি জানি, স্বাধীনতা যখন এক বছরের শিশু, তখন বাংলার ফেঁড়ে ফেলা অংশে জীবনের সব স্বপ্ন ফেলে রেখে, এক বস্ত্রে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে আশ্রয় পেয়েছিলেন কুপার্স ক্যাম্পে। সেখানে দরদি নেতা, মরমি দালাল, উদার লম্পট, ধূর্ত সমাজসেবী, তোমাদের ভালো করব, তোমাদের স্বর্গ দেখাব বলে, নরকের নরক দেখিয়েছিল। আকাশে ঝাঁক ঝাঁক শকুন, জমিতে নতুন ইহুদি। দিন বড় কষ্টের, রাত বড় মজার। শরীর বড় সস্তার।
সেই ঘেটো থেকে যৌবনের অদম্য শক্তিতে উঠলেন। শহরতলির নয়া বসতিতে নিজের আশ্রয় খুঁজে নিলেন, ছেলেকে দাঁড় করালেন, মেয়েদের বিয়ে দিলেন। ছেলে প্রেম করে বউ নিয়ে এল। উপহার পেলেন, অবসর আর নাতনি। অহরহ শুনলেন, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। সবসময় দ্বিতীয়। বিশ্বযুদ্ধের পরিবেশ, আলোহীন অন্ধকার রাত, জাপানি বোমায় সেই যে চুরমার হয়েছিল পথঘাট, সেই একই হল। সৈনিকরা মার্চ করছে স্লোগানের তালে তালে, লড়াই, লড়াই, লড়াই, লড়াই। বৃন্দাবনের নিরেট ছেলে নেতা হয়েছে। পমেটম মাখা চুল। ঠোঁটে মুরলী নয়, বাঁকা সিগারেট,। যেদিকে ধোঁয়া সেদিকের চোখ আধবোজা, গলায় ভাওয়েল-এ ই আই ও ইউ। কনসোনেন্ট নেই। কলের জাহাজের ভেঁপুর মতো কণ্ঠস্বর। সড়কের ওপর পাঁচতলা। বেসমেন্টে বোমার ফ্যাকট্রি। তার ওপর আমদরবার। তার ওপর মধুবন। তার ওপর পরিবার-পরিজন। টঙে মন্দির। ওঁ শান্তি। সকালে ক্যাসেটে নামসংকীর্তন। দু-খানা গাড়ি দু-পাশের গ্যারেজে। নাদুসনুদুস ছেলেমেয়ে, গজেন্দ্রগামিনী স্ত্রী। পোড়া কাঠের মতো মা, পিতা ফুলের মালা দোলানো ছবি। মাঝে মাঝে লাল। আলোর গাড়ি আসে। খালে লাশ ভাসে। মায়েরা বুকফাটা কান্না কাঁদে। বিরোধী নেত্রী ছুটে। আসেন সান্ত্বনা দিতে। কাগজে ছবি ছাপা হয়। ঠোঙা হয়। অফিসের তাত্বিকবাবুরা ঝালমুড়ি খান। ঢেউ মসৃণ হয়ে যায়। আলু, পটল, ফুচকা, ছোট পরদায় মাধুরী, অজয় দেবগণের ঢিসুম ঢিসুম। দুই নেতার বৈঠক। ফিরিস্তির আদান, প্রদান। শান্তি, শান্তি। বেসমেন্টে বোমা। বাংলা বনধ। এপক্ষ ফেলিওর। ওপক্ষ—ফুল বনধ। জনগণ, অভিনন্দন, অভিনন্দন। একটা লাল, একটা সাদা, খবরের কাগজে স্টক ছবি, খাঁ খাঁ হাওড়া ব্রিজ, রাস্তায় ব্যাট বল।
