এ সব আগের কাজ।
চোপ। আপনাদের কোনও কথা শুনব না। যত সব ফালতু। কেবল বাতেলা। আমরা যেন ভেসে এসেছি বানের জলে। সারা দেশটাকে মেরে ফাঁক করে দিল শালা উদয়াস্ত নরক যন্ত্রণা। এর। একটা বিহিত চাই।
হবে হবে। ধীরে ধীরে হবে।
আর কত ধীর মাইরি। হাফ সেঞ্চুরি তো হয়ে গেল।
তাহলে তুলতে দেবেন না।
না। পারলে আপনাকেও ফেলে দেব। আমরা এখন ডেসপারেট।
কে খুঁড়ে গেছে?
কোন শালা খুঁড়েছে কে জানে? আপনাদের তো অনেক শালা-সম্বন্ধি।
এই সময়টায় আমি ক্যাডারদের অভাব ভীষণভাবে বোধ করছি। ক্যাডার ছাড়া দেশ শাসন করা সম্ভব নয়। ধর্মগুরুরা যেমন দীক্ষা দিয়ে শিষ্যসামন্ত তৈরি করেন, রাজনীতিগুরুদেরও তেমনি ক্যাডারের চাষ করা উচিত সবার আগে। এরা আমার দলের হলে বলত, গর্ত খুঁড়েছিস, বেশ করেছিস। রক্তগঙ্গা বইয়েছিস বেশ করেছিস। কলকাতায় ঘুঘু চরিয়েছিস, বেশ করেছিস। গ্রামের মানুষ আধমরা, ঠিক করেছিস। সব ধুকতে ধুকতে খাবি খেতে খেতেও বলত, আহ, বেশ, বেশ, বেশ! কীর্তনের আসর। মূল গায়েন সিল্কের পাঞ্জাবি পরে। গলায় দু-পাট লুতুরপুতুর চাদর। ঘি মাখন খাওয়া শরীর আর দোহাররা সব কৃশকায়, চোখ বসা, চোয়াল ওঠা। ধুকতে ধুকতে বলছে, রাধার কি হইল অন্তরে ব্যথা।
একটু বল সঞ্চয় করে বললুম, আমি লিখে দিয়ে যাচ্ছি, কাগজ আনুন, তিন ঘণ্টার মধ্যে এই রাস্তা চৌরসের কাজ শুরু হবে।
একটু প্রবীণ যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যস্থতায় একটা রফা হল। একজন জিগ্যেস করলেন, আপনারা কোন দল? ডান না বাঁ। রাশিয়া না আমেরিকা?
আমরা সম্পূর্ণ একটা নতুন দল।
আচ্ছা! নতুন সাবান। কেমন ফ্যানা হয়? খুব ফ্যানা!
বাবা! দেশের কী অবস্থা! কেউ গান দিয়ে বলছে হালুয়াবালা। কেউ বলছে সাবান। যাক, দমকল পূর্তমন্ত্রীকে তুলল! কাদাটাদা মেখে সে একরকম হয়েছেন। আড়ালে এনে প্রায় ধমকের সুরে বললুম, এখানে মরতে এসেছিলেন কেন?
ভদ্রলোকের প্রায় কাঁদো-কাঁদো সুর, আর বলেন কেন, আমার বউয়ের ফোল্ডিংছাতা।
তার মানে!
মানে এই রাস্তার বত্রিশ নম্বর বাড়িতে আমার মিসেসের এক বান্ধবী থাকে। কাল এসেছিল বেড়াতে। ভুলে ফেলে গেছে। আমাকে বললে, তুমি যাবার পথে ছাতাটা টুক করে তুলে নিও।
আর আপনি মন্ত্রী হয়ে বউয়ের কথায় নেচে নেচে স্ট্যাটাস-ফ্যাটাস ভুলে ছাতা আনতে ছুটলেন। ওই জন্যে বলে জাত বড়লোক আর লটারি পাওয়া বড়লোক। বুঝলেন, আমাদের জাতমন্ত্রী হতে জীবন ঘুচে যাবে। দেখুন তো আপনাদের জন্যে কী হেনস্তা।
আমরা গাড়িতে উঠছি। চারপাশে লোকে লোকারণ্য। হাসছে। টিটকিরি দিচ্ছে। সময়টা দুপুর। কিছু অলস বারাঙ্গনা মজা দেখতে এসেছিল। একজন বলে উঠল, কি লো সই! শেষে গর্তেই ঢুকে গেল।
লজ্জায় একেবারে অধোবদন। পাইলটের ওঁয়া ওঁয়া। দমকলের ঘণ্টি। জনগণের হাসি, তামাশা। আমার পাশে পুরমন্ত্রী। বললুম, তিনঘণ্টার মধ্যে, রাস্তা বোজাবার কাজ শুরু করতে হবে।
আপনি যেমন, চুক্তির ডেফিনিশান কী? যাহা ভঙ্গ করিতে হয়, তাহাই চুক্তি। যাহা বন্ধ করিতে হয় তাহাই কারখানা, যাহা দখল করিতে হয় তাহাই ফুটপাথ।
হাইড্রা এজেন্সির রবিশঙ্কর এলেন। হাতে ব্রিফকেস। মুখে তেমন হাসি নেই।
আমরা তো আপনাদের মার্কেট রেটিং সার্ভে করালুম। খুবই বাজে অবস্থা। যাচ্ছেতাই বলা চলে। আপনারা না দিশি বিস্কুট না বিলিতি বিস্কুট।
তার মানে?
