গুম মেরে বসে আছি। কাগজ এল। বুবনার খুনের ব্যাপারটা কাগজ মিস করে গেছে। তার বদলে বিশাল খবর—আগুনে মল্লিকবাজার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কীরকম হল! আমাকে তো কেউ জানাল না। আমি এই স্টেটের সি. এম.! আমি জানলুম না। খিদিরপুর রোডে গভীর রাতে একটা লরি কলকাতার এক বিখ্যাত ব্যবসায়ীর গাড়ি চুরমার করে দিয়ে সরে পড়েছে। ব্যবসায়ী ও তাঁর ড্রাইভার দুজনেই মৃত। এ মনে হয় বুবনা কানেকশান। কোথাকার জল কোথায় গড়াচ্ছে রে বাবা!
আমার স্ত্রী বললে, কাল রাতে তোমাকে বলেছিলুম ছেড়োনা; আজ বলছি ছেড়ে দাও। পলিটিকস হল বিগ মানি আর বিগ ইন্টারেস্টের খেলা। ও আমাদের পোষাবে না। আমাদের সেই সাবেক ফরেন বুকস আর পিরিয়ডিক্যালসের ব্যবসাই ভালো। আমি সেই অফিসে অফিসে বই। আর ম্যাগাজিন দিয়ে বেড়াতুম, তাতে তোমার অনেক শান্তি ছিল। খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে কাল হল তাঁতির হেলে গরু কিনে।
আমি হাসলুম। মানুষের লোভ। ইংরেজ আমলে কিছু শৌখিন বাঙালি পলিটিশিয়ান ছিলেন। কেউ আইনজীবী, কেউ বুদ্ধিজীবী। কেউ ধনী জমিদার। সাহস করে দুটো কথা বলতে পারলেই বীর স্বদেশী। ক্লাসে বক্তৃতা আর মাঠে বক্তৃতায় অনেক তফাত। সারা দেশটা তখন ইংরেজের ক্লাসরুম। শাসনযন্ত্রের হাতল তাদের হাতে। আক্রমণের লক্ষ্যস্থল একটাই ইংরেজশাসন। পকেটমারকে মারার মতো একটা ঘুসি মেরে আসতে পারলেই হয়ে গেল। বিরাট কাজ। জেল খেটে আসতে পারলে তো কথাই নেই। বাঙালি কেন ভারতীয়রা যেই চেয়ারে বসল, দেখা গেল চরিত্রে মাল-মশলা কিছুই নেই। শাসন একটা ধারালো জিনিস। প্রয়োজনে কাটতে হবে। এমুখে, ওমুখে। তখন ছিল একটা শত্রু, এখন শত শত্রু। এ দেশ আর কেউ নেবে না; আমরাই একে শতছিন্ন করব, নিংড়োব, চটকাব। কেটলিতে যখন জল ফোটে তখন জলের একটি বিন্দু সুস্থির থাকতে পারে না। এ দেশের জনজীবনেরও সেই একই অবস্থা। প্রতিটি প্রাণীই অস্থির।
ঠিক দশটার সময় রাইটার্সে পৌঁছে গেলুম। মন্ত্রীদের জন্যে আলাদা যে ভি আই পি লিফট হয়েছে, সেই লিফটে আর গেলুম না। বড় লিফটের সামনে এসে দাঁড়ালুম। এই লিফট কাল রাতে আমার স্বপ্নে ডক্টর রায় চালাচ্ছিলেন। ঘরে এসে নিজের চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে রইলুম বেশ কিছুক্ষণ। কাল রাতে এই চেয়ারে একটা সাপ শুয়েছিল। চেয়ারটা যেন অল্প অল্প দুলছে। বলতে চাইছে, ছোড়ড়া মায়া, প্রেমনগরকা।
হঠাৎ পেছন দিক থেকে আমার পি-এ বললেন, চেয়ারটায় কোনও গোলমাল আছে স্যার? এনিথিং রং? মিস্ত্রি ডাকব?
