কোনও দলই তো নেই। সব ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। বঙ্কিমচন্দ্রের যেমন উত্তরাধিকারী নেই, বিদ্যাসাগরের ছেলে যেমন বিদ্যাসাগর হলেন না, তেমনি বিধান রায়, জ্যোতি বসু, নেহরু কারোরই আর দ্বিতীয় নেই। কোথায় যাব! কার কাছে যাব! বনেদি বাড়ির মতো বনেদি পার্টিও সব নষ্ট হয়ে গেল। মন্দিরে আর মাধব নেই আমরা পোদোর দল শাঁখ ফুঁকছি।
সেইটাই যদি বুঝে থাকেন, তাহলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করছেন কেন? আপনাদের যা অবস্থা চুরিও করতে পারবেন না, দেশসেবাও করতে পারবেন না, কারণ আপনাদের সে সংগঠন নেই। আমরা সাধারণত আমাদের ক্লায়েন্টদের হতাশ করি না। কিন্তু কী করব, আপনাদের কোনও ইমেজ নেই।
রবিশঙ্কর ব্রিফকেস গুটিয়ে নিয়ে চলে গেলেন। আর তিন দিন পরেই বিধানসভার অধিবেশন শুরু হবে। এই তিনদিনের মধ্যেই সিদ্ধান্তে আসতে হবে। বিরোধীরাও আমাদের মতোইছত্রভঙ্গ। রাতে আমার স্ত্রীকে বললুম, জানো আমি পদত্যাগ করছি।
বিশ্বাস করলেন না। বললে, যাঃ সবেতেই তোমার ইয়ারকি। আমেরিকা থেকে বলুমাসিরা আসছে তোমাকে সংবর্ধনা জানাতে। তোমার মুখ-চোখও মুখ্যমন্ত্রীর মতো হয়ে আসছে। পদত্যাগ করবে মানে! আমার অত বড় বড় চুল কেটে আধ হাত করে দিলুম। সে কি পদত্যাগ করার জন্যে?
বিশ্বাস করো, ভীষণ আত্মগ্লানিতে ভুগছি। এভাবে হয় না।
আত্ম-ফাত্মা ফেলে দাও। রাজনীতিতে আত্মা নেই। তুমি দেশ দেশ করে অত ভেবোনা তো। বিদেশের কথা ভাবো।
জানো, আমি আজকাল খেতে বসে চাষবাসের কথা ভাবি। জামাকাপড় পরার সময় টেক্সটাইল মিলের কথা ভাবি। দুধ খাবার সময় হরিণঘাটার কথা ভাবি। আলোর সুইচে হাত দেবার সময় ব্যান্ডেলের কথা ভাবি। যা করতে যাই পুরো পটভূমিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে আর আমি কেমন যেন সিক হয়ে পড়ি। কোথাও কোনও কাজ হচ্ছে না। চড়া রোদ দেখলে মনে হয়, এই রে খরা এসে গেল! কালো মেঘ দেখলে মনে হয় বন্যা।
তুমি অ্যামেচার, এখনও অ্যামেচার। প্রোফেশনাল হবার চেষ্টা করো।
ঘুম আর আসে না। একটু তন্দ্রার মতো আসে, ছ্যাঁক করে ভেঙে যায়। ওইটুকুর মধ্যেই ঘেঁড়া ছেড়া স্বপ্ন। মাস্টারমশাই সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। চোখদুটো যেন জ্বলছে। হাতে একটা। কাগজ। কণ্ঠে তিরস্কার, কিছুই করতে পারলে না। আমার নাতনিটা আত্মহত্যা করল। গঙ্গার ধারে এক বৃদ্ধা বসে আছেন, সামনে একটা ভাঙা অ্যালুমিনিয়ামের থালা। এ কি মা! তুমি ভিক্ষা করছ? ঝাপসা চশমাপরা চোখ তুলে বললেন, ভিক্ষান্ন, প্রায়োপবেশন এই তো এ-দেশের ভাগ্য।