মানে কী উচ্চসমাজ, কী নিম্নসমাজ কেউই আপনাদের চাইছে না। এই দেখুন হরিপালে এক ক্ষেতমজুরকে জিগ্যেস করা হয়েছিল। এই যে নতুন মন্ত্রিসভা হল, আপনাদের মনে কেমন আশা জাগছে? সঙ্গে সঙ্গে উত্তর, যারাই আসুক সব ব্যাটাই হারামজাদা। শ্রীপুরের এক শিক্ষককে। জিগ্যেস করা হল। তিনি বললেন, নতুন মন্ত্রিসভা। ও তো সব আকাটের দল। বামুনগাছির এক ছাত্রকে জিগ্যেস করা হল, বললে, ওল্ড ওয়াইন ইন এ নিউ বটল। কলকাতার এক ব্যবসায়ীকে জিগ্যেস করা হল, বললে, মোশা, যে মালই আসুক, আমাদের কবজায়। ব্যবসা আমাদের রাস্তা আমাদের, কলকাতার বিলকুল প্রপার্টি আমাদের, ফুটপাথ আমাদের, গঙ্গামাঈ আমাদের, পার্ক আমাদের, সোব-সোব আমাদের। এক গৃহবধূকে জিগ্যেস করা হল। তিনি বললেন, কবে সরষের তেলের দাম পঞ্চাশে ওঠে দেখব। হাঁড়ি তো প্রায় সিকেয় উঠল। বর্ধমানে এক বৃদ্ধকে জিগ্যেস। করা হল, তিনি বললেন, এদেশে মন্ত্রীটন্ত্রী আছে? আইন-আদালত আছে? আমি তো জানি, মাস্তান ছাড়া এদেশে কিছু নেই। সার্ভের ফলাফল খুব খারাপ। খুবই খারাপ।
আমাদের ইমেজ খারাপ নয়। আমাদের বাজার আগে থেকেই খারাপ করে রেখে গেছে। কীরকম জানেন, যত ভালোই চানাচুর হোক, লোকের ধারণা চানাচুরে অম্বল হয়। যেমন সিফিলিটিক। পিতামাতার সন্তান বিকলাঙ্গ হতে পারে, জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হতে পারে।
সে আপনি যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন; আপনাদের মার্কেট ভালো নয়। যে কোনওদিন আপনারা পড়ে যাবেন। আমরা আরও সাম্রতিক খবর পেয়েছি, ধীরে ধীরে সব অচল হয়ে যাবে। ডার্ক ফোর্সের্স চারিদিকে মাথা তুলছে। বাজার থেকে অর্ধেক জিনিস উধাও। ল অ্যান্ড অর্ডার নেই বললেই চলে।
আপনার মতে আমাদের কী করা উচিত!
দেখুন যে দেশের যা। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ছাড়া খেলার কথা ভাবা যায়?
না।
সেইরকম কংগ্রেস কমিউনিস্ট ছাড়া রাজনীতির কথা ভাবা যায় না। এই যে দেখুন নতুন নতুন সব দল হল, কংগ্রেস (স), বাংলা কংগ্রেস, প্রণব কংগ্রেস, কোনও কিছু ধোপে টিকল? পাবলিক নিল না। পার্টি অনেকটা প্রোডাক্টের মতো। শুকনো মটর শুটি, স্যুপ পাউডার, গুঁড়ো পেঁয়াজ রসুন, পাউডার, রসুন গুলি এদেশে চলেনি। এদেশের লোক জলেই জলশৌচ করবে, টিস্যু পেপার ব্যবহার করবে কেন। আপনারা যে কোনও একটা দলের সঙ্গে মার্জ করে যান।