কোনও গোলমালই নেই, ভারী সুন্দর চেয়ার। কিন্তু বসা যায় না। সাঙ্তিক অস্বস্তি হয়। আনকমফর্টেবল।
আপনার চেহারার তুলনায় সামান্য বড়। এই যা।
চেয়ারে বসার আগে, একবার ভালো করে দেখে নিলুম। সত্যিই কিছু শুয়ে আছে কি না!
মিঃ সেনশর্মা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।
পাঠিয়ে দিন।
ভদ্রলোককে আজ তাজা ফুলকপির মতো দেখাচ্ছে। চেয়ার টেনে বসলেন। বেশ কিন্তু কিন্তু গলায় বললেন, চিফ মিনিস্টার স্যার! এই ব্যবসায়ী সম্প্রদায় তো আপনার সঙ্গে খুব একটা কো অপারেট করছে বলে মনে হয় না।
কেন? আপনার এই সন্দেহের কারণ?
বাজার থেকে অত্যাবশ্যকীয় সমস্ত পণ্য উধাও হয়ে গেছে। তেল নেই। কেরোসিন নেই। ডাল নেই। তিনের-চার ভাগ ওষুধ নেই। তরিতরকারি নেই। ডিপোয় দুধ নেই। বেবিফুড নেই। সাবান নেই। কাপড়কাচার সোডা নেই। সবচেয়ে ফানি নুন নেই। ধরা যেতে পারে মোটামুটি সবই নেই।
রাজনীতির দাবাখেলায় এটা খুব পুরোনো চাল। বেশিদিন স্থায়ী হয় না। পালটা চালে আমরা কিস্তিমাত করে দেব। আগের মিনিস্ট্রিতেও ব্যবসাদাররা এই চাল চেলেছিল।
তাদের লোকবল ছিল। ক্যাডারবল ছিল। প্রতিটি বাজারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্লোগান দিয়ে, ডেমনস্ট্রেশান করে বিলকুল নর্মাল করে দিয়েছিল। আপনাদের তো কিছুই নেই। লাখ দেড়েক লোকের মিছিল বের করতে পারবেন?
জনমানসে এখনও ওইসবের কোনও ইমপ্যাক্ট আছে বলে আপনি মনে করেন? আপনি কি মনে করেন ডেমনস্ট্রেশানে দাম কমে? আপনার সেই দমদম দাওয়াই-এর কথা মনে আছে? কী হয়েছিল মনে আছে?
আমি পাবলিক রিলেশানস, পাবলিসিটি লাইনের টপ কনসালট্যান্ট, আমার কাছে যে কোনও ক্যামপেনেরই দাম আছে।
ক্যামপেন-ফ্যামপেন অল বোগাস। যা এফেকটিভ, তা হল পাইয়ে দেওয়া। পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি।
বন্ধ ঘরে বসেও শুনতে পাচ্ছি, বাইরে একটা তাণ্ডব হচ্ছে। পি-এ কে ডাকলুম, কী হচ্ছে বাইরে?
ও আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন স্যার। আজ আপনার কর্মচারীরা কালা দিবস পালন করছে। সব ব্যাজ পরে আপনার ঘরের সামনে এসে শ্লোগান দিচ্ছে।
দাবি?
ওই তো একটাই দাবি, মাইনে বাড়াও। কাজের ঘণ্টা কমাও। পাঁচদিনে সপ্তাহ করো।
দু-নম্বর ইউনিয়নের নেতাদের ডেকে পাঠান তো। এক নম্বর দীর্ঘকাল ডাণ্ডা ঘুরিয়েছে। দুইকে এবার মদত দিয়ে দেখা যাক।
দুই তো তেমন পাওয়ারফুল নয়।
আপনি আপনি কি আর পাওয়ার ফুল হয়। ফুল গাছে সার দিতে হয়। হ্যাঁ, মিঃ সেনশর্মা বলুন।
কী আর বলব? আপনাকে তো দেখছি একেবারে জেরবার করে মারলে। ঘরে-বাইরে শত্রু। যাক, সেই সংবর্ধনার একটা প্ল্যান ছকে ফেলেছি।
কার সংবর্ধনা!
ভুলে গেলেন? আপনার।
নিজেকে নিজে কেউ সংবর্ধনা দেয়? জনগণ যদি দেয়, যাব, মালা পরব।