রাইটার্স বিল্ডিং-এ ঢুকেছি! কেউ কোথাও নেই। খাঁচা লিফটের কাছে একটি মাত্র আলো জ্বলছে। দাঁড়ানো মাত্রই ওপর থেকে লিফট নেমে এল। ধুতি আর শার্ট পরা, লম্বা-চওড়া একজন ভদ্রলোক দরজা খুলে ডাকলেন, চলে এসো, কুইক। খুব চেনা। খুবই চেনা। ডক্টর রায়। আপনি? তুমি কে? আমি পলিটিক্যাল পেশেন্ট। হার্টটা ঠিক রাখা। আজকাল সব হার্টলেস পলিটিকস করে। আমার সেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে ঠান্ডা মেশিনের শব্দ। যেন কোনও ব্রঙ্কাইটিসের রুগি নিশ্বাস ফেলছে। অসম্ভব ঠান্ডা। একটি মাত্র আলো জ্বলছে। আমার চেয়ারটা হয়ে গেছে বিশাল বড়। আর তেমনি উঁচু। আকৃতি দেখে ভয় পেয়ে গেলুম। ভয়ে ভয়ে এগোচ্ছি। চেয়ারে কুণ্ডলী পাকিয়ে কী একটা শুয়ে আছে। লাল রঙের বিশাল এক সাপ। আমি কাছে যেতেই সাপটার অলস মাথা উঁচু হল। অবিকল মানুষের মতো দুটো চোখ। হাসছে। লিকলিকে চেরা জিভ বেরিয়ে এল। আবার ঢুকে গেল। সাপ হাসছে।
ঘুম ভেঙে গেল। ফোন বাজছে।
হ্যালো।
ওপাশে একটা চাপাকান্নার শব্দ।
হ্যালো।
আমি মিসেস বুবনা।
কী হয়েছে আপনার? কাঁদছেন কেন?
কাল রাতে মিস্টার বুবনাকে কে বা কারা খুন করে গেছে।
সে কী? আপনি কোথায় ছিলেন?
আমি পাশের ঘরে ছিলুম। কিছু টের পাইনি।
পুলিশকে ইনফর্ম করেছেন?
সবার আগে আপনাকে জানালুম।
আপনার কাকে সন্দেহ?
ওর ভাইকে সন্দেহ হচ্ছে। গঙ্গাবতার বুবনা।
কারণ? খুনের একটা কারণ থাকবে তো!
গঙ্গাবতার চাইছে পশ্চিমবাংলার অর্থনীতি, ল অ্যান্ড অর্ডার, প্রশাসন—সব একসঙ্গে ভেঙে পড়ুক। লোকটা নামকরা ব্ল্যাকমার্কেটিয়ার, স্মাগলার। ও সমস্ত ট্রেডারদের নিয়ে পরশু একটা মিটিং করেছিল। সেই মিটিং হয়েছিল গভীর রাতে পার্ক-এ। সেখানে আপনার ক্যাবিনেটের বেশ কিছু মন্ত্রী ছিল। আমার যতদূর মনে হচ্ছে আপনার বেশ কিছু মন্ত্রী বিক্রি হয়ে গেছে। গঙ্গাবতার কিনে নিয়েছে। আলাদা একটা দলও তৈরি হয়েছে তলায় তলায়।
তারা কী করতে চায়?
আপনাকে ফেলে দিতে চায়। বিধানসভায় আপনি সাপোর্ট হারিয়েছেন, এই বলে রাজ্যপালের কাছে একটা আবেদন যাচ্ছে। এই নিয়ে আমার স্বামী কাল পর্যন্ত খুব চিন্তিত ছিলেন। গতকাল সকালে আমাদের প্রতিষ্ঠানে ইনকামট্যাক্স রেড-ও হয়ে গেছে। আপনি জানেন না?
কই না তো!
আমাদের সব নিয়ে চলে গেছে।
সে কী মিস্টার বুবনা তো আমাকে একটা ফোন করতে পারতেন!
কী করে করবেন? টেলিফোনে হাত দেবার উপায় ছিল না।
তা হলে?
তা হলে আর কী, আপনারও কপাল পুড়ল। আমারও কপাল পুড়ল। বুবনা লোকটার খুব প্রেম ছিল। আমাকে বস্তি থেকে রাজপ্রাসাদে তুলে এনেছিল। মিসেস বুবনার গলা ধরে এল।
আমি যাব?
নানা। এখনও হয়তো আপনার চান্স আছে, তা-ও যাবে। আপনি পাওয়ারে থাকলে আমার হয়তো সুবিধে হবে।
